—ও-প্রমাণ চলবে না! আমরা অন্য প্রমাণ চাই। ওঝা-পুরুতদের কথায় সর্দারকেও অনিচ্ছাসত্ত্বে সায় দিতে হল।
যেন ব্যাপারটা নেহাত তুচ্ছ এমনই ভাবে বললাম, বেশ, চাঁদ থেকেই আজ রাত্রে প্রমাণ পাবে?
আমার নিশ্চিন্তভাব দেখে বেশ একটু হতভম্ব হয়ে জংলিরা নিজেদের মধ্যে গিয়ে জটলা শুরু করার পর ড. হিল হতাশভাবে বললেন, এটা কী করলে, দাস! যদিবা শুধু পুড়িয়ে মারত, এখন যে গায়ের ছাল জ্যান্ত ছাড়িয়ে নেবে! চাঁদের ধাপ্পাটা কেন মিছে দিতে গেলে।
হেসে বললাম, আপনার কোনও ভয় নেই। চাঁদের প্রমাণ আমি সত্যি দেব দেখবেন!
হতাশভাবে আমার দিকে চেয়ে তিনি বললেন, না, ভয় ভাবনায় তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে দেখছি। চাঁদের আবার কী প্রমাণ হতে পারে!
আজ কী তারিখ আপনার মনে নেই, নইলে প্রমাণটা বুঝতে পারতেন।
ড. হিল খানিক বিমূঢ় হয়ে থেকে হঠাৎ প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, ওঃ, ভুলেই গেছলাম! আজ তো এখানে চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে।
হেসে বললাম, হ্যাঁ, ওর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!
কিন্তু ভাগ্য যে তখনও আমাদের ওপর অত বিরূপ তা কী করে জানব।
সন্ধে হতে না হতেই কোথা থেকে রাশি রাশি মেঘ এসে আকাশ ছেয়ে ফেলতে লাগল। ওঝা-পুরুতদের আস্ফালন তখন দেখে কে! তারাই নিজেদের ভেলকিতে মেঘ আকাশে তুলছে বলে সর্দারকে তখন বোঝাচ্ছে।
অগ্নিমূর্তি হয়ে সর্দার আমাদের কাছে এসে এবার বললে, কই, কোথায় তোমাদের চাঁদের প্রমাণ—দেখাও!
ভেতরে ভেতরে নাড়ি তখন প্রায় ছাড়বার উপক্রম, তবু বাইরে বেপরোয়া সাহস দেখিয়ে বললাম, তোমার ওঝা-পুরুতদের কিছু ক্ষমতা আছে মানছি, কিন্তু চাঁদের মানুষের তেজ যে কত বেশি, আর একটু বাদেই টের পাবে!
আমাদের সামনে একটা আধ-পোড়া মশাল মাটিতে পুঁতে দিয়ে সর্দার বললে, বেশ, এই মশাল যতক্ষণ না-নেভে ততক্ষণ তোমাদের সময় দিলাম। তারপর জ্যান্ত তোমাদের কলিজা কেটে বার করব।
তা-ই কোরো, বলে বেশ জোরে জোরেই হাসলাম। মনে মনে তখন জপছি, হে আকাশের দেবতা, দয়া করে একটা ঝড় তুলে মেঘগুলোকে তাড়াও। নইলে আর যে রক্ষা নেই।
আকাশের দেবতার দয়া করার কোনও লক্ষণ কিন্তু দেখা গেল না। মেঘগুলো যেন আরও গাঢ় হয়েই জমতে শুরু করল।
মশালটা প্রায় তখন শেষ হয়ে এসেছে। সেই দিকেই চেয়ে ইষ্টনাম স্মরণ করবার চেষ্টা করছি, এমন সময় ছলাৎ করে একটা শব্দ শুনে ফিরে দেখি, কাঁচের জারের মধ্যে রাখা একটা মাছ কী রকম যেন ছটফট করছে।
ড. হিল নিজের ভাগ্য তখন বোধ হয় মেনে নিয়েছেন। একটু দুঃখের হাসি হেসে বললেন, মাছটাও আমাদের পরিণাম বোধ হয় বুঝতে পেরেছে।
কয়েক মুহূর্ত মাছটার দিকে চেয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলাম, না, ড. হিল, আর ভয় নেই। মাছটা আমাদের পরম বন্ধু, আমাদের উদ্ধারের পথই বাতলাচ্ছে।
তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকলাম, কোথায় সর্দার। কোথায় সব ওঝা-পুরুত, চাঁদের মানুষের তেজটা একবার দেখে যাও।
সবাই অবাক হয়েই কাছে ছুটে এল।
উচ্চৈঃস্বরে হেসে বললাম, সামান্য একটা মেঘ দিয়ে আকাশ ঢেকে তোমার ওঝা-পুরুতেরা বাহাদুরি নিচ্ছিল সর্দার। চাঁদের মানুষ এবার এই পাহাড়-জঙ্গল দুলিয়ে দিচ্ছে দেখো।
ওঝারা চেঁচিয়ে উঠল, সব মিথ্যে কথা! সব ধাপ্পা!
