ঘনাদার কিন্তু তবু ধনুকভাঙা পণ, প্লেনে তিনি কিছুতেই চড়বেন না।
অনেকক্ষণ ধরে রাজি করাবার চেষ্টা করে আমরা শেষ পর্যন্ত চটেই গেলাম। শিবু তো বলেই ফেললে, ঘনাদার বোধহয় ভয় করে প্লেনে!
ঘনাদা তার দিকে যে দৃষ্টিটা হানলেন, তাতে শিবুর ভস্ম হয়ে যাবার কথা। কিন্তু শিবুর বোধহয়, অ্যাসবেসটসের চামড়া। এ দৃষ্টির সামনেও বেশ অক্ষত থেকে সে আবার অম্লানবদনে জিজ্ঞাসা করলে, প্লেনে কখনও চড়েননি বুঝি ঘনাদা?
শুধু চোখের দৃষ্টিতে এ অপমানের উত্তর দেওয়া যায় না, তাই ঘনাদা এবার মুখ খুললেন। যতখানি সম্ভব অবজ্ঞার সঙ্গে বললেন, প্লেনে চড়া ছেড়ে দিয়েছি।
ছেড়ে দিয়েছেন? কী দুঃখে? এবার প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপটা শিশিরের।
এর ওপর আবার একটু ফোড়ন দিয়ে গৌর বললে, অত ধীরে-সুস্থে যাওয়া বোধহয় ঘনাদার পছন্দ না। ঘণ্টায় মাত্র তিন-চারশো মাইলে কি ঘনাদার পোয়!
আহা, তিন-চারশো কেন? শিবু প্রতিবাদ করলে, জেট-প্লেন তো রয়েছে! ঘণ্টায় শুনি, ছশো মাইলও ছাড়িয়ে যায়।
ঘণ্টায় ছশো মাইলের ওপর শুনেও ঘনাদার মুখে যে অবজ্ঞার হাসি ফুটে উঠল তাইতে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ঘনাদা যে জেট-প্লেনে চড়েছেন, তার বেগ বুঝি এর চেয়েও বেশি?
ঘনাদা আমাদের স্তম্ভিত করে বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু তা জেট-প্লেন নয়।
জেট-প্লেন নয়? তাহলে অন্য কোনও প্লেন তো বটে? আমরা হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলাম।
কয়েক সেকেন্ড আমাদের দিকে অনুকম্পাভরে তাকিয়ে ঘনাদা বললেন, না, প্লেন নয়, লাটু।
এই লাট্টু শুনেই বিস্ময়-বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে আমাদের মুখে আর কথাই সরল না।
ঘনাদাই এবার করুণা করে তাঁর মন্তব্য পরিষ্কার করে বললেন, হ্যাঁ, লাটু, কিন্তু সে শুধু চেহারায়। তবে লেত্তি দিয়ে লোহার আলবাঁধা যে লাট্টু ছেলেবেলা ঘুরিয়েছ সে লাট্টু নয়, অনেকটা ছোটদের খেলার কলের লাটুর মতো—চেপ্টা চাকতির মতো সেগুলো দেখতে।
এ পর্যন্ত শুনেই আমরা তখন পরে কী আসছে বুঝে, প্রস্তুত হয়ে বসে গেছি। আমাদের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে ঘনাদা শুরু করলেন, চার বছর আগে জানুয়ারি মাসের এক দুপুরবেলা ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় ত্রিশ জন যাত্রী নিয়ে যেতে যেতে একটি মাঝারি আকারের ড্যাকোটা বিমান আশ্চর্যভাবে যে নিখোঁজ হয়, এ খবর অনেকেরই হয়তো আর মনে নেই। এ দেশে না হোক, ইংল্যান্ডে ও আমেরিকায় এই নিয়ে তখন কিন্তু দারুণ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। এ-উত্তেজনা কিন্তু বেশি দিন থাকেনি। প্লেনের মালিকেরা ও মার্কিন সামরিক-বিভাগ একটা কৈফিয়ত দিয়ে সকলকে ঠাণ্ডা করে দিয়ে দিলেন। কৈফিয়তটা কিন্তু সম্পূর্ণ মিথ্যা।
