মশা মারবার পরিশ্রমেই যেন হাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘনাদা বললেন, জীবনে তারপর মশা মারতে আর প্রবৃত্তি হয়নি।
মাছ
ঘনাদা একেবারে ব্যাঘ্রঝম্প দিয়ে থালার উপর দু বাহু মেলে ধরে হাঁ-হাঁ করে উঠলেন। রামভুজ নেহাত আমাদের মেসের অনেক পুরোনো ঠাকুর, তাই, নইলে আর কেউ হলে বোধ হয় গামলা-টামলা সুদ্ধ উল্টে পড়ে খাবার ঘরে একটা কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ফেলত।
রামভুজ ঘনাদাকে চেনে। তাই শুধু এক পা পিছিয়ে গিয়ে, বাঁ-হাতের বাটি বসানো থালাটা চিনে ভেলকিবাজের মতো অদ্ভুত কায়দায় সামলে নিয়ে বললে, কী হোইলো বাবু, মাছের ঝোল খাইবেন না! ভাল মাগুর মাছের ঝোল।
মাগুর মাছের ঝোল খাব আমি? ঘনাদার কথায় মনে হল, হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে নিষিদ্ধ খাদ্য যেন তাঁকে জোর করে খাওয়াবার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আসল ব্যাপারটা যে কী তা আমরা অবশ্যই সবাই জানি-ঘনাদা নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা পড়ে, বেরুবার জন্য এখন ছটফট করছেন।
ছুটির দিন, আর তার ওপর গৌরের পাশের খবর বার হবার দরুন সকালবেলা সবাই মিলে বসে একটা খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনের ব্যবস্থা করছিলাম। এমন সময়ে শিশিরের কাছে একটা সিগারেট ধার করতে—এ পর্যন্ত মাত্র ২৩৫৭টা তিনি ধার নিয়েছেন—ঘনাদা ঘরে ঢুকেছেন। যথারীতি সিগারেটটা ধরিয়ে চলে যাবার মুখে আমাদের ভাবগতিক দেখে বোধহয় সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, ব্যাপার কী হে! সকালেবেলা এত জরুরি মিটিং কীসের?
এই একটু ফিস্টের ব্যবস্থা করছি আজ। আপনি
ফিস্ট! ঘনাদা শিবুকে কথাটা আর শেষ করতে দেননি। ফিস্ট শুনলেই তাঁর ভয় হয়, পাছে কেউ তাঁর কাছে চাঁদা চেয়ে বসে! তাই অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেছেন, তোমাদের নিত্যি ওই এক হুজুগ। আমার বাপু পেটটা আজ তেমন ভাল নেই।
যেন অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে গৌর বলেছে, আচ্ছা, আপনার জন্য তা হলে আলাদা ব্যবস্থাই করব।
হ্যাঁ, তাই কোরো! বলে ঘনাদা বেরিয়ে গেছেন।
সেই আলাদা ব্যবস্থার দরুন মাংসের কালিয়ার বদলে তাঁকে সত্যিই মাগুর মাছের ঝোল পরিবেশন করা হবে, ঘনাদা তখন ভাবতেই পারেননি! আপত্তিটা তাই তাঁর এত তীব্র। সব বুঝেসুঝেও শিবু কিন্তু ন্যাকা সেজে জিজ্ঞাসা করলে, আপনিই না সকালে বললেন, পেটটা তেমন ভাল নেই, তাই তো আপনার জন্যে আলাদা করে—
শিবুকে কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ঘনাদা যেন আর্তনিনাদ করে উঠলেন, তাই বলে–মাগুর মাছ?
গৌর যেন অত্যন্ত সংকুচিত ভাবে জানালে, কেন, মাগুর মাছ তো রুগির পথ্যি, হালকা বলেই জানি।
জানো যদি তো তোমরাই খাও না! আমার অত উপকার না-ই করলে। খেঁকিয়ে উঠলেন ঘনাদা।
এবার আমাকেই কথা বলতে হল। বেশ একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, তা হলে তো বড় মুশকিল হল ঘনাদা, আমাদের জন্য যে আবার মাংসের কালিয়া রান্না হয়েছে—তা-ও আবার চর্বিওয়ালা খাসির মাংস—সে তো আপনার চলবে না!
