এই ক-দিন জংলিদের যে ঢাকের খবর শুনেছি তার লক্ষ্য যে ড. হিল স্বয়ং, এ কথা বোধহয় আর বলে দিতে হবে না।
কঙ্গোর এই অঞ্চলে ভৌগোলিক অভিযানে এসে শুধু নিজের ভালমানুষির দরুন তিনি এখানকার ভয়ংকর জংলিদের বিষ-দৃষ্টিতে পড়েছেন।
এ অঞ্চলের জংলিরা এখনও সেই আদিমতম যুগে পড়ে আছে। তাদের জঙ্গলের বাইরে কোনও দুনিয়া আছে বলে তারা জানে না। ঘুরতে ঘুরতে তাদের এক গাঁয়ে ড. হিল গিয়ে পড়েন। ড. হিলকে তারা প্রথমে অদ্ভুত এক জাতের মানুষ ভেবে একটু সমীহই করেছিল। তাঁকে ও তাঁর লোকজনকে আশ্রয় দিয়েছিল সসম্মানে। ড. হিল সেখানে পরোপকার করতে গিয়েই নিজের সর্বনাশ করলেন।
সে-গাঁয়ের সর্দার বহুদিন ধরে মাথা ধরার রোগে ভুগছিল। গাঁয়ের ওঝা-পুরুতেরা নানারকম ঝাড়ফুঁক করে ভূত প্রেত মানত করেও তাকে ভাল করতে পারেনি। ড. হিল দেখে-শুনে একটি অ্যাসপিরিন বড়ি দিয়ে একদম তাকে চাঙ্গা করে তোলেন। আর যাবে কোথায়? সর্দারের কাছে তাঁর খাতির যেমন দশগুণ বেড়ে গেল, গাঁয়ের ওঝা-পুরুতেরাও তেমনই তাঁর ওপর খাপ্পা হয়ে উঠল হাজার গুণ। জংলিদের মধ্যে তাদের মান-ইজ্জত বজায় রাখবার জন্যে ওঝা-পুরুতেরা না করতে পারে হেন শয়তানি নেই। ভাগ্যচক্রে তাদের একটা সুবিধেও হয়ে গেল। কী একটা ছোঁয়াচে রোগে গাঁয়ের কয়েকটা গোরু বাছুর তখন মারা গেছে। ওঝারা রটিয়ে দিলে যে, ড. হিলই তাঁর যাদুতে এইসব গোরু বাছুর মারছেন। প্রথমে গোরু বাছুর, তারপর মানুষ মারাই তাঁর মতলব। সর্দারকে পর্যন্ত তারা তা-ই বোঝালে।
বেগতিক দেখে দলবলসুদ্ধ লুকিয়ে পালাতে গিয়েই ড. হিল আরও বিপদ ডেকে আনলেন। তিনি কোনও রকমে তাদের চোখ এড়িয়ে এই পাহাড়ে এসে পৌঁছোলেন বটে, কিন্তু তাঁর লোকজন সব কচুকাটা হয়ে গেল। এখানে পালিয়ে এসেও অবশ্য তাঁর রক্ষা আছে বলে মনে হয় না। ঢাকের খবরে চারিদিকের জংলিদের যেভাবে তারা জাগিয়ে তুলেছে, তাতে শেষ পর্যন্ত তাদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সেদিনও সারারাত.ঢাকের যা আওয়াজ শুনলাম তাতে মনে হল—ধীরে ধীরে চারিদিক ঘেরাও করে তারা এই পাহাড়ের দিকেই ক্রমশ এগিয়ে আসছে। এখন তাদের বেড়াজাল থেকে পালাবার একমাত্র উপায় এই দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে পুবদিকে টাঙ্গানাইকায় নামবার চেষ্টা করা।
মাঝরাত্রের পর ডাকের আওয়াজ কিছুক্ষণের জন্যে থামতে দেখে মনে একটু আশাও হল। হয়তো তারা ভোরের আগে আর অগ্রসর হবে না। লোকজনকে তুলে ড. হিলকে সঙ্গে নিয়ে রাতারাতি তাই রওনা হয়ে পড়লাম।
