আমায় চুপ করে থাকতে দেখে ভরনফ আবার বললেন, আমায় সবাই খাস জার্মান হিসেবে প্রুশিয়ানদের চেয়েও কড়া দাম্ভিক বলে জানত, এখনও অনেকে জানে। কিন্তু আসলে আমিও ইহুদি। তবে আমার ভাই ইহুদি জাতের গৌরব ছিল একদিন, আর আমি ছিলাম কুলাঙ্গার। জার্মানিতে—আর শুধু জার্মানিতে কেন— সমস্ত ইউরোপে ইহুদি-বিদ্বেষ কী রকম প্রবল, তা নিশ্চয় জানেন। গত দু হাজার বছর ধরে আমাদের ওপর যে অত্যাচার এরা করেছে, তার তুলনা হয় না। মাঝে মাঝে এ বিদ্বেষ কিছুদিনের জন্যে একটু চাপা থেকেছে মাত্র, তারপর আবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আমাদের ধনে-প্রাণে ধ্বংস করেছে। ছেলেবেলা থেকেই এই ইহুদি-বিদ্বেষ আমাদের ক্ষিপ্ত করে তুলেছে—কিন্তু আমাদের দুভাইকে দুভাবে।
আমার ভাই জ্যাকব, রথস্টাইন আমাদের পদবি, চেষ্টা করেছে বৈজ্ঞানিক হিসেবে ইহুদি জাতের মুখোজ্জ্বল করতে, আর আমি পিতৃপরিচয় ভাঁড়িয়ে জার্মানদের সঙ্গেই মিশে যেতে চেয়েছি ইহুদি-বিদ্বেষ এড়াবার জন্যে। বিদ্যাবুদ্ধিতে জ্যাকবের চেয়ে আমি অনেক খাটো। বাপ-মা দুই-ই মারা যাবার পর বিশ বছর বয়সে আমি তাই একটা খনির চাকরি নিয়ে ব্রেজিলের জঙ্গলে চলে যাই। সেখান থেকে বছর পাঁচেক বাদে যখন জার্মানিতে ফিরে এলাম তখন আমি একেবারে খাঁটি প্রুশিয়ান, চেহারায় চলনে বলনে আমায় অন্য কিছু বলে চেনে কার সাধ্য।
ঘটনাচক্রেই প্রশিয়ান সাজবার এ সুযোগ আমার মিলে গেছল। বিশুদ্ধ প্রুশিয়ান বংশের একটি ছেলে আবিষ্কার-পর্যটনের নেশায় ব্রেজিলের জঙ্গলে এসে আমাদেরই খনির আস্তানায় মারা পড়ে। তার সঙ্গে আমার চেহারার মিলের কথা অনেকেই সে সময় বলেছিল। তারই সুযোেগ আমি নিলাম। মরবার সময়–তার সেবা করার দরুন—সে কয়েকটি কাগজপত্র ও জিনিস আমার হাতেই দেয় জার্মানিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। সেই কাগজপত্রের জোরে আমি অনেকটা নির্ভয়ে ভরন সেজে বসলাম। সামরিক বিভাগে ঢুকে উন্নতিও করলাম যথেষ্ট! কেউ কোনওদিন একটু সন্দেহও করতে পারল না।
এতদিনে ইচ্ছে করেই জ্যাকবের সঙ্গে আমি দেখা করিনি, যদিও তার সব খবরই রাখতাম। একদিন হঠাৎ বার্লিন থেকে মিউনিক যাবার পথে ট্রেনের একটি কামরায় তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমি তখন বড় মিলিটারি অফিসার। মিউনিকে যাচ্ছি একটা জরুরি তদন্তে, আর জ্যাকব সেখানে যাচ্ছে বৈজ্ঞানিকদের কী একটা সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে।
আমি তাকে গোড়াতেই চিনলেও আমার মিলিটারি জাঁদরেল পোশাকে ও চালচলনে সে প্রথমটা কিছু বুঝতে পারেনি। সন্দিগ্ধভাবে দু-একবার তাকিয়েছিল মাত্র। পরিচয় দেবার আমার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু দিতে হল ঘটনাচক্রে। মাঝখানের একটা স্টেশনে গাড়ি থামতে আমার একজন তাঁবেদার কর্মচারী আমায় সেলাম দিতে এল আমার কামরায়। জ্যাকবকে দেখলেই ইহুদি বলে চেনা যায়। চেহারায় পোশাকে নিজের জাত লুকোবার কিছুমাত্র চেষ্টা তার নেই। আমার তাঁবেদার অফিসারটি যেমন গোঁড়া তেমনই অভদ্র। সে জ্যাকবের মুখের সামনেই আমায় বললে, এই ইহুদি জানোয়ারটা আপনার সঙ্গে এক গাড়িতে যাচ্ছে! দেব এ কামরা থেকে ঘাড় ধরে বার করে?