ঘনাদা যেন অত্যন্ত অনিচ্ছাসহকারে বললেন, যেমন করে হোক তা-ই চালাতে হবে। অন্য যে-কোনও মাছ হলেও হত, কিন্তু মাগুর মাছ প্রাণ থাকতে তো মুখে তুলতে পারব না।
মাগুর মাছে এত আপত্তি কেন বলুন তো? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে গৌর। ঘনাদার পাতের ধারে রামভুজ তখন মাংসের কালিয়ার বাটি ধরে দিয়েছে। পর পর সে রকম দুটি বাটি শেষ না করা পর্যন্ত ঘনাদা মুখ তুলে তাকাবার পর্যন্ত ফুরসত পেলেন না।
মাংসের পর চাটনি এবং তারপর দই ও সন্দেশ পর্যন্ত ঘনাদা যেন এক নিশ্বাসে চোখ কান বুজে চালিয়ে গেলেন। সন্দেশের পর পাস্তোয়ায় এসে তাঁর গতি একটু মন্থর হতে দেখে ভরসা পেয়ে বললাম, পেটটা আপনার সত্যিই আজ খারাপ ছিল দেখছি, ঘনাদা।
আমার কথার খোঁচা যদি কিছু থাকে তা ঘনাদাকে স্পর্শই করল না। Acute angle-এ তিনি খাওয়া শুরু করেছিলেন, এখন Obtuse angle-এ পৌছে তাঁর শরীর মন মেজাজ শরতের আকাশের মতো প্রসন্ন হয়ে গেছে।
মধুর ভাবে একটু হেসে বললেন, সেইজন্যই বুঝি মাগুর মাছের ব্যবস্থা করেছিলি? ভাল-ভাল! তা, তোদের আর দোষ কী বল, মাগুর মাছ যে কেন খাই না, তোরা কী করে বুঝবি?।
একটু বুঝিয়েই দিন না! সকাতর অনুনয় করলে গৌর।
ঘনাদা উদারভাবে আশ্বাস দিলেন, আচ্ছা দেব, দেব, এই–
প্রকাণ্ড পাস্তোয়াটায় কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার দরুন তাঁর শেষ কথা আর শোনা গেল না।
খাওয়া-দাওয়ার পর বসবার ঘরে তাঁর মৌরসিপাট্টাওয়ালা আরামকেদারাটি দখল করে শিশিরের একটা সিগারেট—২৩৫৮টা হল—ধার নিয়ে আরাম করে ধরিয়ে ঘনাদা শুরু করলেন, ১৯২৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যে-চন্দ্রগ্রহণ হয়, তার কথা তোমাদের না-জানাই স্বাভাবিক, কারণ সে-চন্দ্রগ্রহণ বাংলাদেশে দূরে থাক, ভারতবর্ষ থেকেও দেখা যায়নি। তবে ড. আলফ্রেড হিল যে কারণে ১৯৩০-এ এফ, আর. জি. এস, অর্থাৎ ফেলো অব দ্য রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি রূপে মনোনীত হয়ে সম্মানলাভ করেন…কিভু এবং এডওয়ার্ড হ্রদের মধ্যে নতুন একটি নদী জন্মাবার কিছু বিবরণ তোমরাও হয়তো শুনে থাকবে।
ভূগোলের জ্ঞান আমাদের সকলেরই সমান। ওরই মধ্যে শিবু যা একটু-আধটু চর্চা করে। ঘনাদা ওই পর্যন্ত বলে চুপ করবার পর সে জিজ্ঞাসা করলে, কিভু আর এডওয়ার্ড হ্রদ কোথায় বলুন তো? আফ্রিকায় না?
হ্যাঁ। আফ্রিকায় বেলজিয়ান কঙ্গোর একেবারে পুবে—বিষুবরেখার কিছু দক্ষিণে।
আমরা কেউই সেখানে নতুন নদী জন্মাবার কথা শুনিনি জেনে, ঘনাদা দ্বিগুণ উৎসাহভরে আবার আরম্ভ করলেন, জার্মানির এক নামজাদা সার্কাস কোম্পানি আর স্পেনের এক চিড়িয়াখানার বায়না নিয়ে আফ্রিকার জঙ্গলে জঙ্গলে তখন নানা জাতের অদ্ভুত দুষ্প্রাপ্য প্রাণী ধরে বেড়াচ্ছি। চিড়িয়াখানার ফরমাশ মতো প্রায় সবকিছুই তখন ধরা হয়ে গেছে। জিরাফ আর জেব্রার মাঝামাঝি অদ্ভুত প্রাণী ওকাপি, কঙ্গোর লাল বামন মোষ, বাঘা বেড়াল, চিতা, হায়না, এ সব তো আমার সঙ্গে আছেই, তা ছাড়া নানা জাতের পাখি, মাছ, সাপও জোগাড় করেছি। সার্কাস কোম্পানির ফরমাশটাই তখন হাসিল করতে বাকি। সেটা বেশ একটু শক্ত। তাদের জন্য একটা বাচ্চা গোরিলা ধরে নিয়ে যেতে হবে। গোরিলা ধরা বড় সোজা কথা নয়। তার ওপর এমন দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ও পাহাড়ে তারা লুকিয়ে থাকে যে, তাদের সন্ধান পাওয়াই মুশকিল। কঙ্গো ও ক্যামেরুনস-এর নিবিড় জঙ্গলে প্রথমে বনমানুষদের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল এই প্রাণীটি আবিষ্কৃত হয়। তারপরে কঙ্গোর পুবে কিভু হ্রদের কাছাকাছি পাহাড়ের প্রায় দশ হাজার ফুট উঁচু জঙ্গলে, আর এক আরও বড় জাতের গোরিলার সন্ধান পাওয়া যায়। আপাতত সেই গোরিলার আস্তানার দিকেই যাচ্ছিলাম। আফ্রিকার—বিশেষ করে কঙ্গোর জঙ্গলে চলাফেরা যে কী ব্যাপার, ভুক্তভোগী না হলে কল্পনাই করতে পারবে না। এ সব জঙ্গল এমন দুর্ভেদ্য যে প্রতি পদে কুড়ুল কাস্তে দিয়ে পথ পরিষ্কার না করলে এক পা-ও এগুনো যায় না। দেড়শো থেকে দুশো ফুট উঁচু বড় বড় গাছ লতায়-পাতায় আকাশ এমন ঢেকে রেখেছে যে দিনের বেলাতেও সেখানে সূর্যের আলো অতিকষ্টে চুইয়ে আসে। সেই ঘন গাছের জটলার তলায় আগাছার জঙ্গলই ১৫ ফুট উঁচু। তারই ভিতর আবার অর্চিলা ও লতানে রবার গাছের দুর্ভেদ্য জট।
