কিন্তু আর-সব যাত্রীরা কোথায়?
জানি না। হয়তো কোথাও চালান হয়ে গেছে। নিজে যে কীভাবে তাদের নজর এড়িয়ে বেঁচে গেছি, তা-ও বলতে পারি না। তবে, বেঁচে গেছি বলা ভুল, কারণ তারা…
গ্যালিকোর অবান্তর কথায় বাধা দিয়ে বললাম, তারা বলছ কাদের? আর এখানে এসব প্লেন এনে ফেলার মানে-ই বা কী!
তারা কারা, জানি না। চোখে অন্তত তাদের দেখিনি, দেখা যায় না বলেই আমার ধারণা। কিন্তু এখানে এসব প্লেন এনে ফেলার মানে তো অতি সহজ।
কী মানে? ডোনাট অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
গ্যালিকো অত্যন্ত দুঃখের হাসি হেসে বললে, কোনও অজানা জঙ্গলের দেশে আমাদের কোনও বৈজ্ঞানিক অভিযান পাঠালে প্রথম কী করা হয়? ভাল দেখে একটা থাকবার জায়গা বেছে, তার চারিধার পরিষ্কার করে যতদূর সম্ভব ওষুধ ছড়িয়ে বিষাক্ত পোকামাকড় ও জন্তু-জানোয়ার মারবার ব্যবস্থা করা হয়। ল্যাব্রাডরের এ-অঞ্চলে যে গাছপালা পশুপক্ষী আর নেই, তার কারণ, এদের এমন কোনও ওষুধ বা রশ্মি আছে যা আমাদের বিজ্ঞানের কল্পনার অতীত। নিজেদের থাকবার জায়গা নিরাপদ করে আমাদের বৈজ্ঞানিকেরা তারপর কী করে? জঙ্গল থেকে যা-কিছু দরকারি মনে হয়, জ্যান্ত বা মরা, সংগ্রহ করে আনে পরীক্ষা করবার জন্যে। এরাও তাই করছে। এদের কাছে পৃথিবী একটা অজানা জঙ্গলমাত্র।
কিন্তু এরা কী রকম জীব এবং কোথা থেকে এসেছে তার কিছু আভাস পেয়েছ?
না, তা কিছুই পাইনি, তবে যাতে এসেছে তার একটা বোধহয় এখনও দেখাতে পারি, বলে গ্যালিকো এবার হ্রদের কাছে আমাদের নিয়ে গেল।
সবিস্ময়ে দেখলাম, সেখানে ডাইক হ্রদের জলের ওপরে যে জিনিসটি ভাসছে, তাকে একমাত্র ছেলেদের খেলবার চাকতি লাটুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। আকারে কিন্তু তা ছোটখাটো একটা জাহাজের মতো বিরাট।
গ্যালিকো সেটা দেখিয়ে বললে, আমার ধারণা, গত বছর ধরেই এরা এখানে আসছে। এসে ক-দিন তাদের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাল-মশলা সংগ্রহ করে নিয়েই আবার চলে যায়। এবার যাবার সময় কেন যে এটি ফেলে গেছে বলতে পারি না।
হ্রদের ধারেই অনেক বড় বড় গাছ কাটা পড়েছিল। গ্যালিকোর কথা শেষ হবার আগেই আমি তার একটা হ্রদের জলে ভাসিয়ে তার ওপর ঘোড়ার মতো করে চেপে বসলাম।
ওটা কী করছ, কী! ডোনাট অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
যা করছি, তোমরাও তা-ই করো। ও-যন্ত্রযানের ভেতর কী আছে দেখতে হবে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করলেও গ্যালিকো ও ডোনাট তারপরই আমার মতো দুটি কাঠের গুঁড়ি নিয়ে ভেসে পড়ল।
সেইভাবে হাত দিয়ে জল কেটে সেই বিরাট যন্ত্রযানটার কাছে গিয়ে, অনেক কষ্টে পোর্টহোলের মতো একটা বড় ফোকর খুঁজে পেয়ে, কোনওরকমে ভেতরে ঢুকলাম।
ভেতরে তো ঢুকলাম, কিন্তু এ যন্ত্রযানের রহস্য তো কিছুই বোঝা যায় না। চারিধারে শুধু উজ্জ্বল রুপোলি একরকম ধাতুর দেওয়াল-দেওয়া করিডর এদিকে-ওদিকে চলে গেছে। এ যন্ত্রযান যাদের—তারা থাকে কোথায়, খায় কী, যন্ত্রযান চালায়ই বা কী করে?
