এর কিছুদিন পরে সে সি-সি মাছি সম্বন্ধে গবেষণা করবার নামে আফ্রিকায় চলে যায়। কিন্তু আমি জানতাম ওটা তার একটা ছুতোমাত্র।
ভরনফের কথা শেষ হলে আমি একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, জ্যাকব রথস্টাইন যে সত্যি মারা যাননি, আপনি জানলেন কী করে?
জানলাম প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে।একটা কাগজের ফাইল দেরাজ থেকে বার করে ভরনফ বললেন, খবরের কাগজের এই কাটিংগুলো পড়ে দেখলে বুঝতে পারবেন, গত দশ বছরে এশিয়া-ইউরোপের নানা জায়গায় কী রকম অদ্ভুতভাবে ছোটখাটো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। দেশভরা সোনার শস্য চক্ষের নিমেষে কীভাবে ছারখার হয়ে গেছে! এখনও পর্যন্ত জর্জিয়া, রুমানিয়া, মোরাভিয়া প্রভৃতি ছোটখাটো রাজ্যের ওপর দিয়েই এ বিপদ গেছে। বড় বড় দেশ এখনও রেহাই পেয়ে আছে। কিন্তু বেশিদিন আর নয়। তার আয়োজন সম্পূর্ণ হলেই সমস্ত ইউরোপ সে বিপদ ঠেকাতে পারবে কিনা সন্দেহ।
বললাম, কিন্তু এই ব্যাপারে আমাকে কেন ডেকেছেন বুঝতে পারছি না।
বুঝিয়ে দিচ্ছি, শুনুন। আমি নিজে বৃদ্ধ অথর্ব হয়ে পড়েছি। জার্মানির জঙ্গিমহলে এতদিন পরে কেমন করে জানি না আমার সত্যকার জাত সম্বন্ধে একটা সন্দেহের হাওয়া ওঠায় আমায় এখানে এসে প্রায় অজ্ঞাতবাস করতে হচ্ছে। যা আর পারি না, তা-ই আপনাকে করতে হবে। জ্যাকবকে খুঁজে বার করতে হবে। আমি জানি যদি কেউ পারে তো আপনিই পারবেন।
অবাক হয়ে বললাম, বলেন কী! পনেরো বছর যে লোকের কোনও পাত্তা নেই, তাকে আমি কোথায় খুঁজে বার করব? করবই বা কী করে?
একটা ছোট কাঁচের কৌটো খুলে ধরে ভরনফ বললেন, খুঁজে বার করবেন এর সাহায্যে। এই আপনার নিদর্শন!
এ কী! সত্যিই বিমূঢ় হয়ে বললাম, এ তো একটা মরা পোকা দেখছি!
হ্যাঁ, এই মরা পোকাই আপনাকে তার সন্ধান বলে দেবে। এ পোকা আফ্রিকার কোথায় যে জন্মায়, কোনও বৈজ্ঞানিক তা আজও জানে না। এ পোকা যেখানে পাবেন, জানবেন জ্যাকব সেখানেই তার চরম শয়তানি ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুলছে।
কিন্তু জ্যাকবের সন্ধান পেলেই বা করব কী?
আমার হাতে ছোট একটা বন্ধ কাঁচের শিশি আর একটা কাগজ দিয়ে ভরনফ বললেন, কী করবেন, এই কাগজে লেখা আছে। আজ দশ বছর পরে জ্যাকবের পৈশাচিক চক্রান্ত ব্যর্থ করবার এই অস্ত্র আমি অনেক কষ্টে আবিষ্কার করেছি।
ঘনাদা চুপ করলেন। গৌর জিজ্ঞাসা করলে, তারপর! জ্যাকবের খোঁজ আর পেলেন না বুঝি?
না, পেলাম বইকী! না পেলে কর্সিকাতে তিন হাজার টন মরা পোকা জমল কী করে?
শিবু অধৈর্যের সঙ্গে বললে, আহা, খুলেই বলুন না একটু!
