এই ওয়াই-এর তিনটে হাতা যেখানে এসে মিলেছে সেখানকার এফাটা দ্বীপটাই হল সমস্ত দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী।
এফাটায় দুটো বন্দর, ভিলা আর হাভানা। ভিলা বন্দরেই সরকারি আস্তানা।
চন্দন কাঠের ব্যবসার জন্য তখন নিউ হেব্রাইডিজের একেবারে দক্ষিণের আনিওয়া নামে একটি দ্বীপে থাকি। সেখান থেকে সরকারি লাইসেন্স নেবার জন্যে ভিলা বন্দরে ক-দিনের জন্যে এসেছি।
সরকারি দপ্তরখানা সব দেশেই সমান। আঠারো মাসে তাদের বছর। নিউ হেব্রাইডিজে আবার এ বিষয়ে গোদের ওপর বিষফোড়া আছে। একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব সেখানে দোসর। নিউ হেব্রাইডিজের রাজধানী এক, কিন্তু রাজত্ব দুজনের। ইংরেজ আর ফরাসি এক সঙ্গে মিলে সেখানে শাসন করে। সুতরাং সাত দিনের কাজ সাত সপ্তাহেও সারা হল না। ইংরেজি থেকে ফরাসি আর ফরাসি থেকে ইংরেজিতে তরজমা হতে হতে আমার লাইসেন্সের আর্জি, কোন লালফিতের জালে যে জড়িয়ে পড়েছে তার হদিসই তখন পাচ্ছি না। ঠিক এই সময়ে সঁসিয়ে পেত্রার সঙ্গে আমার হঠাৎ আলাপ হয়। আলাপ হল আশ্চর্য ভাবে। রাজধানী ও বন্দর হলে কী হয়, ভিলাতে ভাল একটা হোটেল নেই। মালানা নামে একটি দেশি লোকের টিনের চাল দেওয়া একটা মেটে দোতলার ওপরকার একখানা ঘর ভাড়া করে আছি। সেদিন সরকারি দপ্তরখানা থেকে যত অকর্মণ্য কর্মচারীদের সঙ্গে বচসা করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরছি, এমন সময় ওপরে আমারই ঘরে তুমুল আন্দোলন হচ্ছে বলে মনে হল।
নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে অত্যন্ত অবাক হয়ে ওপরে উঠে গেলাম। ঘরের দরজায় যাবার সময় আমি তালা দিয়ে গেছি নিজের হাতে। সে ঘরে গণ্ডগোল হয় কী করে?
সিড়ি দিয়ে উঠে মাঝখানের বারান্দাটুকু পার হবার আগেই মালানার সঙ্গে দেখা। আমার ঘর থেকে সে উত্তেজিতভাবে বেরিয়ে আসছে। আমায় দেখতে পেয়েই সে হাত-পা নেড়ে জানালে যে এখুনি আমাদের পুলিশে যাওয়া দরকার।
পুলিশে যাওয়া দরকার? কেন?
আর কেন? কোথাকার এক ফরাসি গুণ্ডা এসে আপনার ঘর দখল করেছে। আমি কত ঠেকাবার চেষ্টা করলাম, তা শুনলই না। জোর করে তালা ভেঙে ঘরে ঢুকল। এখনই আমি থানায় যাচ্ছি।
হেসে বললাম, তার আগে লোকটার চেহারা একবার দেখা দরকার নয় কি!
মালানা সভয়ে বলল, দেখবেন কী মশাই! সে একেবারে খুনে গুণ্ডা। কী করে বসবে ঠিক নেই।
হেসে বললাম, আমি কী করব যখন ঠিক আছে তখন ভাবনা কী?
মালানা কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে একটু হতভম্ব হয়ে ভয়ে ভয়ে আমার পিছু পিছু এল।
ঘরে ঢুকেই দেখি আমার জিনিসপত্র চারিদিকে ছত্রাকারে ছড়ানো! তারই মধ্যে আমার ডেক-চেয়ারটিতে গা এলিয়ে দিয়ে বিশাল চেহারার একটি লোক নিশ্চিন্ত আরামে পাইপ টানছে। পরনে একটা প্যান্ট ছাড়া তার কিছু নেই। গরমের দরুনই বোধ হয় গায়ের জামাজোড়া সব খুলে ফেলেছে। লোকটার গায়ের চামড়া সাদা এবং গোঁফ-দাড়ির ছাঁট দেখলে ফরাসি বলেই মনে হয়।
আমায় ঢুকতে দেখেই লোকটা ডেক-চেয়ারে উঠে বসে বাঘের মতো ফরাসি ভাষায় হুঙ্কার দিয়ে উঠল, কে রে, হতভাগা নিগার!
