সর্দারের কাছে ব্যাপারটা সব শুনে, আমি নিজেই পাহাড়ে দ্বীপে যাব ঠিক করলাম। সদারের নিষেধ-মানা, উপরোধ-অনুরোধ যদি বা কাটানো গেল, দ্বীপে আমায় নৌকোয় পৌছে দেয় এমন লোকই পেলাম না গাঁয়ে।
অবশেষে রেগে ছোট একটা ডিঙি নিয়ে নিজেই একদিনে বিকেলে দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হলাম। সঙ্গে একটা ধারালো ছুরি। আর কুয়ো থেকে যা দিয়ে ড়ুবে-যাওয়া বালতি ঘড়া তোলে সে রকম কাঁটার গোছা বাঁধা একটা লম্বা মজবুত দড়ি। রাত কাটাবার মতো কিছু খাবার-দাবারও সর্দার সঙ্গে দিয়েছিল, যদিও রাত আমার সেখানে কাটবে কি না সে বিষয়ে তার ঘোরতর সন্দেহ।
আমার ডিঙি সমুদ্রে ঠেলে দেবার সময় সর্দার প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি! এতদিন এক সঙ্গে থাকার দরুন আমার ওপর এই সরল অসভ্য মেলানেশিয়ের সত্যি একটা মায়া পড়েছিল। এমন সাধ করে বেঘোরে মরতে যাওয়ায় তাই সে সত্যিই ব্যথা পেয়েছে।
একলা ডিঙি বেয়ে ভূতুড়ে পাহাড়ের দিকে যেতে যেতে নিজেরও কাজটা একটু বেশিরকম গোঁয়ারতুমি বলে মনে হচ্ছিল। কোথায় কোন চুলোয় কী ভূতুড়ে কাণ্ড হচ্ছে, তাতে তোর মাথাব্যথা কেন বাপু! কিন্তু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাওয়াই যার স্বভাব তার উপায় কী!
ভূতুড়ে দ্বীপের ধারে গিয়ে যখন পৌঁছোলাম তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। সামুদ্রিক পাখিদের অধিকাংশই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ডানা গুটিয়ে তখন নিজেদের আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। দু-চারটে দেরি করে ফেরা পাখির পাখার ঝটপটানি শুধু শোনা যাচ্ছে।
সুবিধেমতো এক জায়গায় পাহাড়ের ধারে নৌকো বেঁধে ছুরিটা আর দড়ি-বাঁধা কাঁটাটা নিয়ে তীরে উঠলাম। তীরে মানেও পাথর। সে পাথরের তীর গজ কুড়ি পরেই খাড়া পাহাড়ের দেয়ালে শেষ হয়েছে। ছুরিটা কোমরে গুঁজে দড়ি বাঁধা কাঁটাগুলো ওপরের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। একবার ফসকাবার পর ওপরের একটা খাঁজে কাঁটা আটকে গেল। ঠিক মতো আটকেছে কিনা দড়ি নেড়ে একবার দেখে নিয়ে তা-ই বেয়ে সেই খাঁজের ভেতর পা দিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর আবার কাঁটা ছুঁড়ে ওপরের কোনও খাঁজে লাগাবার কসরত।
এমনই ভাবে প্রাণ হাতে করে পাহাড়ের মাথায় গিয়ে যখন উঠলাম তখন বেশ রাত হয়েছে। আমি পাহাড়ের পশ্চিম দিক দিয়ে উঠেছিলাম। সে দিকটা অন্ধকার হলেও ওপারে কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী না পঞ্চমীর চাঁদের আলো পড়ে চারিদিক বেশ ভালই দেখা যাচ্ছে।
সেই আলোয় সামনে যা দেখা গেল তাতে আমি সত্যি অবাক! পাহাড়ের ওপরে ছোট একটি হ্রদ। নীচে থেকে এ জলাশয়টির কথা কল্পনাও করা যায় না। কেউ করেওনি এপর্যন্ত। সমস্ত পাহাড়টা যেন পেয়ালার মতো এই হ্রদটিকে ওপরে তুলে ধরেছে।
নিঃসঙ্গ পাহাড়ের চূড়ায় চাঁদের আলোয় ঝলমলে হ্রদটিকে কী সুন্দর যে দেখাচ্ছিল, কী বলব!