জংলিরা খেপে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আর কী! এমন সময় মাটির তলা থেকে অদ্ভুত একটা প্রচণ্ড গোঙানির শব্দ যেন শোনা গেল। পরমুহূর্তে সমস্ত পাহাড়টা ঢেউ-এর মাথায় নৌকার মতো দুলে উঠল আর সেই কিভু হ্রদের জল লাফ দিয়ে তীর ছাপিয়ে উপচে পড়ল বিশাল স্রোত হয়ে।
সেই প্রচণ্ড ভূমিকম্পে ভয়ে দিশাহারা হয়ে জংলিরা কে যে কোথায় পালাল ঠিক নেই। ভূমিকম্প যখন থামল তখন দেখি, আমরাই শুধু আমাদের মালপত্রের মধ্যে প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছি, আর কিভু হ্রদের এক পাড় ভেঙে দুরন্ত এক নদীর স্রোত নীচে বয়ে যাচ্ছে।
ঘনাদা গল্প শেষ করে থামবার পর শিবু জিজ্ঞাসা করলে, ওই মাছের ছটফটানি দেখেই ভূমিকম্পের কথা টের পেলেন নাকি? কী মাছ সেটা?
ওদেশের একরকম মাগুর মাছ, গম্ভীরভাবে বললেন ঘনাদা, ইংরেজিতে বলে cat fish. জাপানে থাকতে ও-মাছের ক্ষমতার কথা জেনেছিলাম। জাপানে তো ভূমিকম্প নিত্য লেগেই আছে। সেখানকার বৈজ্ঞানিকেরা লক্ষ করে দেখেছেন, ভমিকম্পের ঠিক আগে মাগুর-জাতের মাছ কী করে যেন তা টের পেয়ে অদ্ভুতভাবে ছটফট করে। অনেকে সেখানে তাই ভূমিকম্প আগে থাকতে ধরবার জন্যে মাগুর মাছ পোষে।
লাট্টু
ঘনাদা গম্ভীরভাবে বললেন, না, প্লেন নয়, লাট্টু।
কোন সূত্রে আমাদের একেবারে থ করে দিয়ে ঘনাদা একথা বললেন, সেইটে আগে তাহলে বলি।
পুজোর সময় দার্জিলিং যাবার কথা হচ্ছিল। ট্রেনে যাওয়ার হাঙ্গামও যত, সময়ও তত বেশি লাগে। তাই প্লেনেই যাবার ব্যবস্থা ঠিক করছিলাম। ট্রেনেই হোক আর প্লেনেই হোক ঘনাদার পক্ষে একই কথা হওয়া উচিত। কারণ, আসলে পরস্মৈপদী হয়ে তিনি আমাদের ঘাড়ে চড়েই যাবেন। ঘাড় অবশ্য আমরা সাধ করেই পেতে দিয়েছি। বিদেশে তিনি সঙ্গে থাকলে একটু ভাল জমবে বলে। কিন্তু প্লেনের নাম শুনেই তিনি এমন বেঁকে দাঁড়াবেন কে জানত!
গৌর একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, প্লেনে যেতে আপনার আপত্তিটা কী? কোথায় একরাত একবেলা টিকিয়ে টিকিয়ে যেতেন, তার বদলে ঘন্টা-দেড়েকেই সব ঝামেলা শেষ।
