কী করে আপনার কাছে যে ক্ষমা চাইব বুঝতে পারছি না, মি. দাস, কিন্তু আপনাকে একলা ফেলে এখুনি আমার না গেলে নয়। মি. ডোনাট যে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন তা তাঁর গলার স্বরেই বোঝা গেল।
তাঁকে আশ্বস্ত করে হেসে বললাম, আপনি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবেন না। পুলিশের চাকরির মজাই যে এই, তা কি আমি জানি না মনে করেছেন? এখন ব্যাপারটা কী? খুন-জখম নিশ্চয়?
খুন-জখম! মি. ডোনট একটু দুঃখের হাসি হেসে, টুপিটা মাথায় দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, খুন-জখম হলেই ভাল হত, তাহলে অন্তত এই এক সেকেন্ডের নোটিসে, তিন হাজার মাইল পাড়ি দিতে হত না।
আমার মাথাটি কথার শেষের এই ধাঁধায় গুলিয়ে দিয়ে মি. ডোনাট বেরিয়ে গেলেন। খাওয়ায় তখন আর আমার রুচি নেই, তবু গৃহস্বামীর মান রাখতে যথাসাধ্য সেদিকে মন দিয়ে ব্যাপারটার অর্থ বোঝবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু খানিক বাদেই অবাক হয়ে দেখি, মি. ডোনাট আবার ফিরে এসেছেন।
ঘরে ঢুকেই উত্তেজিতভাবে তিনি বললেন, আচ্ছা, মি. দাস, সের গ্যালিকো সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন?
হেসে বললাম, আমায় এমন সবজান্তা মনে করছেন কেন যে, দুনিয়ার যে-কোনও একটা নাম শুনলেই পরিচয় বলতে পারব?
মি. ডোনাট বেশ একটু অধৈর্যের সঙ্গেই বললেন, রসিকতার সময় নেই, মি. দাস। দু-এক মুহূর্তের দেরিতে হয়তো সমস্ত ইউরোপের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। সেনর গ্যালিকো সম্বন্ধে যা জানেন, বলুন তাড়াতাড়ি!
মি. ডোনাটের গলার স্বরে বুঝলাম, সত্যিই ব্যাপারটা গুরুতর। বললাম, সেনর গ্যালিকো সম্বন্ধে কী আপনি জানতে চান, বুঝতে পারছি না। গ্যালিকো তার শত নামের একটিমাত্র, এটা নিশ্চয় জানেন? দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত অত বড় গুপ্তচর যে জন্মায়নি, তা-ও নিশ্চয় আপনাকে বলে দিতে হবে না।
হ্যাঁ, সেসব জানি। কিন্তু গত যুদ্ধের শেষ দিকে প্লেন থেকে সাবমেরিনে ব্রেজিলে পালাতে গিয়ে সে যে সাবমেরিন-ড়ুবি হয়ে মারা যায় বলে খবর রটেছিল, তা সত্যি কিনা?
সেকথা তো আমার চেয়ে আপনাদেরই ভাল জানবার কথা।
মি. ডোনাট এবার বেশ বিরক্ত হয়েই উঠলেন, কেন মিছে কথা বাড়াচ্ছেন, মি. দাস! যদি কিছু জানেন তো, তাড়াতাড়ি বলুন।
মি. ডোনাটের বিরক্তিতে হেসে ফেলে বললাম, বেশ, বলছি শুনুন। সেনর গ্যালিকো সাবমেরিন-ড়ুবি হয়ে মারা যায়নি। নিজের মৃত্যুর মিথ্যে খবর রটিয়ে সে এতদিন বেশ বহাল তবিয়তে আর্জেনটাইনে কাটিয়েছে বলেই আমি জানি। কিন্তু এতবড় জরুরি খবর যার কাছে জেনে নিচ্ছেন, ব্যাপারটা আসলে কী, তার তা জানবার অধিকার নেই?
খুব আছে। সব কথা, যেতে যেতেই বলব। আসুন।
অবাক হয়ে বললাম, সে কী! আমি যাব কোথায়?
