ব্যাপারটা সংক্ষেপে এই—কিছুদিন থেকেই ইংল্যান্ডের কর্তাব্যক্তিরা সন্দেহ করছিলেন যে অত্যন্ত চতুর কোনও গুপ্তচরের কারসাজিতে সামরিক বিভাগের অত্যন্ত গোপন সব সংবাদ কীভাবে যেন অদৃশ্য ছিদ্রপথে বার হয়ে যাচ্ছে। ঠিক আগের দিনই সে সন্দেহ যে মিথ্যা নয় তার নির্ভুল প্রমাণ পাওয়া যায়। দেশরক্ষা বিভাগের একজন বড়কর্তার সুরক্ষিত সিন্দুক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান এক তাড়া কাগজ আশ্চর্যভাবে উধাও হয়ে গেছে। ফাইলটি তার আগের দিনই সে-সিন্দুকে রাখা হয়। এ-ফাইলে এমন কিছু আছে, শত্রুপক্ষ যা জানতে পারলে শুধু ইংল্যান্ড নয়, ইউরোপেরও সর্বনাশ হয়ে যাবে। খবরের কাগজে এসব কথা জানানো যায় না। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ তাই গোপনে যা করবার সবই করেছে। ফাইল কীভাবে চুরি গেছে তারা এখনও বুঝতে পারেনি, কিন্তু ফাইল-এর সঙ্গে দেশরক্ষা বিভাগের অফিস থেকে নগণ্য যে একজন চাকর উধাও হয়ে গেছে, তার খোঁজ করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে গোখরোর সন্ধান তারা পেয়েছে। চুরির অপরূপ কৌশল দেখে তাদের ধারণা হয়েছে যে, বিশ্ববিখ্যাত গুপ্তচর সেনর গ্যালিকোরই কাজ এটা। কিন্তু সেনর গ্যালিকো বছর চারেক হল মারা গেছে বলে সবাই জানে। তা সত্ত্বেও এ মূল্যবান কাগজপত্র যেসব পথে ইংল্যান্ড থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, তার সবগুলির ওপরই গোয়েন্দা বিভাগ কড়া নজর রেখেছে। যে-প্লেনটি ক্রয়ডন থেকে আমেরিকায় রওনা হয়, তার যাত্রীদের মধ্যেও একজন গোয়েন্দাকে সেজন্য রাখা হয়। প্লেনটি ছাড়বার সময় তার সমস্ত যাত্রীর পরিচয়ই অবশ্য ভাল করে খুঁটিয়ে দেখা হয়। তাদের কারুর পরিচয়েই কোনও পুঁত পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও প্লেনটি ছেড়ে যাবার পরই গোয়েন্দা পুলিশ এমন একটি সূত্র পায়, যাতে মনে হয়, ওই প্লেনেই গুপ্তচর তার চুরির মাল নিয়ে পালিয়েছে। তৎক্ষণাৎ বেতার-টেলিগ্রামে প্লেনটিকে তাই ফিরে আসবার আদেশ দেওয়া হয়। প্লেনটি ফিরেও আসছিল, কিন্তু হঠাৎ মাঝপথে কী যে হয় কিছুই বোঝা যায় না। প্লেনটি ইংল্যান্ডের দিকে না এসে, আবার ওপারের দিকেই যাত্রা করে। আমেরিকা ও কানাডার পূর্ব-উপকুলের সমস্ত এবোডড্রাম ও সামরিক ঘাঁটিকেই তখন সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে প্লেনটির অপেক্ষায় সতর্ক থাকবার জন্য। গুপ্তচর যদি সেনর গ্যালিকোই হয়, তাহলে অবশ্য তার মতো ধড়িবাজ না বার করতে পারে, এমন ফন্দি নেই। বিরাট আমেরিকার পূর্ব উপকূলে যে কোনও জায়গায় নেমে সে। সরে পড়তে পারে। তাই আমেরিকার যেখানে যত ঘাঁটি আছে, তারা তো র্যাডার-স্ক্রিনে আকাশের সমস্ত দিকের ওপর কড়া নজর রাখছেই, আমাদের এই পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী সুপারসোনিক বম্বারও পেছনে ছুটছে তাকে ধরবার জন্য। যাত্রীবাহী প্লেনটি কয়েক ঘণ্টার সুবিধে পেয়েছে সত্য, কিন্তু তার দৌড় ঘণ্টায় বড়-জোর সাড়ে তিনশো মাইল। আমাদের জেট বম্বার যেভাবে দূরত্বকে গিলে খায়, তাতে কয়েক ঘণ্টার তফাত তার কাছে কিছু নয়।