উড়োজাহাজটির নিখোঁজ হওয়া সত্যিই একটু অদ্ভুত ধরনের। জল ঝড় নেই, প্লেনের যন্ত্রপাতির কোনও গোলমাল হয়নি, তবু একেবারে আমেরিকার কূলের কাছে এসে শূন্য-আকাশে সকলের চোখের সামনে যেন উড়োজাহাজটি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
সকলের চোখের সামনে কথাটা একটু ঘুরিয়ে বলছি মাত্র। সত্যি সত্যি চর্মচক্ষে দেখলেও, অন্তত দুটো এরোড্রোম ও একটি বোমারু বিমানের র্যাডার-স্ক্রিন তখন সেই প্লেনটির সমস্ত গতিবিধি লক্ষ করছে।
এই ঘটনার আধ মিনিট আগেও যাত্রীবাহী প্লেনটির সঠিক অবস্থান জানা গিয়েছে। ক্যানাডার পূর্বদিকে সমুদ্রের একেবারে ধারে—নোভা স্কোসিয়া। সেই নোভা স্কোসিয়ার লিভারপুলে, নয় হ্যালিফ্যাক্সের উড়োজাহাজের ঘাঁটিতেই যে প্লেনটি নামতে যাচ্ছে, সে কথাও তখন অজানা নেই। কিন্তু তারপরই লিভারপুল ও হ্যালিফ্যাক্স দুই জায়গার এরোড্রোমের র্যাডার-স্ক্রিন হঠাৎ অদ্ভুতভাবে নীরব হয়ে গেছে।
ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকা যাবার প্লেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ঘাঁটিতে না নেমে, নিরাপদ অবস্থাতেও ক্যানাডার মাটিতে কেন নামতে যাচ্ছিল সেটা একটা রহস্য মনে হতে পারে। যে কাহিনী বলতে যাচ্ছি, ওই রহস্যটুকু গোড়ায় না থাকলে তার সূত্রপাতই হত না।
ইংল্যান্ডের ক্রয়ডন এরোড্রোম থেকে উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশেই রওনা হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হবার পরই প্লেনের বেতার-যন্ত্রী একটি জরুরি আদেশ পায় ইংল্যান্ড থেকে—প্লেন যেন অবিলম্বে ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে আনা হয়।
আদেশের মর্ম না বুঝলেও, প্লেনের পাইলটের তা পালন করা অবশ্য কর্তব্য। ইংল্যান্ডের দিকেই আবার প্লেনের মুখ তাই ঘোরানো হয়, কিন্তু এ ব্যাপারে বিস্মিত ও বিরক্ত হওয়া যাদের পক্ষে স্বাভাবিক, সেই যাত্রীরা খানিক বাদেই বুঝতে পারে যে, কিছুদুর গিয়েই প্লেন আবার আমেরিকার দিকেই ফিরছে।
ব্যাপারটা তাদের কাছে দুর্বোধ হলেও, ইংল্যান্ডের সামরিক ও পুলিশ বিভাগের কর্তাদের কাছে তখন আর নয়।
সৌভাগ্য-কি-দুর্ভাগ্যক্রমে জানি না, ক্রয়ডনের পুলিশকর্তা মি. ডোনাটের বাড়িতে সেইদিনই আমি অতিথি। মি. ডোনাট এককালে নিউগিনির পোর্ট মোরেসবি বন্দরে কাজ করতেন। সেখানে গত যুদ্ধের আগে একটি জাপানি গুপ্তচরদের চক্রান্ত ধরে দেওয়ার ব্যাপারে আমি তাঁকে সাহায্য করেছিলাম। মি. ডোনাট সে ঋণের কথা ভোলেননি। যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে একরকম বেড়াতেই গেছি। কী করে জানি না, আমার খোঁজ পেয়ে ডোনাট সাদরে তাঁর বাড়িতে আমার নিমন্ত্রণ করে পাঠান।
সাদর নিমন্ত্রণ করলেও, অতিথির সম্মান রাখা সেদিন তাঁর ভাগ্যে নেই। খাবার টেবিলে বসে সবে সুপের প্লেট শেষ করেছি, এমন সময় পাশের ঘরে তাঁর ফোন বেজে উঠল। মি. ডোনাট বিরক্ত হয়েই খাবার ফেলে উঠে গেলেন, কিন্তু ফোন সেরে ফিরে যখন এলেন তখন তাঁর মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতো গম্ভীর।
