পাঁচদিন হাঁটা-পথে চলবার পর আমরা সেদিন এ-অঞ্চলের শেষ একটি চটিতে রাত্রের মতো আশ্রয় নিয়েছি। চটিটি অবশ্য পরিত্যক্ত। পশুলোম দুষ্প্রাপ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, চটি যারা চালায় তারা নিরুপায় হয়ে চলে গিয়েছে! শুধু জংলা-গাছের তৈরি তাদের আস্তানাটা আছে পড়ে।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমোতে যাব এমন সময় নানুক এসে খবর দিলে, জঙ্গলের পথে কে একজন লোক আমাদের এই চটির দিকেই আসছে।
পশুপক্ষী পর্যন্ত সেখানে নেই, সেই শ্মশান রাজ্যে কে লোক এদিকে আসতে পারে! মি. ডোনাট তো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এই অন্ধকারে, লোক আসছে, তুমি দেখলে কী করে?
দেখিনি, শুনতে পাচ্ছি! নানুক সংক্ষেপে জানালে।
কান পেতে আমরা কিন্তু কিছুই শুনতে পেলাম না। মি. ডোনাট বিরক্ত হয়ে নানুককে কুনি দিতে যাচ্ছিলেন। তাঁকে বাধা দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম যে, আমাদের কাছে যেমন ছাপানো বই, নানুকের কাছে তেমনই জঙ্গল। সে এখানে সামান্য ঝরাপাতা দেখে বা অস্ফুট একটা শব্দ শুনে যা বুঝতে পারে আমাদের পক্ষে তা অসাধ্য।
নানুকের কথা যে সত্যি, খানিকবাদেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। বাইরের পদশব্দ এবার আমরাও শুনতে পেলাম। কিন্তু কে এই লোক? বন্ধু, না শত্রু? এ-অঞ্চলের অ্যালগনকুইন জাতির রেড-ইন্ডিয়ানরা, শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারে আজকাল কখনও কখনও অত্যন্ত হিংস্র হয়ে ওঠে। সুবিধে পেলে, নির্জন জায়গায় তারা যে খুনজখম করতে দ্বিধা করে না, তার যথেষ্ট নজির আছে।
পিস্তলটা বার করে তাই কোলের ওপর রাখলাম।
কিন্তু পিস্তলের কোনও প্রয়োজন হল না।
ক্লান্তপদে প্রায় টলতে টলতে যে-লোকটি কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তাকে দেখে মি. ডোনাট ও আমি দুজনেই অবাক।
মি. ডোনাট উঠেই তাকে ধরে ফেলে বললেন, এ কী, কর্নেল মিচেল! আপনি এখানে কোথা থেকে?
আমিও উঠে দাঁড়িয়ে লোকটাকে ধরেছিলাম। তাকে আমাদের বিছানার ওপর বসিয়ে দিয়ে মি. ডোনাটের দিকে অবাক হয়ে ফিরে জিজ্ঞাসা করলাম, কর্নেল মিচেল কাকে বলছেন?
বাঃ—এই তো আমাদের সামরিক বিভাগের গোয়েন্দা, কর্নেল মিচেল। যাত্রী-প্লেনে ইনিই তো পাহারা দেবার জন্য ছিলেন।
তাই নাকি? একটু হেসে বললাম, আমি কিন্তু এঁর আরেকটা নাম জানি।
আরেকটা নাম! মি. ডোনাট অবাক।
হ্যাঁ। সে নাম হল—সেনর গ্যালিকো।
আপনাকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব, মি. দাস। ক্লান্তভাবে একটু হেসে গ্যালিকো তার জামার ভেতরের পকেটে থেকে একটি কাগজের প্যাকেট বার করে আমার হাতে দিয়ে বললে, যার জন্য এতদূর ধাওয়া করেছেন, এই নিন সেই ফাইল। এতে আর আমার দরকার নেই। গুপ্তচরগিরি আমার শেষ।
কঠিন স্বরে বললাম, তোমাকে আমি চিনি, গ্যালিকো! তুমি কি ভেবেছ, সামান্য একটু অভিনয় করে আমায় ফাঁকি দেবে! এ ফাইল যে তুমি নকল করে রাখোনি তার প্রমাণ কী?