ঘনাদা একটু বিজয়-গর্বের হাসি হেসে বললেন, সমস্ত আফ্রিকা ঘুরে বার-এল-আরব নদীর ধারে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষ ডিঙ্কাদের দেশে তখন এসেছি। পকেটে সেই পোকার কৌটো তখনও আছে, কিন্তু মনে কোনও আশা নেই জ্যাকবকে খুঁজে পাবার। সাতফুট লম্বা আমার ডিঙ্কামাঝির সঙ্গে তার সালতির চেয়ে সরু লম্বা ডিঙিতে সেদিন জলার মধ্যে কুমির শিকারে গেছি। হঠাৎ তীরের ঝোপ থেকে একটা পোকা ঠিক আমার কোলের ওপরে এসে পড়ল। ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়ে হঠাৎ চমকে গেলাম। কৌটোটা পকেট থেকে বার করে মরা পোকাটা তার পাশে ধরে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম একেবারে। সেই সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়া।
তারপর জলা-জঙ্গল তোলপাড় করে জ্যাকবের আস্তানা খুঁজে বার করতে দেরি হল না। লোকটা তখন সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছে। তার সর্বনাশা পরিকল্পনার তোড়জোড় প্রায় শেষ।
পরিচয় দিয়ে আলাপ করবার পর আমার কাছে খোলাখুলি ভাবেই তিনি তখন সব কথা বললেন! দুদিন পরে ইউরোপের আকাশ কী করে অন্ধকার হয়ে যাবে সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়ার ঝাঁকে বলতে বলতে তাঁর চোখ জ্বলে উঠল। গত পনেরো বছরের সাধনায় এমন অদ্ভুত পরিবর্তন তিনি তাদের জীবনধারায় নাকি করেছেন যে, কোথা থেকে ছাড়লে কতদূর পর্যন্ত গিয়ে তারা মাঠ-ঘাট শ্মশান করে দেবার জন্যে নামবে, তিনি তা বলে দিতে পারেন।
তাঁর প্রথম লক্ষ্য ইটালি। দুদিন পরেই ছ হাজার বর্গমাইল ব্যাপী এক ঝাঁক পোকা তিনি উড়িয়ে দেবেন ইটালিতে। তারপর একটা শ্যাওলার ছোপও কোথাও থাকবে না। ইটালির পর জার্মানি ও ইংল্যান্ডে কী ভাবে তিনি তাঁর অজেয় বাহিনী পাঠাবেন, সব নাকি তাঁর ছকবাঁধা আছে। আফ্রিকার এই অঞ্চলে সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়ার জন্মস্থান খুঁজে বার করে তিনি এমনভাবে তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে নিজের পরিকল্পনামাফিক তৈরি করেছেন যে, ইউরোপ দশ বছর সমস্ত অস্ত্র দিয়ে যুঝেও তাদের শেষ করতে পারবে না।
দুদিন বাদে সেই পতঙ্গের ঝাঁক সত্যিই উড়তে দেখলাম। সুডান থেকে লিবিয়া টিউনিসিয়ার আকাশ যেন রাতের মতো অন্ধকার হয়ে গেল। কিন্তু এ পতঙ্গের ঝাঁক। তবু ইটালি পর্যন্ত পৌঁছোল না। অর্ধেক মরল লিবিয়ার মরুতে, আর বাকি অর্ধেক কর্সিকার সমুদ্রের ওপর ঝরা-পাতার মতো মরে ঝরে পড়ল। সেই মরা পোকার ওজনই তিন হাজার টন।
কিন্তু তারা মরল কেন? জিজ্ঞাসা করলে শিশির। মরল ভরন যে বন্ধ শিশিটি দিয়েছিলেন তার দরুন। তার ভেতর এমন একটি রোগের জীবাণু ছিল যা সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়ার যম। দুদিন আগে একটি পতঙ্গের মধ্যে সেই বিষ আমি ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম একটা ছুঁচ দিয়ে। সেই রোগ তারপর সংক্রামক হয়ে সমস্ত পতঙ্গ বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়!
ও, সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়া তা হলে পঙ্গপাল! বললে শিবু। কিন্তু সে পঙ্গপাল তো শেষ হয়ে গেছে, তা হলে আজ আপনার একটা পোকায় অত ভয় কীসের?
