তবু উন্মত্তের মতো বোতাম টিপে চললাম। আকাশে যেন চারটে উল্কার পাগলামির খেলা শুরু হয়ে গেল। এই আমি উঠি, তারা নামে। এই তারা আমাদের একেবারে গা ঘেঁষে চলে যায়।
হঠাৎ কীভাবে জানি না তাদের অনেক দূর পিছিয়ে ফেলে আমাদের যন্ত্রযান ছুটে বেরিয়ে গেল। আমি বোতাম টেপা ছেড়ে দিয়েছি। তারা কিছুতেই আর দৌড়ের পাল্লায় পারছে না। আমাদের যন্ত্রযান অতলান্তিকের ওপর দিয়ে আমেরিকার দিকেই চলেছে। ভেঙে পড়তে হয় সেখানেই গিয়ে পড়ব।
কিন্তু তা আর হল না। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেয়ে বুঝতে পারলাম, আমাদের যন্ত্রযান থেমে গেছে। থেমে, দুরন্ত বেগে নীচের সমুদ্রে পড়ছে। কোনও অদৃশ্য শক্তিতে তারা আমাদের কল বিগড়ে দিয়েছে।
সমুদ্রে পড়ার আগে পর্যন্ত মনে আছে। তারপর যখন জ্ঞান হল তখন জেলেদের একটা ট্রলারে শুয়ে আছি। ডোনাট আর গ্যালিকো যন্ত্রযানের সঙ্গেই অতলান্তিকের অতলে তলিয়ে গেছে।
ঘনাদা প্রকাণ্ড একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চুপ করলেন। শিবুর কাশি আবার শুরু হতেই, গৌর তাকে ধমক দিয়ে শাসিয়ে বললে, আচ্ছা, আপনি হঠাৎ ডাইক হ্রদের দিকে যাওয়ার হদিস পেলেন কোথায়?
ঘনাদা একটু হেসে বললেন, ডোনাটও একথা জিজ্ঞাসা করেছিল। হদিস পেয়েছিলাম যে উড়ন্ত-চাকতি নিয়ে আমেরিকায় এখনও হুলুস্থুল চলছে, তার সমস্ত গুজব ভাল করে বিশ্লেষণ করে। সেই সমস্ত গুজব থেকেই মনে হয়েছে এই সব লাট্টু আকারের অদ্ভুত জিনিসগুলি আমেরিকার উত্তর-পূর্ব কোনও দিক থেকেই সাধারণত প্রথম দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে ল্যাব্রাডরের পশুলোমের ব্যবসায়ে মন্দা পড়ার খবর যোগ দিয়েই আমার মনে হয়, পশুলোম যেখান থেকে বেশি পাওয়া যায় সেই ডাইক হ্রদের কাছেই সুত্র পাওয়া যেতে পারে।
শিবুর কাশি এবার আর ধমক দিয়েও থামানো গেল না। ঘনাদা বিষদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে মনের ভুলে বোধ হয় শিশিরের গোটা সিগারেটের টিনটাই হাতে নিয়ে উঠে গেলেন।
ঘনাদার চিংড়ি বৃত্তান্ত (গল্পগ্রন্থ)
ঘনাদা এলেন
হ্যাঁ, ঘনাদা একদিন এসেছিলেন!
