পেত্রা একটু হেসে আমায় নিয়ে গুহার একদিকের একটি পাথরের দরজা সরিয়ে অন্য একটা ছোট গুহায় নিয়ে গেল। পাথরের দরজাটি এমন কায়দায় বসানো যে এমনিতে চোখে পড়ে না। আমারও চোখে পড়েনি।
ছোট গুহার ভেতরে ঢুকে সামনের দিকে আঙুল দেখিয়ে পেত্রা বললে, এই তোমার সেই বিকট জীব।
অবাক হয়ে দেখি সামনে দুটো ড়ুবুরির পোশাক দেওয়ালের ধারে সাজানো হয়েছে! পোশাক দুটি সাধারণ ড়ুবুরির পোশাক থেকে একটু অবশ্য ভিন্নভাবে তৈরি।
পেত্রা নিজেই সে কথা আমায় জানালে, পোশাকগুলো আমি নিজেই ফরমাশ দিয়ে গড়িয়ে এনেছি।
কিন্তু কেন? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
কেন?—আচ্ছা দেখবে চলো, বলে পেত্রা আমায় নিয়ে আবার সেই হ্রদের ধারে গিয়ে বললে, জলে এখন একটু হাত দাও দেখি।
হাত দিয়ে সবিস্ময়ে বললাম, এ কী, এ তো রীতিমতো গরম! ঘণ্টা তিনেক আগেও তো ঠাণ্ডা দেখেছি!
পেত্রা থেমে বললে, এইটেই এ হ্রদের রহস্য এবং তারই কিনারা করবার জন্যে এই ড়ুবুরির পোশাক। এ হ্রদ থেকে থেকে হঠাৎ এত গরম হয়ে ওঠে যে ওপরে ঝঞার কুণ্ডলী উঠতে থাকে। এদেশে লোকরা তাই দেখে ভাবে এখানে অপদেবতা আছে।
জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি ড়ুবুরির পোশাকে এ হ্রদের জলে নেমে কী পেয়েছ?
কী পেয়েছি, কাল ঠাণ্ডা হবার পর নীচে নামলেই দেখতে পাবে।
পরের দিন জল ঠাণ্ডা হতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। ড়ুবুরির পোশাক পরে আমরা দুজনে তারপর হ্রদের নীচে নামলাম। পাহাড়ের ওপরে হলেও হ্রদটি খুব কম গভীর নয়। কিন্তু জল এমন পরিষ্কার যে দেখতে কিছু কষ্ট হয় না।
জলের তলায় পরস্পরের সঙ্গে কথা বলবার জন্যে আমরা একটা স্পিকিং টিউব অর্থাৎ কথা কইবার রবারের নলের ব্যবস্থা করে গিয়েছিলাম।
হ্রদের তলায় এক জায়গায় এসে পেত্রা বললে, নীচের দিকে চেয়ে কিছু দেখতে পাচ্ছ?
বললাম, দেখতে পাচ্ছি তো নীলচে একরকম পাথর।
নীলচে পাথর নয়, পৃথিবীর সব চেয়ে দামি রত্ন হিরে যার মধ্যে পাওয়া যায় এ সেই পাথর।
হিরে! উত্তেজিত ভাবে নীচের দিকে চেয়ে দেখতে দেখতে চমকে উঠলাম। নীলচে পাথরের গায়ে সত্যিই নানা জায়গায় আরেক জাতের পাথর এই জলের তলাতেও জ্বলজ্বল করছে।
হিরে! চারিধারে এত হিরে! এই হ্রদের মধ্যে তো সাতটা সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য তা হলে লুকোনো রয়েছে। মনের ওপর যেন রাশ রুখল না। ওরই ভেতর প্রকাণ্ড একটা জ্বলজ্বলে পাথর দেখতে পেয়ে সেটা নেবার জন্যে পাগল হয়ে উঠলাম। বাটালি গগাছের একটা যন্ত্র পেত্রা সঙ্গে এনেছিল। সেটা দিয়ে ঠুকে ঠুকে ধারের পাথর আলগা করে যখন সেটা তুললাম তখন অবাক হয়ে দেখি তার নীচে একটা নলের মতো গর্ত বেরিয়ে পড়েছে এবং তার ভেতর দিয়ে হুহু করে জল গলে যাচ্ছে।
