আর একটি ফুটোয় চোখ লাগিয়ে তানাকাও তখন ব্যাপারটা দেখেছে। দেখে উত্তেজনায় সে আর চুপ করে থাকতে পারল না।
ইয়েতি! ইয়েতি! দুনিয়ায় কেউ যা কখনও দেখেনি, সেই ইয়েতি!
রেগে আগুন হয়ে আমি তাকে চুপ করতে বললাম। কিন্তু ক্ষতি যা হবার, তখন হয়ে গেছে। সামান্য যে শব্দ ফুটোর ভেতর দিয়ে বাইরে পৌঁছেছে, ইয়েতিরা তাই শুনেই সবাই একসঙ্গে উধাও। সব চেয়ে ছোট ইয়েতিকে মাঝখানে রেখে তারা যেভাবে ছুটে পালিয়ে গেল, তাতে বাপ, মা ও বাচ্চা নিয়ে তারা একটি পরিবার বলেই মনে হল।
নিজের বোকামির জন্য লজ্জিত হওয়া দূরে থাক, তানাকা তখনও উত্তেজিত ভাবে বলছে, ভাল করে লক্ষ করেছ, দাস? সমস্ত বৈজ্ঞানিক জগৎকে আমরা স্তম্ভিত করে দেব! কে বলে ইয়েতি একরকম বাঁদর বা হনুমান। ওরা দস্তুরমত নতুন এক শ্রেণীর বনমানুষ—গোরিলা বা শিম্পাঞ্জির চেয়ে অনেক উঁচু স্তরের। ওদের পরনে চিতার চামড়া আর ঈগলের পালক লক্ষ করেছ?
তাকে থামিয়ে বিরক্ত হয়ে বললাম, সবই করেছি। কিন্তু তুমি আহাম্মকের মতো চেঁচালে ওরা এত তাড়াতাড়ি পালাত না—সে খেয়াল আছে?
এবার তানাকা সত্যিই অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে পড়ল। ছি ছি, উত্তেজনায় আমার আর কিছু হুঁশই ছিল না!
কিন্তু লজ্জা তার বেশিক্ষণের নয়। পরমুহূর্তেই সে আবার জিজ্ঞাসা করলে উত্তেজিতভাবে, আচ্ছা, ওদের বরফ খোঁড়ার ধরনটা ভারি অদ্ভুত, না?
হ্যাঁ, ওই বরফ খোঁড়া দেখেই বুঝেছি, প্রাচীন তিব্বতি পুঁথির কথা মিথ্যে নয়।
প্রাচীন তিব্বতি পুঁথির কথা! তানাকা প্রথমটা হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর সবিস্ময়ে বলল, তোমার সেই চুরি-করা তিব্বতি পুঁথি—তাতে এসব কথা কিছু আছে নাকি?
আছে বইকী! বলে সঙ্গের ছোট তুষার-গাঁইতি দিয়ে ফাটলের মুখের বরফের চাঁই কেটে সরিয়ে বাইরে এলাম। তারপর ঝুলির ভেতর থেকে আসল পুঁথিটি বার করে তার হাতে দিয়ে বললাম, এই জায়গাটা পড়ো দেখি।
বাইরে তখন বেশ আলো হয়ে গেছে। তানাকা দুবার জায়গাটা পড়ে বিমূঢ় হয়ে আমার দিকে তাকাল!
