সাহেব এবার চোখ খুলে তাকিয়ে বললে, অ্যাঁ-মরিনি তা হলে! কিন্তু আমার শিরদাঁড়া ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে!
বললাম, না, তাও হয়নি। উঠে দাঁড়াও দেখি।
সাহেব কিন্তু বসে বসে আমায় ভাল করে লক্ষ করে বললে, তুমি কি জাপানি?
তারপর নিজে নিজেই আবার বললে, উঁহুঃ, জাপানিদের চেহারা তো এরকম হয়!
হেসে বললাম, আমি জাপানি নয় বাঙালি। বাংলাদেশের নাম শুনেছ। কখনও?
বাংলাদেশ! সাহেবের চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল, বাংলাদেশের নাম শুনিনি। আবার? তাগোরের সঙ্গে আমার কত আলাপ ছিল।
তাগোরের সঙ্গে! তাগোর আবার কে?
বাঃ—রাবীন্দ্রা নাত্ তাগোর!
বুঝলাম কবিগুরুর নাম ফরাসি উচ্চারণে এই রকম দাঁড়িয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম, তার সঙ্গে তোমার আলাপ ছিল? কোথায় আলাপ হয়েছিল?
একটু যেন ভড়কে গিয়ে সে বললে, আলাপ মানে দেখাশোনা আর কি! পারিতে দেখাশোনা হয়েছিল।
বেশ একটু কড়াভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, কী সূত্রে?
সাহেব আরও আমতা আমতা করে বললে, মানে, তিনি যখন ওখানে ছিলেন তখন কাগজে তাঁর ফটো দেখেছিলাম।
ধমক দিয়ে এবার বললাম, দেখো সাহেব, আমার কাছে ওসব ধাপ্পা দিয়ে কোনও লাভ হবে না। তোমার পাততাড়ি গুটিয়ে এঘর থেকে সরে পড়তেই হবে। নাও ওঠো।
সাহেব এবার রীতিমতো কাঁদুনি গেয়ে উঠল, উঠব তো! কিন্তু যাব কোন চুলোয় শুনি? পোড়া শহরে কি একটা হোটেল আছে? সারাদিন ঘুরে একটা ঘরের বারান্দা পর্যন্ত ভাড়া পাইনি। আমি কি রাস্তায় গিয়ে শোব?
এবার হেসে ফেলে বললাম, আচ্ছা, আমার এখানে থাকতে পারো, কিন্তু বেচাল যেন আর না দেখি।
সাহেব নিজের গর্দানটায় একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে বললে, না, আমার গর্দানটা বিমা করা নেই।
মালপত্র নীচে থেকে তুলে এনে তারপর আমরা বেশ জমিয়ে বসে আলাপ শুরু করলাম। মসিয়ে পেত্রা আমারই মতো ভবঘুরে লোক। ঝগড়া দিয়ে শুরু হওয়ায় এবং দুজনেই এক ধাতের লোক হওয়ায়, দোস্তি-টা আমাদের খুব তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। আমি ইতিমধ্যে আমার চন্দন কাঠের ব্যবসার কথা বলেছি। মসিয়ে পেত্রা মাথা নেড়ে বলেছে, ওসব চন্দন কাঠ-টাট কোনও কাজের নয়, এ দ্বীপপুঞ্জের আসল মাল হল গন্ধক! দেখো না এক বছরের মধ্যে এই গন্ধকের ব্যবসায় কী রকম লাল হয়ে যাই।
উদারভাবে পেত্রা তারপর আমাকে তার ব্যবসার ভাগীদার করতে রাজি হয়েছে। তামি হেসে বলেছি, আগে তুমি গন্ধকের খনি খুঁজে বার করো, তারপর দেখা যাবে!
