চারদিনের দিন কিভু হ্রদের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছোলাম। আশপাশের ঘন কাঁটা-ঝোঁপে ভর্তি দুর্ভেদ্য জঙ্গলের চেহারা দেখে মনে হল, গোরিলাদের আস্তানা খুব দূরে নেই। সুবিধে মতো একটা জায়গা দেখে সন্ধের আগেই তাঁবু ফেলে একটু একটু এদিক-ওদিক জঙ্গলটার অবস্থা বুঝতে বেরুলাম। গোরিলা শিকার করা দস্তুরমতো কঠিন ব্যাপার, কিন্তু জ্যান্ত গোরিলা ধরা তার চেয়েও অনেক শক্ত। বড় ধাড়ি গোরিলাকে জ্যান্ত ধরা তো অসম্ভব বললেই হয়। এমনিতে তারা মানুষ দেখলে গা ঢাকা দিয়ে এড়িয়েই যায়, নিজে থেকে কখনও আক্রমণ করে না। কিন্তু একবার ঘাঁটালে আর রক্ষে নেই। তখন তাদের মতো হিংস্র ভয়ংকর প্রাণী পৃথিবীতে আর দেখা যায় না। একেবারে অব্যর্থভাবে গুলি না মারতে পারলে তাদের রোখা তখন অসম্ভব। শিকারির নাগাল একবার পেলে, ঢাকের মতো নিজের বুক চাপড়াতে চাপড়াতে এসে তাকে পাঁকাটির মতো মটকে ভেঙে দিতে পারে।
ধাড়ি গোরিলা ধরার আশা তাই কেউ করে না। ধরতে হলে বাচ্চা গোরিলাই ধরবার চেষ্টা করতে হয়। বাচ্চা গোরিলাকে একা-একা পাওয়া কিন্তু শক্ত। ছোট-ছোট পরিবারে ভাগ হয়ে গোরিলারা দলবদ্ধ হয়েই দিনের বেলা গাছের ফলমূল খেয়ে বেড়ায়। রাত্রে ধাড়ি গোরিলা কোনও গাছের তলায় পাহারায় থাকে, আর বাচ্চা আর মেয়ে গোরিলারা গাছের ওপর ডালপালা দিয়ে তৈরি মাচার মতো বাসায় ঘুমোয়। কোনও রকমে কোনও বাচ্চা কোথাও একবার ছটকে না পড়লে তাকে ধরা তাই কঠিন।
পরের দিন কীভাবে কোন দিক দিয়ে গোরিলা ধরবার ব্যবস্থা করব তাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবছি, এমন সময় জুগন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে যা বললে তাতে আমি একেবারে থ হয়ে গেলাম।
সে নাকি আমাদেরই তাঁবু থেকে কিছু দূরে পাহাড়ের এক গুহার মধ্যে একটা গোরিলাকে যেতে দেখেছে। সে গোরিলাটা নাকি দেখতে কতকটা সাদা রঙের।
সাদা রঙের গোরিলাই তো অসম্ভব আজগুবি ব্যাপার! তবু সন্ধ্যার আবছা-অন্ধকারে জুগনের দেখবার কোনওরকম ভুল হয়েছে ভাবা যেতে পারে। কিন্তু গোরিলা একা-একা গুহায় থাকে এরকম কখনও শুনিনি। না, ব্যাপারটার সন্ধান নিতেই হয়।
জুগনকে সঙ্গে নিয়ে সেই গুহার মুখে যখন পৌঁছোলাম তখন চারিদিকে বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে।
গুহাটা খুব বড় নয়। পাহাড়ের গায়ে একটা বড় ফাটলের মতো। কিন্তু ভেতরটা একেবারে জমাট অন্ধকার। সেই অন্ধকার গুহায় গোরিলার মতো সাংঘাতিক প্রাণীর খোঁজে ঢোকা প্রায় আত্মহত্যা করারই সামিল।
প্রথমে তাই গুহার মুখে বারকয়েক বন্দুকের আওয়াজ করলাম। ভয় পেয়ে যদি গুহা থেকে বেরিয়ে পড়ে। তাতে কোনও ফল না পাওয়ায় একটা শুকনো কাঠ মশালের মতো জ্বেলে নিয়ে বাধ্য হয়েই ভেতরে ঢুকলাম।
ফাটলটা খানিকটা সোজা গিয়ে, ডানদিকে বেঁকে গেছে। সামনে আমি বন্দুক হাতে সন্তর্পণে এগুচ্ছি। পেছনে জুগন মশাল হাতে আসছে। গোরিলাটা যদি হঠাৎ ঝাঁপিয়ে আসে, গুলি অন্তত একটা চালাব। তারপর যা হয় হোক। বাঁকটা ঘুরেই কিন্তু স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এই কি জুগনের গোরিলা?