কথাটা যে কতখানি সত্য, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। আমাদের র্যাডার-অপারেটার হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে জানালে, তার র্যাডার-স্ক্রিনে একটি উড়োজাহাজের সন্ধান সে পেয়েছে। আমরা যাকে শিকার করতে যাচ্ছি, সেই যাত্রীবাহী প্লেনটি বলেই মনে হয়। আমাদের বম্বারের বেগ, পাঁচশো থেকে ছশো মাইল বাড়িয়ে দেওয়া হল। আমরা আমেরিকার উপকূলের কাছে এসে পড়েছি। আর খানিক বাদে শুধু র্যাডার-স্ক্রিনে নয়, প্লেনটিকে চোখেই বোধ হয় দেখা যাবে।
মি. ডোনাট ও আমি তখন র্যাডার-যন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে তার স্ক্রিনের দিকে উদগ্রীব হয়ে চেয়ে আছি।
মি. ডোনাট বুঝি কিছুক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে সামনের কাঁচের ভেতর দিয়ে বাহিরের দিকে চেয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ওটা আবার কী!
চমকে মুখ তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে যা দেখতে পেলাম, তাতে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। উইন্ড-শিল্ডের কাঁচের ভেতর দিয়ে, সামনের সমস্ত আকাশটাই দেখা যায়। সেই আকাশ-পটের এক প্রান্ত থেকে একটি অদ্ভুত আকারের জিনিস প্রায় বিদ্যুৎগতিতে আমাদের সামনে দিয়ে দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল।
আমরা যা খালি চোখে দেখছি, র্যাডার অপারেটারও তার পর্দায় তার আভাস তখন পেয়েছে। অবাক হয়ে সে জিজ্ঞাসা করলে, এটা আবার কী ব্যাপার! বিরাট কোনও উল্কা নাকি!
উল্কা যে হতেই পারে না, তা তখন ভাল ভাবেই বুঝেছি। কিন্তু সুপারসোনিক জেট-বম্বারকে দ্রুতগতির পাল্লায় যা গোরুর গাড়ির মতো পেছনে ফেলে যেতে পারে—সে আকাশ-যান যে কী ও কাদের হতে পারে, ভেবে কোনও হদিস পেলাম না।
যত অদ্ভুত ব্যাপারই হোক, আমরা যে উদ্দেশ্যে চলেছি, তা ছাড়া অন্য কিছুতেই আমাদের মন দেওয়া তখন উচিত নয়। কিন্তু হঠাৎ সেদিকেও আশ্চর্যভাবে বাধা পাব কে জানত!
র্যাডার-স্ক্রিন থেকে বুঝতে পারছিলাম, আমাদের সামনের প্লেনটি আর বেশি দূরে নেই। বড়-জোর কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের মধ্যেই তাকে আমরা ধরে ফেলব। কিন্তু হঠাৎ আমাদের স্তম্ভিত করে র্যাডার-স্ক্রিনটা যেন ঝাপসা হয়ে গেল। যন্ত্রপাতির কোনও গোলযোগ মনে করে অপারেটার সব-কিছু প্রাণপণে পরীক্ষা করে দেখলে, কিন্তু সেখানে কোনও ত্রুটিই পাওয়া গেল না।
কয়েক সেকেন্ড বাদে, যেভাবে ঝাপসা হয়ে গেছল, সেইভাবেই পর্দা আবার পরিষ্কার হয়ে গেল বটে, কিন্তু চতুর্দিকে র্যাডার-তরঙ্গ পাঠিয়ে খোঁজ করেও আমাদের প্লেনটির আর কোনও পাত্তা পাওয়া গেল না। হঠাৎ প্লেনটি যেন শূন্য আকাশে হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেছে।