প্রমাণ! গ্যালিকো একটু হাসলে, হ্যাঁ, বিপদ যতই থাক, এখনও আমার সঙ্গে গেলে বোধহয় তার প্রমাণ দিতে পারব। তখন আশা করি, বুঝবেন যে, পরস্পরের তুচ্ছ ক-টা অ্যাটমিক অস্ত্রের গোপন কৌশল জানবার জন্য আর জাতিতে জাতিতে আমাদের কাড়াকাড়ি মারামারির কোনও দরকার নেই। এখন শুধু আমায় একটু বিশ্রাম করতে দিন। কাল সকালে আমি আপনাদের প্রমাণ দিতে নিয়ে যাব।
সত্যিই পরের দিন একটু সুস্থ হয়ে গ্যালিকো,নানুক বাদে, আমাদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে, ডাইক হ্রদের উত্তর দিকেই রওনা হল। সেদিকে যত এগিয়ে যাই, ততই অবাক হয়ে যেতে হয়। ল্যাব্রাডর অত্যন্ত ঠাণ্ডা। মেরু-প্রবাহ-ঘেঁষা দেশ হলেও বন্ধ্যা তুষার-প্রান্তর নয়। ভূর্জ দেবদারু ইত্যাদি জাতের গাছ ও নানা লতাগুল্ম সেখানকার অধিকাংশ পাহাড়ি উপত্যকা ছেয়ে আছে। কিন্তু এদিকে সমস্ত গাছপালা কী এক অভিশাপে যেন বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। জন্তু-জানোয়ার অনেক আগে থেকেই বিরল হয়ে আসছিল, এদিকে অগ্রসর হওয়ার পর একটা পাখির ডাকও সারাদিনে শোনা গেল না। দুদিন এইভাবে এগিয়ে আমরা যে অনুচ্চ পাহাড়ের ধারে গিয়ে পৌঁছোলাম, তার মাথা ডিঙিয়ে গেলেই পশ্চিমে ডাইক হ্রদ ও তার চারিধারের উপত্যকা পাওয়া যাবে।
সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গেছল বলে, এপারেই রাতটা কাটিয়ে, পরের দিন সকালে পাহাড়ের মাথা ডিঙিয়ে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ডাইক হ্রদের চারিধারটা যেন একটা বিরাট ভাগাড়, গোরু-মহিষের নয়, এরোপ্লেনের! এত ভাঙা এরোপ্লেন এখানে কী করে জড়ো হল?
গ্যালিকোই আমাদের মনের কথা অনুমান করে এবার সেই ভয়ংকর রহস্য আমাদের বুঝিয়ে দিলে।
বললে, একরকম চোখের ওপর ঘটেছে বলে আমাদের প্লেনের অন্তর্ধানের ব্যাপারটাতেই তোমাদের টনক নড়েছে, কিন্তু তার আগে গত তিন বছর ধরে যে সব এরোপ্লেন নিখোজ হয়েছে, কোনও দুর্ঘটনাই তার কারণ হবে বলে লোকে অনুমান করে। কিন্তু অধিকাংশই তার দুর্ঘটনা নয়।
কিন্তু এখানে এসব প্লেন এল কী করে? অবাক হয়ে ডোনাট জিজ্ঞাসা করলেন।
যেমন করে আমাদের প্লেন এসে পড়েছিল। বলে গ্যালিকো সমস্ত বিবরণই এবার দিলে, আসল কর্নেল মিচেলকে তার ঘরেই বন্দী করে-কর্নেল মিচেল সেজে আমি গোপনীয় কাগজ নিয়ে প্লেনে এসে উঠি। ক্রয়ডন থেকে যখন প্লেন ফেরাবার হুকুম আসে, তখন বিপদ বুঝে, বম্বার-এর কন্ট্রোল রুমে গিয়ে কথা বলতে বলতে কৌশলে রেডিও অপারেটারকে বিষাক্ত উঁচ ফুটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলি। পাইলট আর অপারেটার ছাড়া সে কামরায় কেউ থাকে না। পাইলট তার নিজের কাজেই তন্ময়। ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক অসুস্থতা বলে সে মনে করে। যেন নেহাত বাধ্য হয়ে আমি তখন অপারেটারের কাজ হাতে নিই এবং খানিক বাদেই পাইলটকে খবর জানাই যে, ক্রয়ডন থেকে ভুল করে প্রথম হুকুম পাঠানো হয়েছিল, এখন ভুল সংশোধন করে তারা আমাদের আবার আমেরিকা যেতেই বলেছে। পাইলট সরল বিশ্বাসে তাই করে। আমেরিকার কাছে প্রায় যখন পৌঁছে গেছি তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। হঠাৎ র্যাডার যন্ত্র বিকল হয়ে যায়। সেই সঙ্গে এবোরাপ্লেনের ইঞ্জিনও। কিন্তু পড়ে না গিয়ে, কোনও অদৃশ্য শক্তির টানে আমাদের প্লেন অসম্ভব বেগে আরও উঁচুতে উঠে যায়। ওই অসম্ভব বেগ আর আকাশের ওপরের স্তরের হাওয়ার অভাব ও ঠাণ্ডায় সবাই প্রায় জ্ঞান হারায়। জ্ঞা। যখন ফিরে আসে, তখন দেখি এই এরোপ্লেনের ভাগাড়ে পড়ে আছি।
