অম্লান বদনে বললাম, তা করেছি, তবে চালুনি হয়ে ছুঁচের ছিদ্র ধরা তোমার কি উচিত? সিনকিয়াং-এর সেই মঠের কথা মনে পড়ে? এ-বিদ্যে তোমার কাছেই তখন শিখি।
সিনকিয়াং-এর এক প্রাচীন গোস্ফা বা বৌদ্ধ মঠের পুরনো পুঁথি সরানোর ব্যাপারে ড. তানাকাকে আমায় সাহায্য করতে হয়েছিল।
সেকথা এখন গায়ে না মেখে তানাকা রাগের সঙ্গে বললেন, কিন্তু আমার কুলিদের তুমি তাড়িয়েছ কেন?
এখানকার ঠাণ্ডায় তোমার বুদ্ধিটা একটু জমে গেছে মনে হচ্ছে! হেসে বললাম, নইলে ইয়েতি নামটা যখনই উচ্চারণ করেছিলাম তখনই ব্যাপারটা বুঝতে!
এক মুহূর্তে শেরপাদের পালাবার কারণটা তানাকার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। উদ্বিগ্ন ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, ওরাও কি ইয়েতির পায়ের চিহ্ন তাহলে দেখেছে?
হ্যাঁ, বন্ধু হ্যাঁ। ইংরেজি ভাষায় ভুল ব্যাখ্যা করে যার নাম দেওয়া হয়েছে, জঘন্য তুষার-মানব! তোমার ফিরতে দেরি দেখে খুঁজতে গিয়ে সেই ইয়েতির পদচিহ্নই তাদের চোখে পড়ে। তারপর তল্পিতল্পা গুটিয়ে তারা হাওয়া।
তানাকা হতাশ ভাবে এবার বললেন, কিন্তু এখন আমার সমস্ত প্ল্যানই যে মাটি হয়ে যাবে।
কিছু হবে না, বন্ধু। বরং তোমার উদ্দেশ্যসিদ্ধির সুবিধেই হয়ে গেল!
তানাকা সন্দিগ্ধ ভাবে আমার দিকে চেয়ে বললেন, আমার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তুমি কী জানো?
জানি বই কি বন্ধু, নইলে শেরপা কুলি সেজে নামচে থেকে তোমার সঙ্গ নিই?
তুমি শেরপা কুলি সেজে আমার সঙ্গে এসেছ?
এবারে তাকে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলাম। যেখান থেকে শেরপা কুলি সে সংগ্রহ করে, সেই নামচে গাঁয়ে কী করে তার আগেই আমি উপস্থিত হয়ে শেরপা মোড়লকে আগে ঘুষ দিয়ে হাত করে রাখি। তারপর শেরপা কুলি সেজে তার সঙ্গে থিয়াং বোচিতে এসে কী করে আবার ভোল বদলে জাল চিঠি দেখিয়ে মোহান্তদের পুঁথিঘরে ঢোকবার সুবিধে করে নিই। তারপর সকলে যখন জাল মোহান্ত কোন দিকে গেছে ভেবে আকুল, তখন কেমন করে আবার শেরপা কুলি সেজে তানাকার সঙ্গেই সকলের চোখের ওপর দিয়ে চলে আসি। শেরপা কুলিদের সাহায্য না পেলে অবশ্য এসব সম্ভব হত না। এখান থেকে পালাবার সময় তাই তাদের মোটা বকশিশও দিয়েছি। ইয়েতিদের ভয়ে ততটা নয়, আমার কথাতেই তারা যে তল্পিতল্পা নিয়ে চলে গেছে, এ-কথাটাও তানাকাকে জানিয়ে দিলাম।
এ সব শুনে তানাকা একেবারে খাপ্পা। রেগে উঠে বললে, কী সর্বনাশ যে তুমি করেছ তা জানো না! আমার উদ্দেশ্য তুমি যদি সত্যি জানতে তাহলে শেরপা কুলিদের অন্তত তাড়াতে না।
তোমার উদ্দেশ্য জানি বলেই শেরপাদের তাড়িয়েছি।
তানাকা এ কথায় আরও রেগে উঠল তোমার হেঁয়ালি রসিকতা আমার এখন ভাল লাগছে না।
হেঁয়ালি নয় বন্ধু, সহজ কথা! শোনো, তুমি যে তিব্বতে যাবার নতুন রাস্তা খুঁজতে এদিকে আসোনি সে আমি আগেই বুঝেছিলাম, তোমার আসল উদ্দেশ্য হিমালয়ের যে-চূড়া কেউ জয় করতে পারেনি তারই আটঘাট জেনে যাওয়া। পরে যাতে দলবল নিয়ে এ-চূড়া জয়ের চেষ্টা করতে পারো। পাছে সেকথা বললে ব্রিটিশ সরকার তোমায় নেপালের ভেতর দিয়ে যাবার অনুমতি না দেয়, তাই তুমি ওই মিথ্যে অজুহাত দিয়েছ!
