যে জায়গাটায় সেদিন বিশ্রাম করবার জন্যে তাঁবু ফেলেছিলাম, সেখানে এই জঙ্গল অনেকটা হালকা হয়ে সাভানা অর্থাৎ ঘাসের প্রান্তর শুরু হয়েছে। এই ঘাসও অবশ্য যেমন-তেমন নয়। ছ-ফুট উঁচু একটা জোয়ান মানুষ তার ভেতর অনায়াসে ড়ুবে যায়। একটা প্রকাণ্ড বাওবাব গাছের তলায় বেশ খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে আমাদের আস্তানা পাতা হয়েছিল। আফ্রিকার জঙ্গলে শিকারে বেরুনোকে বলে সফরি। আমাদের সফরিতে লোকজন তো বড় কম নয়! আসবাবপত্র, রসদ ও জন্তু-জানোয়ারের খাঁচা বাক্স ইত্যাদি বইবার জন্যেই একশো-জন কাফির জাতের মুটে আছে, তার ওপর আছে পাঁচজন মাসাই জাতের শিকারি।
এ অঞ্চলে সিংহের উপদ্রব খুব বেশি বলে আস্তানার চারদিকে চারটে আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা করে ও পালা করে দুজন শিকারিকে পাহারায় রেখে সবে তখন নিজের তাঁবুতে এসে শোবার বন্দোবস্ত করছি।
আমার তাঁবুতে দু-চারটে দামি পাখির খাঁচা ও মাছ-গিরগিটি ধরনের দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর কাঁচের জারগুলো সাধারণত থাকে। একটা মাছের জার কী করে ভেঙে ফুটো হয়ে সমস্ত জলটা দেখলাম মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে। মাছটা কাঁচের জারের তলায় খাবি খাচ্ছে দেখে সেটাকে অন্য একটা জারে তুলে রেখে জল ঢালছি, এমন সময়ে জুগন এসে ঘরে ঢুকল।
জুগন আমার সবচেয়ে বিশ্বাসী অনুচর ও সমস্ত কাফির-কুলি ও মাসাই-শিকারিদের সর্দার। যেমন দৈত্যের মতো তার চেহারা, সাহসও তেমনই অসীম। খাটো একটা বল্লম হাতে মানুষখেকো সিংহের সামনে সে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে পারে। চোখে দেখা যায়—এমন কোনও প্রাণীকে সে গ্রাহ্যই করে না। কিন্তু তার সব সাহস শুধু দিনের বেলায়। রাত হয়েছে কি—একটা পাতা নড়লেও ভূত প্রেত জুজুর ভয়ে সে আঁতকে ওঠে। যাদের ধরা-ছোঁয়া-দেখা যায় না সেই অশরীরী জীবেরা সেই সময়েই তার মতো শিকারিদের ঘাড় মটকাবার জন্যে ওত পেতে থাকে বলে তার ধারণা।
জুগনের মুখ-চোখের ভাব দেখেই বুঝলাম, রীতিমতো ভয় পেয়েই সে এতরাত্রে আমার তাঁবুতে ঢুকেছে।
আবার কোন জুজু কোথায় দেখেছে বলে তাকে ঠাট্টা করতে যাচ্ছি, এমন সময় নিজেই একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়ে চমকে গেলাম।
ভাঁটার মতো চোখগুলো বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে সভয়ে জুগন বললে, শুনতে পাচ্ছেন, বোয়ানা?
শুনতে তখন ভালরকমই পেয়েছি। না, সিংহ কি খ্যাপা হাতির ডাক নয়। অন্ধকার রাত্রির কোনও সুদূর প্রান্ত থেকে সমস্ত আকাশের বুক কাঁপিয়ে অস্ফুট একটা ভয়ের স্পন্দন যেন উঠছে—গুম গুম গুম।
একদিকে সে শব্দ শেষ না-হতে আরেক দিকে সে শব্দের অবিকল প্রতিধ্বনি শুরু হয়ে গেল। সে প্রতিধ্বনি তারপরেই অন্য আর এক দিক-প্রান্ত ধরে নিতে দেরি কবলে না। এমনই সে শব্দ যে, অন্ধকার আকাশের এককোণ থেকে আর-এককোণে কোনও অদৃশ্য বিরাট দৈত্য যেন লোফালুফি করছে মনে হল।
ভাল করে খানিকক্ষণ শুনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কিছু বুঝলে, জুগন?
