এই ব্যাপার নিয়ে কাগজে কিছুদিন সোরগোলের পরই সামরিক বিবৃতিতে সব যে ঠাণ্ডা হয়ে যায় তা আগেই বলেছি। সামরিক বিবৃতিতে বলা হয় যে, প্লেনটি সমুদ্রের ওপরই ভেঙে পড়ে ড়ুবে গেছল। র্যাডার-স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা একেবারে অস্বীকার করা হয়।
কিন্তু, আসল কথা যে তা নয়, তা বলাই বাহুল্য। সাধারণে জানতে পারলে পাছে আতঙ্কগ্রস্ত হয়, সেইজন্যই ওরকম মিথ্যে খবর দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ লোককে আশ্বস্ত করলেও, দেশের ওপরওয়ালারা তখন রীতিমতো চিন্তিত হয়ে উঠেছেন।
ইতিপূর্বে নানা দিকে বিশেষ করে আমেরিকার বহু জায়গা থেকে রহস্যজনক ওইরকম আকাশ-যানের সংবাদ বহুবার পাওয়া গেছে। দর্শকদের চোখের ভুল ও বাজে লোকের আজগুবি কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েও সাধারণের গুজব বন্ধ করা যায়নি। এবার সামরিক কর্তারা নিজেরাও মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, সাধারণের গুজবের মধ্যে কিছু সত্য অবশ্যই আছে। বাইরে উচ্চবাচ্য করলেও গোপনে গোপনে এ-বিষয়ে ব্যাকুলভাবে তাঁরা অনুসন্ধান চালাতে লাগলেন। সে অনুসন্ধানের কোনও ফলই কিন্তু পাওয়া গেল না। ব্যাপারটার কোনও হদিস না পেয়ে তাঁরা ক্রমশ দিশাহারা হয়ে পড়লেন।
আজ পর্যন্ত দিশাহারা হয়েই তাঁদের থাকতে হত, যদি নিউ ইয়র্কের বাজারে মিল্ক, সেবল আর মাইন প্রভৃতি বিরল পশুলোমের দাম হঠাৎ অসম্ভব চড়ে না যেত।
যাত্রী-প্লেনটির খোঁজ না পেয়ে আমরা তখন জেটবম্বার-এ আমেরিকাতেই নেমে নিউইয়র্কের এক হোটেলে আছি। দিন দুই বাদে, বিলেতেই আবার আমাদের ফিরে যাবার কথা। মি. ডোনাট আমার সঙ্গে এক ঘরেই ছিলেন। সেদিন সকালবেলা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে তিনি কাগজটা ফেলে দিয়ে বললেন, এমন হুজুগে-জাত দুনিয়ায় নেই।
ইংরেজরা মনে মনে মার্কিনদের ওপর একটু চটা জেনে হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, মার্কিনদের আবার নতুন কী হুজুগ দেখলেন?
কাগজটা তুলে আমার হাতে দিয়ে ডোনাট বললেন, দেখুন না, এত বড় বড় কাণ্ড দুনিয়ায় চলছে, তার জায়গায় কোথায় ল্যাব্রাডরে পশুলোম দুষ্প্রাপ্য হয়েছে তাই নিয়ে কাগজে হইচই লাগিয়ে দিয়েছে। আবার কোন এসকিমো শিকারি কী আজগুবি গল্প বানিয়ে বলেছে তা-ও সবিস্তারে ছাপা হয়েছে।
কাগজটা পড়ে দেখলাম, ডোনাট ঠিকই বলেছে। সেবল, মিঙ্ক প্রভৃতি যেসব পশুলোম পৃথিবীর সেরা ধনীদের অত্যন্ত আদরের জিনিস, সেসব মেরুপ্রদেশ বিশেষ করে ল্যাব্রাডরের উত্তর-অঞ্চল থেকেই আমেরিকায় আসে। যারা ফাঁদ পেতে তুষার-অঞ্চলের এসব প্রাণী ধরে তাদের বলে-ট্র্যাপার। এবছর ট্র্যাপাররা তাদের শিকারের জায়গায় একটি প্রাণীর ল্যাজও দেখতে পায়নি। নানুক নামে সেখানকার একজন বুড়ো ট্র্যাপার নাকি এসকিমোদের কাছে এ বিষয়ে একটা আজগুবি গল্পও শুনে এসেছে। গল্পটা এই যে, ল্যাব্রাডরে এককালে যে-দেবতাদের ভয়ে কোনও সাদা মানুষ পা দিতে সাহস করত না, তাঁরা নাকি ফিরে আসছেন। পশুপাখিরা তাই ল্যাব্রাডর ছেড়ে পালাচ্ছে। এর পর মানুষকেও পালাতে হবে।
এ গল্পের সঙ্গে, পাশে আর একটা খবর পড়ে আমি কিন্তু উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, মি. ডোনাট, তৈরি হয়ে নাও। এখুনি আমাদের ল্যাব্রাডরে যেতে হবে।
তুমি কি পাগল হলে নাকি! মি. ডোনাট অবাক হয়ে বললেন, পরশু আমাদের বিলেতে যেতে হবে। এখন ল্যাব্রাডরে যাব কী!