কী করে না তোক, কোথা থেকে চালায় খানিকবাদেই বুঝতে পারলাম মনে হল। যন্ত্র-যানের ঠিক মাঝামাঝি আগাগোড়া ঝাপসা কাঁচে-ঢাকা একটা ঘর, তার মাঝখানে একটা প্রকাণ্ড নিচ টেবিলের ওপর অসংখ্য নানা রঙের বোতাম যেন আঁটা আছে।
আমি সেই বোতামগুলো এলোপাথাড়ি টিপতে শুরু করতেই ডোনাট হাঁ-হাঁ করে উঠল। ও কী করছেন, কী! কীসে কী হয়ে এটা হয়তো চলতে শুরু করবে।
উত্তেজিতভাবে বললাম, আমি তো তা-ই চাই। এ যন্ত্রযান যদি ভ্য-জগতে নিয়ে গিয়ে, ভেঙে পড়েও মরি, তবু এর ভাঙা টুকরো থেকে আমাদের বৈজ্ঞানিকেরা হয়তো তাদের অজানা-বিদ্যা শিখতে পারবে।
কথা বলতে বলতে বোতাম টিপে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ ঘরের ঝাপসা কাঁচ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে ডাইক লেকের চারিধার ঘরের দেওয়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর যেন বিদ্যুৎগতিতে সে হ্রদ নীচে কোথায় তলিয়ে গেল।
আমরা আকাশে উঠেছি, উল্কাবেগে আকাশে ছুটে যাচ্ছি, কিন্তু কোন দিকে! নীচে যেন সাদা তুষার-প্রান্তর দেখা যাচ্ছে। তবে কি—উত্তর মেরুর দিকেই চলেছি? যেমন খুশি আবার আর কটা বোতাম টিপলাম। হঠাৎ গোঁত্তা খেয়ে যন্ত্রযান ঘুরে চলল। একি? ওই তো সেন্ট লরেন্স উপসাগর। নীচে যেন ম্যাপের মতো আঁকা রয়েছে। ওই তো নিউফাউন্ডল্যান্ড। আমরা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই চলেছি। কিন্তু সমুদ্র যেন হু-হু করে আমাদের দিকে ছুটে আসছে! আমরা নীচে পড়ে যাচ্ছি নাকি? আর কয়েকটা বোম টিপলাম। হঠাৎ আবার পাক-খেয়ে আমাদের যন্ত্রযান উঠে যাচ্ছে। এবার শুধু আকাশ, আর নীচে মেঘের ফঁাকে অতলান্তিক সমুদ্র। খানিকক্ষণ এভাবে চললেই বোতামগুলোর রহস্য কিছু হয়তো বুঝতে পারব। তখন নিউ ইয়র্ক বা সেরকম কোনও শহরের কাছে কোনও হ্রদ বা উপসাগরে এ যন্ত্রযান নামানো শক্ত হবে না। উত্তেজনায় আমার সমস্ত শরীর তখন কাঁপছে! খুঁড়তে খুঁড়তে গোখরো নয়, একেবারে অজগর আমিই ধরব। কোথায় গুপ্তচরের সন্ধান, আর কোথায় দুনিয়ায় কেউ যা কখনও ভাবেনি সেই অন্য গ্রহের যন্ত্রযান দখল করে নিয়ে আসা! অ্যাটমিক বোমার যুগকেও যারা পেছনে ফেলে গেছে, তাদের বৈজ্ঞানিক বিদ্যার সন্ধান পাওয়া!
হঠাৎ গ্যালিকো চিৎকার করে উঠল, ওই দেখো।
দেখলাম এবং বুঝলাম, আমার সব আশায় ছাই পড়তে চলেছে।
আকাশে হঠাৎ কোথা থেকে আমাদের মতো আরও তিনটি চাকতি-লাটু এসে উদয় হয়েছে। বুঝলাম, যন্ত্রযানের আসল মালিকেরা ফিরে এসেছে। ফিরে এসে তাদের যন্ত্রযান দেখতে না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের খোঁজে বেরিয়ে এতক্ষণে সন্ধান পেয়েছে। এরা ওস্তাদ আর আমি চালাবার বিদ্যা কিছুই জানি না। এরা আমায় ধ্বংস করে ফেলবেই।