নিশ্চয়ই একদিন এসেছিলেন আমাদের এই বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে।
কিন্তু কবে কখন কেমন করে তিনি প্রথম এলেন সে কথা মনে করতে গিয়ে বেশ মুশকিলে পড়তে হচ্ছে।
ঘনাদা নামে কোনও একজনের সঙ্গে এই বাহাত্তর নম্বরে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি বলতে মনে যা আসছে তা স্রেক একটি ব্যাগ।
হ্যাঁ, মাঝারি সাইজের ক্যাম্বিসের একটা ব্যাগ।
না, মানুষ জন কেউ নয় শুধু একটি ক্যাম্বিসের ব্যাগ—ঘেঁড়াখোঁড়া পুরনো না হলেও বেশ একটু জীর্ণ গোছের।
বাহাত্তর নম্বরের প্রথম পত্তনের সময়ে, সবকিছু তখন তো এলোমেলো অগোছালো। সুবিধামত একটা বাড়ি পেয়ে যে কজনে মিলে সেখানে একটা শহুরে আস্তানা বানাবার ব্যবস্থা করেছিল, এখন বাহাত্তর নম্বর বলতে যাদের নামগুলো আপনা থেকেই মনে আসে, সেই চারজনই তাদের মধ্যে তখন ছিল প্রধান।
অর্থাৎ বাহাত্তর নম্বর বলতে এখন যেমন তখনও সেই চার মূর্তিমান–শিশির, শিবু, গৌর এবং আমি।
বাড়িটা পুরনো হলেও খুব ভাঙাচোরা নয়। সামান্য একটু-আধটু মেরামতের পর চুনকাম করিয়ে আমরা তার কয়েকটা ঘরে তখনই বিছানাপত্র পেতে ঢুকে পড়েছি। এখন যেটা আমাদের আড্ডাঘর সেইটেই তখন কিছু-জমা করা আসবাবপত্র নিয়ে খালি পড়ে আছে। ঠিক করা আছে যে দুদিন বাদে একটু হাতখালি হলেই আসবাবপত্র গুছিয়ে সেটাকে বসবার ঘর বানানো হবে। সকালে বিকালে ওদিকে যেতে আসতে এরই মধ্যে সেখানে একদিন ঘরের মাঝে জমা করা আসবাবপত্রের মধ্যে একটা গোলটেবিলের ওপর ক্যাম্বিসের ব্যাগটা চোখে পড়েছে।
একদিন দুদিন বাদেও টেবিলের ওপর ক্যাম্বিসের ব্যাগটা সমানে বসানো আছে। দেখে ব্যাগটা কার তার সন্ধান নিতে হয়েছে।
ব্যাগটার বর্ণনা আগেই করেছি। ওরকম ব্যাগ আমাদের কারওর যে নয় তা বুঝেই সেটার উপস্থিতি একটু অবাক করেছে।
পরম্পরকে জিজ্ঞাসা-টিজ্ঞাসা করেও রহস্যটার খুব স্পষ্ট একটা মীমাংসা কিন্তু। পাওয়া যায়নি। শিবুই একটু ভেবে ভেবে জড়িয়ে জড়িয়ে বলেছে, হ্যাঁ, ওই একন, মানে আমাদের চেনা কেউ নন, মানে বিপদে পড়ে—
বিপদে পড়ে কী? গৌর শিবুকে তার কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ঝাঁঝালো। গলায় জেরা করেছে, বিপদে পড়ে তিনি এখানে আমাদের সঙ্গে বাসা বাঁধবেন নাকি?
না, না, তা নয়! শিবু তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ করে জানিয়েছে, বরাবরের জন্য না, মাত্র ক-দিনের জন্য বাধ্য হয়ে এখানে আছেন। খুব কি একটা দরকারি ব্যাপারে কার জন্যে যেন–
হয়েছে। হয়েছে। শিশির শিবকে একরকম ধমক দিয়েই থামিয়ে দিয়ে বলেছে, কে, কী, কেন কিছুই না জেনে কোনও একজনকে ঢুকিয়ে দিয়েছ আমাদের এখানে। এখন তিনি তাঁর এই ব্যাগ নিয়ে
না, না, কোনও অসুবিধে আপনাদের করব না। শিশিরের কথার মাঝখানে তাকে থামিয়ে বারান্দার দরজা দিয়ে যিনি এবার ঘরে ঢুকেছেন তাঁর চেহারার বর্ণনা দেবার বোধহয় দরকার নেই। হ্যাঁ, সেই শুকনো পাকানো ত্রিশ থেকে ষাট যে কোনও বয়সের ধারালো কুড়ুল মার্কা মাঝারি মাপের চেহারা। গলাটি শুধু চেহারার তুলনায় রীতিমত ভারিক্কি।
ঘরের ভেতর ঢুকে এসে দু-হাত তুলে সকলকে নীরব নমস্কার জানিয়ে ভদ্রলোক। বলেছেন, মাত্র দুদিনের ব্যাপার। আপনাদের তেতলায় ন্যাড়া ছাদে একটা ঘর দেখে এলাম–