জুগন সভয়ে বললে, হ্যাঁ, বোয়ানা। বলছে, দেবতার দুশমন, শয়তানকে চাই। কোনও পাহাড়-জঙ্গল তাকে লুকিয়ে রাখতে পারবে না। তেলের কড়া তৈরি।
বললাম, ঠিকই বুঝেছ, তবে আর-একটু মন দিয়ে শোনো! বুঝবে, শুধু শয়তান নয় বলছে, সাদা শয়তানকে চাই।
আর একবার কান পেতে জুগন আমার কথায় সায় দিয়ে বললে, সাদা শয়তানই বলছে বটে, বোয়ানা। কিন্তু কার কথা বলছে বুঝতে পারছি না। আমাদের নয় তো?
এবার হেসে বললাম, তোমাদের কথা তো বাদই দিলাম। কাফ্রিদের মধ্যেও আমাকে সাদা শয়তানকানা না হলে কেউ বলবে না। সুতরাং আক্রোশটা যার ওপরই হোক, আমরা নির্ভয়ে থাকতে পারি।
ইতিমধ্যে ওই শব্দের অল্পবিস্তর মানে বুঝে আমায় কাফির কুলি ও মাসাই শিকারিদের অনেকে সভয়ে আমার তাঁবুর সামনে এসে জড়ো হয়েছিল। তাদেরও ওই কথাই বলে রাত্রের মতো বিদায় করলাম।
মুখে ওদের অভয় দিলাম বটে, কিন্তু সারারাত দুর্ভানায় ভাল করে ঘুমোতে পারলাম না। আফ্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় যাদের আছে, এ-শব্দের অসামান্য ক্ষমতা ও ভয়ংকর মর্ম তারা ভাল করেই জানে। এশব্দ আফ্রিকার অত্যাশ্চর্য নিজস্ব জিনিস। আসলে বিশেষ এক ধরনের বিরাট ঢাকের শব্দ ছাড়া এ-আর কিছু নয়। কিন্তু যে-দেশের দুর্ভেদ্য জঙ্গলে, দশ মাইল দূরের গাঁয়ের লোকেরা পরস্পরের ধারে কাছে ঘেঁষে না ও পরস্পরের ভাষা বোঝে না, সেই দেশে এই ঢাকের শব্দের মারফত টেলিগ্রাফের মতো তাড়াতাড়ি শতশত মাইল দূর-দূরান্তরে খবর পাঠিয়ে দেওয়া যায়। এ-ঢাকের শব্দের নিজস্ব একটা ভাষা আছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের এবং ভিন্ন ভাষার লোকেরা এই ঢাকের ভাষা অনায়াসে বুঝতে পারে। এ-ঢাকের শব্দ বিলি করবার ব্যবস্থাও অদ্ভুত। এক গাঁ থেকে ঢাকের শব্দ শোনামাত্র অন্য গাঁ তৎক্ষণাৎ সে-খবর ঢাকের আওয়াজে প্রচার করে দেয়। এমনই করে দেখতে দেখতে বহুদূরে সে খবর ছড়িয়ে যায়। কারুর বিরুদ্ধে এ-ঢাক যদি একবার বেজে ওঠে, তা হলে যতদূরে পালাক, এ-ঢাকের নাগাল থেকে পরিত্রাণ পাবার আশা নেই।
বহুদিন আফ্রিকার বহু জায়গায় ঘোরার দরুন এ-ঢাকের ভাষা আমি ভাল করেই বুঝি! আপাতত ঢাকের খবর যা শুনলাম, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কিছু নেই বলেই মনে হল। তবু অস্বস্তিটা একবারে গেল না।
পরের দিন সকালে তাঁবু তুলে আমরা সাভানা পেরিয়ে পাহাড়ের দিকে রওনা হলাম। এই পাহাড়ের প্রায় হাজার দশেক ফুট উঁচুতে পৌছোলে গোরিলার রাজ্যের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। পাহাড় যেমন খাড়াই, তেমনই গভীর জঙ্গলে ঢাকা। যত ওপরেই উঠি, ঢাকের শব্দ কিন্তু আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সে-শব্দ আমাদের পিছুতে লেগেই রইল।