হেসে বললাম, পড়েও হেঁয়ালি মনে হচ্ছে বুঝি? ওতে লিখেছে-বরফের মধ্যে থেকেও যা আগুনের চেয়ে গরম, সেই রুন-এর শেকড় যারা চেনে, দেবতা না হয়েও দেবতাদের দেশে ইয়েতিদের মতো তারা থাকতে পায়। রুন-এর শেকড় যে পায়, চো মো হিয়ান মি অর্থাৎ বিশ্বজননীর পূত সলিল সেই আনতে পারে।
তানাকা তখনও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে বললাম, ইয়েতিরা এই রুন-এর শেকড়ই খুঁজছিল বুঝলে? ইয়েতিদের দেখা দূরে থাক, তারা এই চির-তুষারের দেশে কী খেয়ে থাকে, তা-ও বৈজ্ঞানিক পর্যটকেরা এখনও বুঝতে পারেননি। আমরাই বোধহয় প্রথম সে জিনিস দেখব। চলো।
ইয়েতিরা যেখানে ভোরের বেলা বরফ খুঁড়ছিল সেখানেই গিয়ে কিছুক্ষণ সন্ধান করবার পর সত্যি কয়েকটি আশ্চর্য জিনিস পেলাম। নেহাত আগে থাকতে জেনে খোঁজ করছিলাম তাই, নইলে সে জিনিস যে বরফেরই লম্বা টুকরো নয়, কে বলবে ওপর থেকে দেখে কোনও তফাতই বোঝা যায় না। জিনিসটা সাধারণ কোনও মূল নয়, ছাতা-জাতীয় কোনও উদ্ভিদ বলেই মনে হল, বরফের মধ্যেও যা বেঁচে থাকে।
কৌতূহলী হয়ে সেই রুন-এর মূল একটু মুখে দিলাম। স্বাদগন্ধহীন কাগজ চিবোচ্ছি বলেই মনে হল। প্রধানত এই জিনিস খেয়ে ইয়েতিরা ওই বিরাট দানবের মতো শরীর নিয়ে কী করে বেঁচে থাকে বুঝতে পারলাম না।
বুঝলাম সেই দিনই সন্ধের দিকে। তানাকাও আমার সঙ্গে রুন-এর মূল কিছু খেয়েছিল। সন্ধের সময় আমাদের ফাটলে ঢুকে সে বললে, হঠাৎ ঠাণ্ডা কীরকম কমে গিয়েছে দেখেছ, দাস?
আমারও তাই মনে হয়ে একটু অবাক লাগছিল। এ সময়ে হিমালয়ের এ-জায়গায় ঠাণ্ডা তত দিন দিন বাড়বারই কথা, বিশেষ করে সন্ধের সময়ে। সঙ্গে করে-আনা তাপমান-যন্ত্রটা তাই দেখলাম।
কী ব্যাপার! ঠাণ্ডা কমেছে কোথায়! তাপমান যন্ত্রের পারা তো আরও দু-ডিগ্রি নেমে গিয়েছে!
পরের মুহূর্তেই রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রাচীন তিব্বতি পুঁথির কথা তো দেখছি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি!
তানাকাকে সে কথা জানিয়ে বললাম, শুধু শেষ কথাগুলো বাজে কবিত্ব বলে মনে হচ্ছে।
আমাদের অনুমান যে কতখানি ভুল, দুদিন বাদেই তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাব কে জানত!
একদল ইয়েতি ভয় পেয়ে পালালেও, রুন-এর শেকড়ের খোঁজে অন্য ইয়েতিরা এখানে পরে আসতে পারে—এই আশায় আমরা দুদিন ধরে সেই পাহাড়ের ফাটলেই তখন আছি। ফাটলের মুখে তেমনই বরফের চাঁই আটকানো। তার দুটি ফুটোয় চোখ রেখে সারারাত আমরা পালা করে পাহারা দিই।
তিন দিনের দিন ভোরে সত্যিই আমাদের আশা পূর্ণ হল। ভোর হবার আগেই যে ইয়েতিকে সেখানে দেখা গেল, ইয়েতিদের মধ্যেও তাকে দানব বলা চলে। লম্বায়। সাড়ে পাঁচ ফুটের সামান্য কিছু ওপরে হলেও তার লোমশ চওড়া দেহ যেন হিমালয়ের একটা প্রকাণ্ড পাথর। তার পরনেও চিতাবাঘের ছাল, কিন্তু ঈগলের পালক কোথাও নেই।
ফাটলের মুখে বরফের চাঁই এমন ভাবে এবার আমরা সাজিয়েছিলাম যে, এক ধাক্কায় তা সরিয়ে ফেলা যায়।
তানাকাকে নিঃশব্দে নজর রাখতে ইঙ্গিত করে আমি আমার ঝুলি থেকে একটা লম্বা দড়ি বার করলাম।
সাবধান করা সত্ত্বেও তানাকা ফিসফিস করে বললে, ও-দড়ি কেন! পিস্তল কোথায়।
পিস্তল দিয়ে জ্যান্ত প্রাণী ধরা যায় না।
তুমি জ্যান্ত ইয়েতি ধরতে চাও! প্রথমটা অবাক হলেও তানাকা তারপর ঠাট্টা করে বললে, ইয়েতি তো আর তোমার ও-দড়িতে আপনি বাঁধা পড়বে না!