এই সামান্য ব্যাপারে পেত্রা কিন্তু হঠাৎ যেন খেপে গেল। আমার আরও কয়েকটা হিরে সংগ্রহ করবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সে একেবারে পাগলের মতো টানতে টানতে আমায় ওপরে নিয়ে গিয়ে তুলল। শুধু তাই নয়, ড়ুবুরির পোশাক ছেড়ে ফেলেই আমায় কোনও কথা বলবার অবসর না দিয়ে, টেনে নিয়ে গেল পাহাড়ের এক প্রান্তে। সেখান থেকে দড়ির একটি সিঁড়ি জলের ধার পর্যন্ত টাঙানো এবং জলের ধারে পাহাড়ে একটি খাঁজের আড়ালে একটি ছোট মোটরঞ্চ দেখলাম লুকোনো রয়েছে।
দড়ির সিঁড়ি দিয়ে মোটর-বোটে নেমে সেটি চালিয়ে মাইল দশেক দ্বীপটি থেকে দূরে যাবার আগে মুখে ফেনা উঠিয়েও পেত্রার কাছ থেকে একটা কথা বার করতে পারলাম না।
অবশেষে অত্যন্ত রেগে বললাম, আমার কথার জবাব যদি না দাও তা হলে তোমায় বোট থেকে আমি সমুদ্রে ফেলে দেব-বুঝেছো! বলো—এ রকম ভাবে হঠাৎ পাগলের মতো পালিয়ে আসার মানে কী?
মানে এখুনি বুঝতে পারবে। কানে আঙুল দিয়ে শক্ত হয়ে বোটের রেলিং ধরে বোসো দেখি।
তার পরের কথা আর শুনতে পেলাম না। আমি দ্বীপটির দিকেই মুখ ফিরিয়েছিলাম। হঠাৎ আকাশ ফাটানো শব্দে সেই বিরাট পাহাড়ের দ্বীপটি তুবড়ির খোলের মতো চৌচির হয়ে ফেটে গিয়ে সমুদ্রের জলে ড়ুবে গেল।
প্রলয়ের মতো যে ঝড় তারপর উঠল, আর যে সব প্রচণ্ড ঢেউ এসে দৈত্যের মতো কিছুক্ষণ আমাদের বোট নিয়ে লোফালুফি শুরু করলে, তাদের হাত থেকে বেঁচে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল।
এইবার পেত্রাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপার কী বলো তো পেত্রা!
ব্যাপার আর কী? তোমার এই হিরে তোলা!
ওই এক ছটাক একটা নুড়ি তোলাতেই এত বড় একটা দ্বীপ ফেটে চৌচির হয়ে গেল!
তা যাবে না! পেত্রা বুঝিয়ে দিল, দ্বীপটা আসলে একটা আগ্নেয়গিরি ছাড়া কিছু নয়। ওপরে যে হ্রদ দেখেছ সেটা এককালে ছিল আগুন বেরুবার মুখ, এখন কোনও রকমে বুজে গিয়ে বহুকালের বৃষ্টির জল জমে হ্রদ হয়ে উঠেছে। কিন্তু নীচেকার আগুন যে এখনও নিভে যায়নি, জল মাঝে মাঝে গরম হওয়াতেই তা বোঝা যায়।
হ্রদের তলাটি খুব পুরু তো নয়। তুমি নুড়ি তোলার সঙ্গে সঙ্গে কোনও গোপন ফুটো তাই সেখানে বেরিয়ে পড়ে। সেই ফুটো দিয়ে হ্রদের জল গভীর পাতালের প্রচণ্ড আগুনের ওপর গিয়ে পড়ে। সে জলের তার পর বাষ্প হয়ে উঠতে কতক্ষণ! ওপরে তো সরু একটা ফুটো। বেরুবার পথ না পেয়ে সেই বাষ্প তাই ক্রমশ প্রচণ্ড বেগ পেতে পেতে গোটা পাহাড়টাকে ফাটিয়ে বেরিয়ে গেছে। ঐ নুড়িটুকু তুলেই দ্বীপটাকে তুমি ভোবালে!
ঘনাদার গল্প শেষ হলে গৌরাঙ্গ সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলে, দ্বীপটার নাম কী ছিল ঘনাদা?
