আচ্ছা, এভারেস্টের মাথায় যা পরিয়ে দিলেন, সেটা কী টুপি ছিল? জিজ্ঞাসা করলে শিশির।
টপ হ্যাট বোধহয়? ঘনাদার বদলে গৌরই উত্তর দিলে এবং ঘনাদা আমাদের দিকে ক্রুকুটি হেনে শিশিরের একটা সিগারেট তুলে নিয়ে উঠে গেলেন।
নুড়ি
ঘনাদার হাই তোলা একটা অনুষ্ঠান বিশেষ। গরাদের ফাক থেকে পুঁচকে দুপেয়ে জানোয়ারগুলোর বেআদবি দেখে দেখে সিংহ মশাই-এর যখন দিক ধরে যায়, তখন তার আলস্য-ভাঙা দেখবার সৌভাগ্য যদি কারুর হয়ে থাকে তা হলে সে ঘনাদার হাই তোলার কিঞ্চিৎ মর্ম বুঝতে পারবে। তেমনই বিরাট মুখব্যাদান, তেমনই দন্তরুচিকৌমুদির শোভা ও তেমনই তিন বৎসর তৈলবিহীন গোরুর গাড়ির চাকার আওয়াজের মতো সুদীর্ঘ একটানা একটি সুরলহরী। সিংহমশাই তবু ঘনাদার মতো তুড়ি দিতে পারে না।
ঘনাদার হাই তোলা দেখে আমরা সত্যি তাজ্জব হয়ে গেলাম। তাজ্জব হলাম তাঁর হাই তোলার দৃশ্যে নয়, তিনি যে হাই তুললেন কী করে শুধু এই কথা ভেবে।
রাম, শিবু ও আমি পরস্পরে হতাশ ভাবে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। হায়, হায়! সন্ধ্যার সমস্ত আয়োজনটাই মাটি!
সকাল থেকে অবিশ্রান্তভাবে বৃষ্টি পড়ছে। করপোরেশনের কর্তব্যপরায়ণতার দৌলতে সে বৃষ্টির জলের সাধ্য কি যে সহজে রাস্তা থেকে বেরোয়। ট্রাম বাস বন্ধ। কলকাতা প্রায় ভেনিস হয়ে উঠেছে বললেই হয়। এ হেন সন্ধ্যাটা মেসে বসে জমাবার জন্য সন্ধ্যা থেকে ঘনাদাকে উসকে দেবার কী চেষ্টাটাই না করা হয়েছে! কিন্তু এ বাদলায় ঘনাদাও যেন বাসি মুড়ির মতো মিইয়ে গেছেন।
যে-ঘনাদার কাছে তিল ফেলতে না ফেলতে তাল হয়ে ওঠে, জলের ছিটে পড়তে পড়তে যিনি প্রলয় প্লাবনে আমাদের ভাসিয়ে দেন, সেই ঘনাদাকে আজ সন্ধ্যা থেকে একটু তাতিয়ে তুলতে পর্যন্ত পারা গেল না।
অথচ কোনও অনুপানই বাদ পড়েনি।
ঘনাদাকে ধার দিতে দিতে শিশিরের সিগারেট কেস প্রায় খালি হয়ে এসেছে, শিবু ও রাম সেই যে নতুন মার্কিন সিগারেট লাইটারটা তাঁর হাতে দিয়েছে, তা প্রায় বাজেয়াপ্ত হবার শামিল জেনেও এখনও পর্যন্ত একবার ফেরত চায়নি। মেসের ম্যানেজার আমাদের শাসনে ভুলেও একবার ছমাসের বাকি পাওনার কথা তোলেনি এবং আমরা সবাই টমটম চালানো থেকে অ্যাটম বোমা পর্যন্ত হেন প্রসঙ্গ নেই যা ঘনাদার সামনে টোপ গিলতে তুলে ধরিনি।
কিন্তু আরামকেদারায় কমন রুমের একমাত্র আরাম-কেদারায় সেই যে ঘনাদা গা এলিয়ে দিয়েছেন, তারপর তাঁকে একটু সোজা করে বসাতেও পারিনি।
মাছ ধরার প্রসঙ্গ দিয়ে শিবু অনুষ্ঠান শুরু করেছে। রাম তাতে ফোড়ন দিয়ে বলেছে, বর্ষার দিনে মাছ নাকি টোপ খায় ভাল।
কিন্তু মাছে টোপ খাক বা না খাক, আমাদের টোপ বৃথাই নষ্ট হয়েছে। এমনকী কত বড় এক মহাশের একবার তার ছিপে উঠেছিল, গৌরাঙ্গ সগর্বে তা দুহাত ছড়িয়ে দেখিয়ে দেবার পরও ঘনাদার কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