হ্যাঁ, ল্যাব্রাডরেই আমাদের যেতে হবে। বম্বার নিয়ে যাদের ফিরে যাবার তারা যাক। সেনর গ্যালিকো আর যাত্রী-প্লেনের রহস্য যদি ভেদ করতে চাও তো আমার সঙ্গে চলো।
কিন্তু যাব কীসে? ল্যাব্রাডর তত আর বোস্টন শিকাগো নয় যে, ট্রেনে চেপে বসলেই হল।
যাব, প্লেন ভাড়া করে। তুমি তৈরি হও।
প্লেন ভাড়া করে সেইদিনই ল্যাব্রাডরের ব্যাটল হারবারে গিয়ে নামলাম। সেখান থেকে—বিশেষ ধরনে তৈরি, কতকটা শালতির মতো লম্বা মোটর-বোট ভাড়া করে হ্যামিলটন নদী দিয়ে চললাম ডাইক লেকের দিকে। ডাইক হ্রদে পৌঁছোবার আগে লবস্টিক হ্রদের কাছেই বিরাট হ্যামিলটন জলপ্রপাত। সেখান পৌঁছে মোটর-বোট ছেড়ে, হাঁটা-পথে রওনা হলাম একজন পথপ্রদর্শক নিয়ে। সে পথপ্রদর্শক আর কেউ নয়, নিউইয়র্কের কাগজে যার গল্প বেরিয়েছিল সেই এসকিমো ট্র্যাপার নানুক। ব্যাটল হারবারে নেমেই ফার অর্থাৎ পশুললামের ব্যবসাদারদের কাছে নানুকের খোঁজ করে জেনেছিলাম, হ্যামিলটন জলপ্রপাতের কাছে ট্র্যাপারদের প্রথম যে-চটি আছে, সেখানেই তাকে পাওয়া যাবে। ব্যবসা মন্দা হওয়ার দরুন সে আজকাল সেই চটির্তেই ফাইফরমাশ খেটে দিন কাটায়।
আমরা ডাইক লেকেরও উত্তরে যেতে চাই শুনে প্রথমে নানুক আমাদের পথ দেখাতে রাজিই হয়নি। ভালরকম বকশিশের লোভ দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে রাজি করাই। রাজি হয়েও তার বিস্ময় কিন্তু সে চেপে রাখতে পারেনি। ডাইক লেকের উত্তরে কোনও জানোয়ার পর্যন্ত আজকাল পাওয়া যায় না। সেখানে কী সুখে আমরা যেতে চাই?
তার কথার উত্তর না দিয়ে, পালটা প্রশ্ন করেছিলাম, হঠাৎ ও-অঞ্চলের অমন। দুর্দশা হবার কারণ কী?
নানুক এমনিতেই কম কথা বলে। এ-প্রশ্নের উত্তরে অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বলেছিল, গেলেই জানতে পারা যাবে।
জানতে সত্যিই শেষ পর্যন্ত পারা গেল। কিন্তু যা জানলাম তা সত্য, না স্বপ্ন, এখনও মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়।
