না, তা পড়বে না, তবে আর্জেনটাইনের পাম্পাস-এ বৃথাই যদি গাউচোদের সঙ্গে মিশে থাকি, তাহলে এই দড়িতেই তাকে ধরতে ও বাঁধতে পারব। বলে বরফের ফুটোয় চোখ লাগিয়ে দেখলাম ইয়েতি-দানব বেশ নিঃসন্দিগ্ধ ভাবেই রুন-এর শেকড় তখনও খুঁজছে।
তানাকাকে পেছনে তৈরি থাকতে বলে এক ধাক্কায় বরফের দরজা ঠেলে দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
চক্ষের নিমেষে পিছু ফিরে তাকিয়ে ইয়েতিটা তৎক্ষণাৎ ঝড়ের বেগে দৌড় মেরেছে।
কিন্তু ঝড়ের চেয়ে বেশি বেগ আমার লাসোর। বিদ্যুৎগতিতে লাসোর দড়ির ফাঁস গিয়ে ইয়েতির কোমরে আটকে গেল।
এক সেকেন্ডের মধ্যে হকচকিয়ে সে থেমে গেল, প্রাণপণে সেই বাঁধন খোলার চেষ্টাও করল একবার। তারপর বিফল হয়ে সে যা করে বসল, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।
হঠাৎ দেখি ঝড়ের বেগে আমি সামনে ছুটে চলেছি। বাঁধন খুলতে না পেরে ইয়েতি আমায় সুদ্ধই সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে জাহাজের পেছনের ল্যাং-বোটের মতো৷ বিপদ দেখে তানাকাও পেছন থেকে এসে আমার সঙ্গে দড়িটা টেনে ধরবার চেষ্টা করল। কিন্তু ইয়েতির তাতে ভ্রুক্ষেপও নেই। সে সমানে আমাদের দুজনকে টেনে উড়িয়ে নিয়ে তখন ছুটছে।
ইয়েতিও থামবে না, আমাদের জেদ আমরাও দড়ি ছাড়ব না। পাছে হাত ফসকে যায় বলে দড়িটা আমরা তখন নিজেদের কোমরে জড়িয়ে নিয়েছি।
কিন্তু ইয়েতি ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা দেবে বলে আমরা যা ভেবেছিলাম, তার কোনও লক্ষণই দেখা গেল না। যদি বা সে একবার একটু থামে, আমি দড়ির আর এক ফাঁস বাগিয়ে লাগাবার আগেই আবার দৌড় দেয়। তুষার-প্রান্তরে বিপদের অন্ত নেই। কোথাও বিরাট ফাটল, কোথাও নরম তুষার, যার মধ্যে চোরাবালির মতো ড়ুবে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু যেন মুখস্থ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে এমনই অনায়াসে সে সমস্ত বিপদ এড়িয়ে যেতে লাগল।
ঠোকাঠুকি আঁচড় ইত্যাদি একটু লাগলেও অত বেগে যাওয়া সত্ত্বেও তার বাহাদুরিতেই আমাদেরও কোনও বিপদে পড়তে হল না।
কিন্তু ইয়েতি চলেছে কোথায়! পুমোরি চূড়া বাঁয়ে রেখে লো-লো চূড়ার দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ লো-লোও বাঁয়ে ফেলে সে উঠতে লাগল। এরপর যেখানে এসে সে প্রথম থামল, সেখানে ডানদিকে নুপৎসে ও লোৎসের চূড়া, আর সামনে একটু বাঁদিক ঘেঁষে স্বয়ং মাউন্ট এভারেস্ট। পাহাড়ের দেওয়াল-ঘেরা মাঝখানের জায়গাটা এত উঁচুতে না হলে তুষার-প্রান্তরের বদলে হ্রদ হতে পারত। এখানে একটু থেমেই সে সোজা সেই তুষার-প্রান্তরেই নেমে গেল আমাদের নিয়ে।
