সঙ্গে সঙ্গে আবার হাসির ধুম পড়ে গেল। কিন্তু এত হাসি-ঠাট্টা ঘনাদাকে যেন স্পর্শই করল না। অবিচলিত ভাবে নিজের বিছানার ওপর এসে বসে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তিনি আমাদের সকলের দিকে একবার তাকালেন, তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, একটা পোকা দেখে ভয় পেয়েছি, না?
পা দুটো গুটিয়ে আর একটু আরাম করে বসে তিনি হঠাৎ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, একটা পোকার পেছনে আট হাজার মাইল কখনও ছুটে বেড়িয়েছ? তিন হাজার টন মরা পোকা নিয়ে কী করবে কখনও ভাবতে হয়েছে? পকেটে একটা কাঁচের বন্ধ শিশি আর হাতে একটা কাগজ সম্বল করে আফ্রিকার গহনতম বনে-জঙ্গলে-জলায় কখনও একটা পোকার খোঁজে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে?
আমাদের হাসি তখন প্রায় শুকিয়ে গিয়েছে। তবু একবার জিজ্ঞাসা করলাম, কী সে পোকা, ঘনাদা! এই নারকুলো পোকা?
না, তার নাম—সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়া!
থাক থাক, ঘনাদা! পোকা হলেও কৃষ্ণের জীব তো বটে। অমন যা-তা গালাগালি দেওয়াটা কি উচিত?
শিবুর বলার ধরনে হাসিটা আর একবার উথলে উঠতেই এক ধমকে সেটা থামিয়ে দিয়ে ঘনাদা বললেন, গালাগাল নয়, এ-ই হল তার বৈজ্ঞানিক নাম।
আমরা সিঁড়িটার দিকে পা বাড়াবার আগেই ঘনাদা শুরু করে দিলেন, ১৯৩১ সালের ২২ ডিসেম্বর। লাটভিয়ার রিগা শহরের সমস্ত পথঘাট বরফে ঢেকে গেছে। আগের রাত্রে এমন প্রচণ্ড তুষার ঝটিকা শহরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে যে, মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন এসে বরফ কেটে পরিষ্কার না করে দেওয়া পর্যন্ত অনেকে বাড়ির দরজাই খুলতে পারেনি। আমি যথারীতি প্রাতঃভ্রমণ সেরে আমার হোটেলে ফিরছি, এমন সময় খটাখট শব্দে এক ঘোড়ায় টানা ড্রোসকি আমার কাছেই এসে থামল। মোটা আসট্রাকান গায়ে মাথায় রুশ টুপি-পরা মিলিটারি চেহারার একটি লোক তা থেকে নেমে আমায় ভাল করে লক্ষ করে হাতে একটি চিঠি দিলে।
সে চিঠি পড়ে সত্যিই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, জেনারেল ভরনফ এখানে আছেন তা তো জানতাম না!
লোকটি সবিনয়ে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, তিনি আজ তিন বছর এখানেই আছেন। আপনার সঙ্গে এখুনি একবার দেখা করতে চান।
তা তো চিঠি পড়েই বুঝলাম, কিন্তু তিনি যার সঙ্গে দেখা করতে চান আমি যে সেই লোক, আপনি বুঝলেন কী করে?