কোথায় তা এখনও জানি না। কিন্তু আপনাকে আসতেই হবে আমার সঙ্গে, মি. দাস। সেনর গ্যালিকোর ছদ্মবেশ ভেদ করে তাকে চেনার মতো দ্বিতীয় লোক এখন আর আমাদের হাতের কাছে নেই।
গাড়ি বাইরেই তৈরি ছিল। রাস্তার নিয়মকানুন, হেলায় লন্ডভণ্ড করে দিয়ে বিদ্যুদবেগে সে গাড়ি, মিনিট কয়েকের মধ্যেই দেখলাম, ক্রয়ডন এরোড্রোমেই আমাদের পৌঁছে দিলে।
সেখানে নেমে ব্রিটিশ সামরিক-বিভাগের যে মহাশয় ব্যক্তিটিকে দেখা গেল, ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর না হলে তিনি সশরীরে সেখানে হাজির থাকতেন না।
আমাকে দেখে মি. ডোনাটকে কাছে ডেকে তিনি নিচু-গলায় কী জেনে নিলেন, তারপর এগিয়ে এসে আমার করমর্দন করে বলেন, আপনি যে-সাহায্য আমাদের করতে এসেছেন, তার জন্য সমস্ত ইউরোপ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।
হঠাৎ শিবুর কাশিতে ঘনাদার কথায় ছেদ পড়ল। শিবুর কাশির ধরনটা সত্যি বড় বেয়াড়া। হাসি চাপতে গিয়ে কাশি বলে যদি কেউ তাকে সন্দেহ করে, তাকে খুব দোষ দেওয়া যায় না।
কাশি শুনেই ঘনাদার মুখের চেহারা যা হল তাতে মাঝনদীতে ভরাড়ুবি হবার ভয়ে আমরা সবাই শিবুর ওপর একেবারে মারমুখো হয়ে উঠলাম।
কাশবার আর সময় পেলি না! গৌর ধমকে উঠল।
অত যদি কাশি, তো বাসক সিরাপ খেলেই হয়। শিশির মন্তব্য করলে রূঢ়ভাবে।
কাশি পায় তো, বাইরে গিয়ে বোস! আমিও বকুনি দিতে ছাড়লাম না।
বলা বাহুল্য, শিবুর কাশি তৎক্ষণাৎ থেমে গেল এবং ঘনাদা শান্ত হয়ে আবার শুরু করলেন।
হেসে তখন বললাম, ইউরোপের কৃতজ্ঞতায় আমার কোনও লোভ নেই। গ্যালিকোর কাছে আমার একটা পুরোনো দেনা আছে শোধ দেবার, আমি সেই আশাতেই যাচ্ছি।
কিছু দূরে যে বিরাট অদ্ভুত চেহারার প্লেনটা দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দিকেই এবার সবাই অগ্রসর হলাম।
প্লেনের কাছে এসে দ্বিধাভরে দাঁড়িয়ে পড়ে সামরিক-বিভাগের বড়কর্তা আমায় বললেন, একটা বিপদের কথা কিন্তু আপনাকে আগে বোধহয় জানিয়ে দেওয়া দরকার, মি. দাস। মি. ডোনাট তাঁর দেশের জন্য কর্তব্যের ডাকে যাচ্ছেন, কিন্তু আপনি এসেছেন, স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে। যে প্লেনে আপনাদের পাঠাচ্ছি—
তাঁর কথায় বাধা দিয়ে হেসে বললাম, সেটা কয়েকদিন আগে টেমসের খাঁড়ির ওপর যে জেট-প্লেন ফেটে গিয়ে মি. জিওফ্রে ডে হ্যাভিল্যান্ড প্রাণ হারান, তারই যমজ বলা যায়। আমি দেখেই তা চিনেছি। সুতরাং আপনার সংকুচিত হবার কিছু নেই।
সামরিক বড়কর্তার নির্বাক বিস্ময়টুকু উপভোগ করেই প্লেনের ভেতরে গিয়ে উঠলাম।
শব্দের চেয়ে যা আগে ছোটে, সেই সুপারসোনিক জেট বম্বার-এ উল্কাবেগে অতলান্তিক সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে ডোনাটের কাছে সমস্ত ব্যাপারটাই ভাল করে জেনে নিলাম।