মালান তো সেই হুঙ্কার শুনেই তীরের মতো ছিটকে গিয়ে পড়ল বারান্দায়। তারপর আর তার চুলের টিকি দেখা গেল না।
মুচকে একটু হেসে আমি একেবারে পরিষ্কার বাংলায় বললাম, চিনতে পারছ না, সাহেব! আমি তোমার যম!
দুর্বোধ ভাষা শুনে আর আমায় হাসতে দেখে সাহেব একেবারে খেপে গেল। আমায় প্রায় কাঁচাই গিলে ফেলবে এমনই ভাবে দাঁত কড়মড় করে দাঁড়িয়ে উঠে এবার ইংরেজিতে বললে, বেরিয়ে যা শিগগির, কালা নেটিভ! নইলে তোর গায়ের সমস্ত চামড়া আমি খুলে নেব।
আগের মতোই হেসে বললাম, বল কী সাহেব, আমার যে শুনেই গা সুড়সুড় করছে, কিন্তু তার আগে তোমায় যে একটু গা তুলতে হবে, এটা আমারই ঘর কিনা।
আমার মুখে চোস্ত জার্মান শুনে সাহেব প্রথমটা একেবারে থ হয়ে গেল। যাই হোক, সাহেব একেবারে মুখখু নয়, জার্মান ভাষাটা অন্তত বোঝে জেনে আমার একটু কৌতূহলও তখন বেড়েছে।
প্রথমে হতভম্ব হলেও পরমুহূর্তেই আমার কথার বিষটুকুর জ্বালাতে সাহেব একেবারে ফেটে পড়ল, এ ঘর তোমার? প্রমাণ কী তার?
আবার একটু হেসে আমার জিনিসপত্রগুলো দেখিয়ে দিয়ে বললাম, প্রমাণ তো তুমিই ঘরময় ছড়িয়ে রেখেছ।
বটে! বলে সাহেব হঠাৎ আমার সুটকেসটা ধরে বাইরের বারান্দায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললে, যাও, তোমার প্রমাণ ঘরের বার হয়ে গেছে। আর সুবুদ্ধি যদি এখনও হয় তা হলে একটি লাথিতে তোমাকেও ওই প্রমাণের পিছু পিছু পাঠিয়ে দেব।
ঘরের মাঝখানেই সাহেবের প্রকাণ্ড কেবিন ট্রাঙ্কটা পড়েছিল। সেটা তুলে নিয়ে বললাম, সেটা একটু অভদ্রতা হয় নাকি? তার চেয়ে বরং তুমিই দেখো, সাহেব, আমি তোমার মোট বইবার সমস্যাটা মিটিয়ে দিচ্ছি।
ট্রাঙ্কটা ছুঁড়ে বারান্দা পার করে নীচে ফেলে দিলাম।
সাহেব এক লহমা হাঁ করে দাঁড়িয়ে থেকে একেবারে তোপের গোলার মত আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
জামাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে চেয়ে দেখি, জানালার কাছে সচাপ্টে যেমন ভাবে
পড়েছিল সাহেব সেইভাবেই শুয়ে আছে। নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু!
ঘরের কুঁজো থেকে তার মুখে জল ছিটিয়ে দিয়ে নিজেই এবার গিয়ে তুলে ধরলাম।
সাহেব হাঁফিয়ে উঠে বসে চোখ না খুলেই চেঁচিয়ে উঠল, আমি মরে গেছি, নির্ঘাত মরে গেছি।
তাকে একটা ঝাঁকানি দিয়ে বললাম, হ্যাঁ, মরে তুমি নরকে এসেছ। যমরাজ তোমায় অভ্যর্থনা করতে এসেছেন। চেয়ে দেখো!