কিন্তু বেশিদূর আর যেতে হল না। সকালবেলা কিভু হ্রদের ধারে গিয়ে সবে পৌছেচি, এমন সময় সমস্ত পাহাড়-জঙ্গল যেন একসঙ্গে বজ্রের হুংকার দিয়ে উঠল। চমকে দেখি, রংবেরঙের বিদঘুটে উলকি-আঁকা হাজার-হাজার জংলি, ঢাল আর বল্লম হাতে যেন ভোজবাজিতে মাটি খুঁড়ে উঠে আমাদের ঘিরে ধরেছে।
তারপর যে দারুণ কাণ্ড শুরু হল তা আর বর্ণনা করা যায় না। ওঝা-পুরুতের লম্ফঝম্পই সবচেয়ে বেশি। আমাদের পিছমোড়া করে বেঁধে আমাদেরই মালপত্রের মধ্যে ফেলে রেখে তারা যে তাণ্ডবনৃত্য ও আস্ফালন শুরু করল তা থেকে বুঝলাম, আমাদের সোজাসুজি পুড়িয়ে মারা হবে, না, ফুটন্ত কড়াই এ সেদ্ধ করা হবে—এটুকু তারা এখনও ঠিক করতে পারছে না। জংলি কাঠের আগুনে বড় বড় কড়াই তখনই কিন্তু চাপানো হয়ে গেছে।
দুপুরের পর স্বয়ং সর্দার আসরের মাঝে দেখা দিলে। চোখের চেহারা ও ঘন ঘন নিজের কপাল টেপা দেখে বুঝলাম, আপাতত একটা অ্যাসপিরিন পেলে সে বর্তে যায়। শুধু ওঝা-পুরুতের কাছে ছোট হবার ভয়েই বোধ হয় সোজাসুজি এসে চাইতে সাহস করছে না।
জংলি হলেওসর্দার একেবারে অকৃতজ্ঞ নয়। মাথাধরা সারানোর জন্য ড. হিলের ওপর তার মনটা একটু নরমই ছিল। এগিয়ে এসে তাই ড. হিলকে সে জিজ্ঞাসা করলে, কড়াই-এ সেদ্ধ হয়ে, না, সোজা আগুনে পুড়ে তিনি মরতে চান—এইটুকু বেছে নেবার সুযোগ দিয়ে সে তাঁকে অনুগ্রহ করতে চায়।
দুনিয়ায় আর সব জায়গার মতো এই জংলিদের মধ্যেও ভড়ং আর চালের দামই সবচেয়ে বেশি।
পিছমোড়া অবস্থাতেই যতদূর সম্ভব ভারিক্কি চালে ড. হিলের হয়ে গম্ভীর ভাবে বান্টু ভাষায় বললাম, আমাদের সেদ্ধ করে, কি পুড়িয়ে মারার আগে তোমার একটু মাথা ধরার যাদু-দাওয়াই পেলে ভাল হয় নাকি?
ওঝা-পুরুতরা তৎক্ষণাৎ হাঁ হাঁ করে উঠল। ও যাদু-দাওয়াই সর্দার যেন কিছুতে না খায়। গোড়ায় ভাল হলে কী হবে, ও-দাওয়াই শেষে সর্বনাশা বিষ হয়ে উঠবে।
সর্দার কিন্তু একটু যেন দোমনা হয়েছে বুঝে হেসে বললাম, এত যাদের হম্বিতম্বি, সেই তোমার ওঝা-পুরুতরাই তাহলে মাথা ধরার একটা যাদু-দাওয়াই দিক দেখি।
সর্দার আর একটু নরম হয়েছে বুঝেই তৎক্ষণাৎ ড. হিলকে দেখিয়ে বললাম, কটা ভণ্ড ওঝা-পুরুতদের কথায় কাকে তুমি খেপিয়ে তুলছ জানো! রং আর চেহারা দেখে বুঝতে পারছ না যে, এই জঙ্গল-পাহাড় নয়, উনি সেই আকাশের চাঁদ থেকে দয়া করে এখানে নেমেছেন?
চাঁদ থেকে নেমে এসেছেন? একবার ড. হিলের দিকে, একবার আকাশের দিকে চাওয়ার ধরন দেখে বুঝলাম, সদার বেশ কাবু হয়েছে।
ওঝা-পুরুতরাও তাই বুঝেই মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, সব বাজে কথা! চাঁদ থেকে নেমে এসেছেন তার প্রমাণ কী?
প্রমাণ ওঁর চেহারা! দেখতে পাচ্ছ না ওঁর গায়ের রং!