দড়ি বেয়ে ওঠার পরিশ্রমে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। হ্রদের ধারে একটা পাথরের চাঁই-এর পাশে বসে মুখ চোখে জল দিতে যাচ্ছি, হঠাৎ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সমস্ত শরীর এক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন হিম হয়ে গেল।
হ্রদের ঠিক ওপারে জলের ভেতর থেকে সত্যিই একটা বিকট মূর্তি ওপরে উঠে আসছে। মূর্তিটা মানুষের মতো সোজা হয়ে হাঁটছে-কিন্তু মানুষের সঙ্গে আর কোনও সাদৃশ্য তার নেই। কবন্ধের মতে, বর্তুলাকার বীভৎস একটা ধড় যেন দুটো থামের ওপর দাঁড় করানো—তার হাঁটার ভঙ্গিও এমন অমানুষিক যে আপনা থেকে সমস্ত শরীর শিউরে উঠে।
মূর্তিটা জল থেকে উঠে বিশ্রী টলমলে পায়ে দুলতে দুলতে ওপারের পাহাড়ের একটা অন্ধকার গহ্বরের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
না, এ রহস্যের মীমাংসা না করলে নয়। মন শক্ত করে যথাসম্ভব সাবধান হয়ে হ্রদের পাড় দিয়ে ওপারে দৌড়ে গেলাম।
সামনে সুড়ঙ্গের মতো সেই গহ্বর। এক মূহূর্ত ইতস্তত করে ছুরিটা কোমর থেকে খুলে নিয়ে তার ভেতর গিয়ে ঢুকলাম। সুড়ঙ্গটা বেশি দীর্ঘ নয়, একটা বাঁক ফিরতেই দূরে একটা আলোকিত জায়গা দেখা গেল। এই কি তা হলে হ্রদের জলের সেই বিকট জীবের আস্তানা? আলো জ্বালবার ক্ষমতাও কি তার আছে?
সন্তর্পণে পা টিপে টিপে সেখানে গিয়ে পৌঁছোলাম। সুড়ঙ্গটা এখানে একটা মাঝারি গোছের গুহায় শেষ হয়েছে।
গুহার ভেতরে পৌঁছে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। সেখানে কেউ নেই, কিন্তু ঘরের এক পাশে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বলছে, দেওয়ালে পোশাক-আশাক টাঙানো।
এই ভুতুড়ে দ্বীপে এই দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় মানুষ এল কোথা থেকে! জলের তলা থেকে ওঠা সেই অমানুষিক জীবটিই বা গেল কোথায়!
অবাক হয়ে দেওয়ালের ধারের পোশাকগুলো লক্ষ করছি এমন সময় সমস্ত গুহা। কাঁপিয়ে সশব্দে একটা বন্দুকের গুলি আমার কানের পাশ দিয়ে দেয়ালে গিয়ে লাগল।
বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ছুরিও হাত থেকে ছুটে বেরিয়ে ওধারের দেওয়ালে বিধে গিয়ে কাঁপতে লাগল। যে বন্দুক ছুঁড়েছিল তার ডান হাতের জামার আস্তিন সেই ছুরিতে দেওয়ালের সঙ্গে আঁট হয়ে গেছে। হাত নাড়বার তার ক্ষমতা নেই।
লোকটার ওপর এবার ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে সবিস্ময়ে বললাম, এ কী, মসিয়ে পেত্রা!
মঁসিয়ে পেত্রা করুণভাবে একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, আপাতত তোমার বন্দী!
অর্ধেক রাত তারপর আমাদের পরস্পরের খোঁজখবর নিতেই কেটে গেল। কী করে বন্দরের খোঁজে নানা জায়গা ঘুরে সঁসিয়ে পেত্রা শেষে এই দ্বীপে উঠেছে, সব কাহিনী শোনার পর জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু জলের তলার সেই কিম্ভুতকিমাকার জীবটি তা হলে কী?