তারপর তুষার-প্রান্তর ছেড়ে সে আবার যেই উঁচুতে উঠতে শুরু করল, তখনই আমাদের দুর্দশা চরম হয়ে উঠল। দড়ি দিয়ে নিজেদের ভাল করে বেঁধে নিয়েছিলাম তাই, নইলে কখন শিথিল হাত খুলে গিয়ে একেবারে অতলে আছড়ে পড়তাম। এই অবস্থাতেও তানাকা খানিক বাদে চিৎকার করে উঠল, আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে, দাস! নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।
পশমি আলখাল্লার ঝোলা পকেটেই অল্টিমিটার অর্থাৎ উচ্চতা মাপবার যন্ত্রটা ছিল। বার করে দেখি ছাব্বিশ হাজার সাতশো ত্রিশ ফিট! বুঝলাম—এত উঁচু জায়গার পাতলা হাওয়ায় অসিজেনের স্বল্পতার দরুনই এমন হচ্ছে। এসব জায়গায় প্রথমটা শরীর বেশ হালকা লাগে, তারপর শরীর অবশ হয়ে মৃত্যু ঘনিয়ে আসে।
কিন্তু এখন উপায়? হঠাৎ তিব্বতি পুঁথির শ্লোকটার শেষ অংশ মনে পড়ে গেল। দুজনেরই পকেটে খানিকটা করে রুন-এর শেকড় ছিল।
নিজেরও তখন মাথাটা ঘুরতে শুরু করেছে। তাড়াতাড়ি রুন-এর শেকড়টা বার করে এক কামড় দিয়ে তানাকাকে তৎক্ষণাৎ তাই করতে বললাম।
হাঁফাতে আরম্ভ করলেও ইয়েতি তখনও সমানে উঠছে। যেখান দিয়ে যেভাবে সে উঠছে, তা মানুষের কল্পনার অতীত। আমরা দুজন তখন তার কোমরের দড়ি থেকে একরকম ঝুলছি বললেই হয়।
ছাব্বিশ থেকে অল্টিমিটারে সাতাশ হাজার দেখা দিল। তারপর সাড়ে সাতাশ। আটাশের কাছে চোখ প্রায় ঝাপসা হয়ে গেছে, কানে যেন ভেতর থেকে ঢাক পিটছে। জ্ঞান হারাতে আর বেশি দেরি নেই! রুন-এর শেকড় তাহলে পুরোনো পুঁথির গালগল্প?
হঠাৎ অল্টিমিটারে সাড়ে আটাশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। না, এই তত মাথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে! নিঃশ্বাসের কোনও কষ্ট আর নেই। আশ্চর্য! রুন-এর শেকড়ে তাহলে ডাক্তারি শাস্ত্রের অজানা এমন কিছু আছে, যা ফুসফুসের অসিজেন নেবার ক্ষমতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ ওষুধ তো চিকিৎসার রাজ্যে যুগান্তর আনবে।
কিন্তু এ কী! এ যে ঊনত্রিশ হাজার ফিট! একেবারে পৃথিবীর ওপরের চূড়োর ওপর দিয়ে ইয়েতি-দানব আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে সেই চূড়োর ওপরও দুফুট আন্দাজ একটা ঢিবি দেখে মাথার টুপিটা খুলে তাতে লাগিয়ে দিলাম।
তারপর শুরু হল একেবারে উলটো দিকে নামা।
ঘনাদা একটু থামতে শিবু জিজ্ঞাসা করলে, ইয়েতিকে শেষ পর্যন্ত ধরলেন তাহলে!
নাঃ, ধরতে আর পারলাম কই! ঘনাদা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘষে ঘষে দড়িটা অত জখম হয়ে গেল বুঝতে পারিনি! তিব্বতের দিকে রং ব্যাক গ্লেসিয়ারে নামবার পরই সেটা ছিড়ে গিয়ে ইয়েতি পালিয়ে গেল।
আচ্ছা, সেই রুন-এর শেকড় তো আপনার পকেটেই ছিল? জিজ্ঞাসা করলে গৌর, তা একটু এনেছেন নিশ্চয়!
ঘনাদা এবার যেন একটু বিরক্তই হয়ে উঠলেন, কী করে আনব শুনি! রং ব্যাক গ্লেসিয়ার থেকে তিব্বতের লোকালয়ে যাবার পথে তাই খেয়েই তো কাটিয়েছি।