আট্রাকান কোটটার গলাটা একটু তুলে দিয়ে লোকটি বললে, তা কি আর বুঝতে দেরি হয়! জেনারেল আপনার অনেক গল্পই আমার কাছে করেছেন, তা ছাড়া রিগা শহরের এই রক্ত-জমানো শীতে শুধু একটা সোয়েটার চাপিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বেরুতে আর কেউ যে পারে না তা আমি ঠিক জানি।
শিবুর একটু বুঝি কাশি শোনা গেল। সেইসঙ্গে আমাদেরও। ঘনাদা গ্রাহ্য না করে বলে চললেন, গেলাম তারপর জেনারেল ভরনফের বাড়ি। রিগা উপসাগরের দক্ষিণ পাড়ে নোংরা পুরোনো শহরের এক ঘিঞ্জি পাড়ায় ভরনফের ভাঙা দুকামরা আস্তানা দেখে যত অবাক হলাম, তার চেয়ে বেশি হলাম স্বয়ং তাঁকে দেখে।
জেনারেল ভরনফের সঙ্গে আফ্রিকায় শিকারের সূত্রে আমার পরিচয়। একসঙ্গে নাইপার নদীতে আমরা ডিঙি বেয়ে দুশো পাঁচশো মাইল ঘুরে বেড়িয়েছি, কঙ্গোর গভীরতম জঙ্গলে গরিলার খোঁজে ফিরেছি প্রাণ হাতে নিয়ে, মাসাইদের সঙ্গে শুধু তীর-ধনুক দিয়ে শিকার করেছি। খাঁটি প্রুশিয়ান বলতে যা বোঝায়, চেহারায় চরিত্রে তিনি ঠিক তা-ই ছিলেন। শরীর ও মন দুই-ই একেবারে শক্ত ইস্পাতের তৈরি। শারীরিক কষ্ট কাকে বলে জানেন না, মানসিক দুর্বলতা কাকে বলে বুঝতে দেন না কখনও। প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মান সেনাপতি হিসেবে তিনি যথেষ্ট নাম করেছিলেন, রাজকীয় সম্মানও পেয়েছিলেন প্রচুর। সেই লোকের এই দুরবস্থা কী করে সম্ভব? আর্থিক অবস্থা তাঁর যত খারাপ হয়েছে, শরীর ভেঙে পড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এ যেন আগের ভরনফের ছায়ামাত্র!
ভদ্রতা-বিরুদ্ধ হলেও কী করে এ দুর্দশা তাঁর হল তা না জিজ্ঞেস করে পারলাম । অদ্ভুতভাবে আমার দিকে চেয়ে ভরনফ বললেন, এ শহরে আপনি এসেছেন জেনে সে কথা বলতেই ডেকে পাঠিয়েছি। পৃথিবীর আর কেউ যে কথা জানে না তা-ই আজ আপনাকে বলব। আসুন।
আমায় ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে ভরনফ একটা দেরাজ খুলে একটা ফটো বার করলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এফটো কার জানে?
ফটোটা দেখেই চিনেছিলাম। অবাক হয়ে বললাম, এ ফটো তো ড. রথস্টাইনের। পনেরো বছর আগে সি-সি মাছি সম্বন্ধে গবেষণা করতে গিয়ে আফ্রিকায় মারা পড়েন।
ভরনফ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, না, মারা সে পড়েনি, আজও বেঁচে আছে। নিজের মৃত্যু সে বিশেষ কোনও কারণে এইভাবে রটিয়েছিল।
কিন্তু আপনি সে কথা জানলেন কী করে?
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ভরনফ প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বললেন, সে আমার ভাই।
আপনার ভাই! ড. রইস্টাইন হলেন ইহুদি, আর আপনি খাস জার্মান। কী রকম ভাই?
সহোদর ভাই। এক বাপ-মায়েরই আমরা সন্তান! বলে ভরনফ অত্যন্ত বিষণ্ণভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার সঙ্গে যখন আমার আলাপ তখন আফ্রিকায় শিকারের ছুতোয় এই ভাইকেই আমি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।
একটু চিন্তিতভাবে ভরনফের দিকে তাকালাম। দুঃখে অভাবে তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে নাকি? ভরনফ আমার সে দৃষ্টির অর্থ বুঝে স্লান হেসে বললেন, আপনি মনে করছেন, আমার বোধ হয় মাথা খারাপ হয়েছে! রথস্টাইন ইহুদি হয়ে কী করে আমার সহোদর ভাই হতে পারে আপনি ভেবে পাচ্ছেন না, নয়? গত মহাযুদ্ধে বীরত্বের জন্য জার্মানির শ্রেষ্ঠ সম্মান পেয়েও লাটভিয়ার এই শহরে একটা নোংরা পল্লীতে এই দারিদ্র্যের মধ্যে চোরের মতো কেন দিন কাটাচ্ছি ভাবলেই বুঝতে পারবেন।