মরমে মরে গিয়েও বাইরে দাম্ভিকতার ভান করে বললাম, থাক, তার দরকার নেই, রাস্তায় কত বেড়ালকুকুরও থাকে!
একজন ইহুদিকে একটু জব্দ করবার সুবিধে না পেয়ে একটু অপ্রসন্ন হয়েই অফিসারটি শেষ পর্যন্ত কামরা থেকে নেমে গেল। গাড়িও দিল ছেড়ে। জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ ফিরে দেখি, জ্যাকব একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে আছে। অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিলাম, কিন্তু খানিক বাদেই তার দিকে না চেয়ে পারলাম না।
এখনও সে আমার দিকে চেয়ে আছে, কিন্তু তার মুখে একটু অনুকম্পার হাসি। কামরায় আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই—এই ভাগ্যি, নইলে একটা ইহুদির সামনে কড়া প্রুশিয়ান অফিসারের এরকম অস্বস্তি দেখে তারা সন্দিগ্ধই হয়ে উঠত।
হঠাৎ জ্যাকব বললে, ওইটুকুর জন্যই ধরা পড়ে গেলে, আইজ্যাক।
যতদূর সম্ভব মিলিটারি মেজাজের ভান করে বললাম, কী বলছ কী তুমি! কার সঙ্গে কথা কইছ জানো?
আর আস্ফালন করে লাভ কী আইজ্যাক? আমি তোমায় চিনতে পেরেছি। সত্যিকারের প্রশিয়ান অফিসার একটা ইহুদিকে কামরা থেকে নামিয়ে দেবার এ সুযোগ কক্ষনও ছাড়ত না!
সজল চোখে খানিক তার দিকে তাকিয়ে থেকে তার হাত দুটো ব্যাকুলভাবে ধরে ফেলে এবার বললাম, আমায় ক্ষমা করো, জ্যাকব! কী দুঃখে এ ছদ্মরূপ নিয়েছি তা জানো?
তা জানি। কিন্তু ইহুদি-বিদ্বেষের প্রতিশোধ কি এইভাবে নেওয়া যায়? ওই পোশাক তোমার চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে না?
জ্যাকবের চেহারা একমুহূর্তে এমন বদলে গেল যে, সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম! তার চোখ দিয়ে যে আগুন ঠিকরে বেরুল, বুকের ভেতরকার কত বড় আগ্নেয়গিরি তা থেকে উঠে আসছে বুঝে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
একটু শান্ত হয়ে জ্যাকব বললে, যেমন করে পারো, লুকিয়ে-চুরিয়ে মিউনিকে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। ইহুদি-বিদ্বেষের কী প্রতিশোধের আয়োজন হচ্ছে, তোমায় বুঝিয়ে দেব।
মিউনিকে সত্যিই তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম এবং যা শুনেছিলাম ও দেখেছিলাম তাতে বুঝেছিলাম, অতবড় বৈজ্ঞানিক হয়েও ইহুদি-বিদ্বেষের দরুন পদে পদে প্রত্যেক জায়গায় অপমানিত লাঞ্ছিত হয়ে জ্যাকব একেবারে উন্মাদ হয়ে গেছে। কিন্তু উন্মাদ হয়ে সে যে প্রতিশোধের পরিকল্পনা করছে, তার বৈজ্ঞানিক কূট কৌশল শুধু শয়তানের মাথাতেই জন্মানো সম্ভব। তার সঙ্গে কথা কইতে কইতে বুঝলাম, ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়বার একই প্রেরণা আমাদের দুজনের মধ্যে কী বিভিন্নভাবে কাজ করেছে! জাতের কুলাঙ্গার হয়েও আমি ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাকে জয় করে মানুষকে ভালবাসতে শিখেছি, আর জাতির অপমানের শোধ নিতে গিয়ে জ্যাকব মানুষের শত্রুই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরিকল্পনায় সমস্ত মানবজাতির কতখানি ক্ষতি হবে বুঝিয়ে তাকে নিরস্ত করবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তীব্র বিদ্রুপের হাসি হেসে সে বলেছিল, নকল প্রুশিয়ান সাজতে সাজতে তুমি খানিকটা তা-ই হয়ে গেছ। আমার কথা তুমি বুঝবে না।