পেছনে পাথরের দেয়ালে আটার মতো লেপ্টে সভয়ে আমাদের দিকে চেয়ে যে দাঁড়িয়ে আছে, তার রং সাদা এবং চেহারা বিরাট হলেও গোরিলা সে নয়।
আমাদের থামতে দেখে হাতে পিস্তলটা উঁচিয়ে সে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বললে, খবরদার! এক পা এগিয়েছ কি গুলি করব।
ততক্ষণে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। হেসে বললাম, তাতে কি কেউ জখম হবে মনে করেছেন, ড. হিল! আপনার তাগ যে কত তা তো আমার জানা!
অবাক হয়ে পিস্তল নামিয়ে ড. হিল এবার এগিয়ে এসে বললেন, এ কী, দাস? তুমি এখানে?
গম্ভীর হবার ভান করে বললাম, নিয়তির টানে বোধহয়। নইলে কোথায় দক্ষিণ আমেরিকার ব্রেজিলের জঙ্গল, আর কোথায় আফ্রিকার কঙ্গোর সীমান্ত। পাঁচ বৎসর বাদে আচমকা এমন আশ্চর্যভাবে দেখা হবে কেন?
ড. হিল কৃতজ্ঞভাবে বললেন, হ্যাঁ, সেবারে তুমি হঠাৎ উদয় না হলে প্রাণটা সেখানে রেখে আসতে হত বটে।
হেসে বললাম, আপনার বন্দুকের টিপ কী রকম সেইখানেই তো টের পাই। কুমির মারতে গিয়ে প্রায় আমাকেই মেরে বসেছিলেন।
তা প্রায় বসেছিলাম বটে, বলে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ড. হিল বললেন, তবে এবার তোমার সঙ্গে দেখা হয়েও কোনও লাভ হল না, দাস। এবার আমায় বাঁচানো তোমার ক্ষমতার বাইরে।
আচ্ছা, আসুন তো আমার সঙ্গে, তারপর দেখা যাবে, বলে ড. হিলের হাত ধরতেই তিনি বাধা দিয়ে বললেন, আমায় সঙ্গে নেওয়া মানে, তোমার নিজের সমূহ বিপদ ডেকে আনা, তা তো বুঝতে পারছ?
গুহার ভেতরেও জংলিদের সুদূর ঢাকের আওয়াজ তখন শোনা যাচ্ছে। একমুহূর্ত চুপ করে থেকে হেসে বললাম, গায়ে পড়ে বিপদ ডেকে আনাই যে আমার বাতিক
তা কি এতদিনে বোঝেননি, ড. হিল?
ড. হিলকে নিজের তাঁবুতে এনে তারপর তাঁর কাছে সমস্ত কাহিনীই শুনলাম।
ড. হিলকে ভূগোল-বিলাসী বললে বোধহয় ঠিকভাবে বোঝানো যায়। জীবনে তিনি বন্দুকটা পর্যন্ত ভাল করে চালাতে শেখেননি, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্গমতম জায়গা আবিষ্কার করা তাঁর একটা নেশা। আমাজন নদীর উৎসের কাছে পাঁচ বৎসর আগে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। তাঁর ধারণা, সেবারে আমিই নাকি আমাজন নদীর বিদঘুটে এক অ্যালিগেটর কুমিরের কবল থেকে তাঁকে বাঁচাই।
ড. হিলের সমস্ত কথা শুনে এবারে তাঁকে বাঁচানো এবং সেই সঙ্গে নিজেদের বাঁচবার ব্যবস্থা করা কিন্তু সত্যিই কঠিন বলে মনে হল।