আমার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে তানাকা বললে, আশ্চর্য! আমার এ মনের কথা আমি জাপানেও কাউকে বলিনি! কিন্তু তুমি শেরপা কুলি সেজে আমার সঙ্গ নিয়েছ কেন?
হেসে বললাম, এখনও এ দেশে ব্রিটিশদেরই রাজত্ব ধলে। স্বাধীন দেশের লোক বলে তোমায় যেটুকু অনুমতি দিয়েছে, কালা ভারতবাসী হিসেবে আমায় তা-ও দিত তাই তোমার পাসপোর্ট দিয়েই আমি কাজ চালিয়ে নেবার ব্যবস্থা করেছি। তবে আমার উদ্দেশ্য শুধু এভারেস্টের সুলুকসন্ধান জানা নয়, বিজ্ঞানের জগতের যা সবচেয়ে বড় হেঁয়ালি, সেই ইয়েতিদের সঠিক পরিচয় নেওয়াও বটে। এখনও পর্যন্ত পায়ের দাগ ছাড়া কোনও সভ্য মানুষ তাদের চোখেও দেখেনি।
তানাকার রাগ এতক্ষণে ঠাণ্ডা হয়েছে, তবু সে হতাশভাবে বললে, কিন্তু শেরপা কুলিদের তাড়িয়ে আমাদের কী লাভটা হল?
লাভ হল এই যে, আমরা কী করছি না করছি তার সাক্ষী কেউ রইল না। শেরপারা সঙ্গে থাকলে পরে তোমার আসল উদ্দেশ্য জানাজানি হয়ে যেতই। আমার দিক দিয়ে শেরপাদের তাড়ানো দরকার ছিল এই জন্যে যে, দলবল নিয়ে ইয়েতিদের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। তারা যেমন চালাক তেমনই সতর্ক। দলবল দেখলেই তারা
সে-তল্লাট ছেড়ে পালায়। একা-একা তাদের খোঁজ পাওয়ার বরং আশা আছে।
তানাকাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠাণ্ডা করলাম, কিন্তু তারপর এক হপ্তা পর্যন্ত চারিদিকে খোঁজ করেও ইয়েতিদের কোনও চিহ্ন না পেয়ে নিজেই ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম। আমাদের খাবার রসদ ক্রমশই ফুরিয়ে আসছে। আর কদিন এভাবে গেলে ফেরবার উপায়ও থাকবে না।
সেদিন রাত্রে খুম্বু হিমবাহ দিয়ে উঠে আমরা পাহাড়ের ধারের একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছি। গুহা না বলে পাহাড়ের একটা সংকীর্ণ ফাটলই তাকে বলা উচিত। এমনিতে সে ফাটলে রাত কাটালে শীতে জমে যাবার কথা। আমরা কিন্তু এসকিমোদের মতো বরফ দিয়েই শীত নিবারণের ব্যবস্থা করেছি। বরফের চাঁই দিয়ে এমনভাবে ফাটলের বেরুবার দিকটা ঢেকে দিয়েছি যে, হাওয়া বেরুবার সামান্য একটু ফুটো ছাড়া আর কিছু সেখানে নেই।
যাই করি না কেন, সেই রক্ত-জমানো শীতে আরামে ঘুমোনো অসম্ভব। সামান্য যেটুকু তন্দ্রা এসেছিল শেষরাত্রে হঠাৎ কীসের শব্দে তা ভেঙে গেল। তানাকাও তখন জেগে উঠেছে। দুজনে কান পেতে শুনলাম—যেসব বরফের চাঁই দিয়ে আমাদের ফাটল আমরা বন্ধ করেছিলাম, সেগুলো কে যেন সরাবার চেষ্টা করছে। ফাটলের ওপর দিকে হাওয়া যাবার যে ফুটো রেখেছিলাম তার ভেতর দিয়ে সামান্য ভোরের আলো গুহার ভেতর তখন এসে পড়েছে। ঘুমোবার থলে থেকে দুজনেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরের শব্দটা সেই সময়েই থেমে গেল। মিনিটখানেক কোনও শব্দ আর না পেয়ে ফাটলের একটা পাথরের খাঁজে পা দিয়ে উঠে হাওয়ার ফুটোয় চোখ লাগিয়ে যা দেখলাম, অনেক বড় বৈজ্ঞানিক তা দেখবার জন্য নিজের ডান হাতটা কেটে দিতে পারত। আমাদের সামনে তুষার-প্রান্তরে তিন-তিনটি ইয়েতি হামাগুড়ি দিয়ে বরফের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে ও মাঝে মাঝে যেন পাগলের মতো দুহাতে সেই বরফ খুঁড়ছে।