মহাশের থেকে ঘনাদা একেবারে দক্ষিণ মেরুসাগরে মহাতিমি শিকারের কথা তুলবেন এই আশাই আমরা করেছিলাম, কিন্তু তার বদলে তিনি ক্লান্তভাবে শুধু একটু সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়েছেন।
মাছ থেকে আমরা পাহাড়ে ওঠার কথা তুলেছি। হাতের কাছে এমন একটা হিমালয় থাকা সত্ত্বেও বাঙালির ছেলেদের কেন যে পাহাড়ে চড়ার এতটুকু উৎসাহ ও যোগ্যতা নেই তা নিয়ে গৌরাঙ্গ দুঃখ প্রকাশ করেছে।
আমরা আড়চোখে চেয়ে দেখেছি ঘনাদা আরামকেদারার হাতলের ওপর একটা পা তুলে দিয়ে আর একটু আয়েশ করে শুয়েছেন।
পাহাড়ে চড়া থেকে বন্দুক ছোঁড়া ও তা থেকে আবার ঘোড়ায় চড়ায় আমরা ঘুরে গেছি।
ঘনাদা সিগারেটে সুখটান দিয়ে চোখ দুটি মুদ্রিত করেছেন। হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা ওয়েট-লিফটিং অর্থাৎ ওজন তোলার কথা পেড়েছি। বিজ্ঞানের নজির তুলে শিবু বলেছে—পোকামাকড়েরা যখন নিজেদের চেয়ে বহুগুণ ওজনের জিনিস তুলতে পারে, তখন মানুষেই বা পারবে না কেন?
প্রশ্নটা মাঠেই মারা গেছে। ঘনাদা হাই তুলেছেন এবং আমরা এবার আশা ছেড়ে দিয়েছি।
মরিয়া হয়েই রাম বোধ হয় শেষ চেষ্টা করেছে। কলাকৌশল সব জলাঞ্জলি দিয়ে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করেছে, আচ্ছা, ঘনাদা, আপনি কখনও ওয়েট লিফটিং করেননি?
ওয়েট-লিফটিং! ঘনাদা নেহাত আলস্যভরে বলেছেন, না, ওয়েট-লিফটিং করিনি। তবে একবার একটা পাথর তুলেছিলাম।
আমরা একেবারে উদগ্রীব হয়ে উঠে বসেছি। গৌরাঙ্গ সোৎসাহে জিজ্ঞাসা করেছে, পাথর তুলেছেন! কত বড় ঘনাদা?
আমাদের একেবারে দমিয়ে ধরাশায়ী করে ঘানাদা বলেছেন, কত বড় আর! এই এতটুকু নুড়ি ছটাকখানেক ওজন হবে।
আমাদের হতাশার দীর্ঘনিশ্বাস শেষ হবার আগে ঘনাদা অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে আবার বলেছেন, মিকিউ দ্বীপটা তাতেই তো ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
একটা দ্বীপ ফেটে চৌচির হয়ে গেল? শুধু একটা নুড়ি তোলার জন্য? নিজেদের অজান্তে আমরা প্রশ্ন করে ফেলেছি।
ঘনাদা যেন অবজ্ঞাভরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেছেন, হ্যাঁ, তাইতেই ফেটে চৌচির হয়ে সমুদ্রে ড়ুবে গেল।
না, আর ঘনাদাকে উসকানি দেবার দরকার হয়নি।
তিনি নিজেই এবার শুরু করেছেন।
নিউ হেব্রাইডিজের নাম শুনেছিস কখনও?
আর শুনে থাকলেও আসলে কী বস্তু বোধ হয় জানিস না। নিউ হেব্রাইডিজ হল নিউজিল্যান্ডের ঠিক উত্তরে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব কোণে কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপের জটলা।
পৃথিবীর মাইল পঞ্চাশ ওপর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সমুদ্রের ওপর কটা পাথরকুচি ফাঁক ফাঁক করে সাজিয়ে ইংরেজি ওয়াই অক্ষরটা লেখা।