পেত্রা অত্যন্ত ক্ষুন্ন হয়ে বলেছে, ওঃ, তুমি আমায় অবিশ্বাস করছ—পাগল ভাবছ আমায়! আচ্ছা, দেখতে পাবে একদিন।
পেত্রার আস্ফালন যে একেবারে মিথ্যে নয়, একদিন সত্যিই তার প্রমাণ পেয়েছি। কিন্তু সে প্রায় বছর ছয়েক বাদে। এই ছ বছর তার কোনও খোঁজই রাখিনি বা পাইনি। এফাটা দ্বীপে মালানার বাড়িতে আমার ঘরে দুদিন থাকার পর হঠাৎ একদিন সকালবেলা কিছু না বলে কয়ে সে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছল। একটু অবাক হলেও তার সম্বন্ধে বিশেষ মাথা ঘামাইনি। এ রকম খামখেয়ালি লোক দুনিয়ায় এ পর্যন্ত অনেক দেখেছি। বিকেলে কী করবে সকালে তারা নিজেরাই জানে না।
ছ বছর বাদে আবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ! এবার খুব অদ্ভুত ভাবে।
আনিওয়া দ্বীপে ফিরে এসে চন্দন কাঠের পেছনে তখনও লেগে আছি। কিন্তু ব্যবসা অত্যন্ত মন্দা। ফিজি দ্বীপের চন্দন কাঠ উজাড় করবার পর বেহিসাবি সদাগরেরা এই দ্বীপে হানা দিয়ে অবাধে যথেচ্ছভাবে চন্দন গাছ কেটে একেবারে সাবাড় করে দিয়েছে বললেই হয়।
ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে আবার কোথাও পাড়ি দেব কিনা ভাবছি। এমন সময় অদ্ভুত। একটা ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। আনিওয়া দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সমুদ্রের ধারের একটি ছোট গাঁয়ের সর্দারের বাড়িতে তখন আমি থাকি। কিছুদিন ধরেই গাঁয়ের লোকদের ভেতর একটা চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা লক্ষ করছিলাম। সেদিন তার কারণটা জেনে অবাক হয়ে গেলাম।
আমাদের গাঁ থেকে মাইল দশেক দূরে সমুদ্রের ওপর আর একটি ছোট দ্বীপ দেখা যায়। দ্বীপ না বলে তাকে সমুদ্রের ভেতর থেকে ওঠা একটা পাহাড় বলাই উচিত। যেদিকে যাও, সমুদ্রের ওপর থেকে প্রায় খাড়া পাহাড়ের দেয়াল প্রায় দু হাজার ফুট উঠে গেছে।
এ দ্বীপটিকে এ অঞ্চলের লোকে অপদেবতার বাসা বলেই জানে। জনমনিষ্যি সেখানে থাকে না। শুধু ঝাঁকে ঝাঁকে সামুদ্রিক পাখি সন্ধ্যার পর সেই পাহাড়ের নীচের দিকের খাঁজে ও পাথুরে তাকে রাত্রিবাস করতে নামে। দুঃসাহসী দু-চার জন দেশি লোক তাদের ভারা-ঝোলানো কাটা মারান নৌকোয় দিনের বেলা সেখানে, সেই পাখিদের আবর্জনার সার হিসেবে অত্যন্ত দামি, গুয়ানো সংগ্রহ করতে যায়। কিন্তু মরে গেলেও সেখানে রাত কাটায় না। এমনকী দিনের বেলাতেও পাহাড়ের ওপর কী আছে তারা কোনও দিন সাহস করে চড়ে দেখেনি।
এই ভুতুড়ে পাহাড়ে কিছুদিন থেকে অপদেবতার উৎপাত নাকি আরও বেড়ে গেছে। গুয়ানো কুড়োতে গিয়ে এক দলের জন ছয়েক নাকি আশ্চর্য ভাবে মারা পড়েছে। ওপর থেকে প্রকাণ্ড একটা পাথর ঠিক তাদের লক্ষ করেই কে গড়িয়ে দিয়েছিল। আরেক দল পাহাড়ের ওপর বিকট এক মূর্তি দিনের বেলাতেই দেখতে পেয়েছে।
এসব ছাড়া রাত্রে আজকাল পাহাড়ের ওপর এই গাঁ থেকেই অদ্ভুত ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়, মাঝে মাঝে রহস্যজনক শব্দও সেখান থেকে ভেসে আসে।
পাছে পাহাড়ের অপদেবতার কোপ এই গাঁ পর্যন্ত এসে পৌঁছায়, সেই ভয়েই গাঁয়ের লোক সারা। ভূতের ওঝারাও সময় বুঝে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে ব্যস্ত। অপদেবতাকে ঠাণ্ডা করবার কড়ার দিয়ে তারা ষােড়শোপচারে ভূত পুজোর আয়োজন করেছে।
