তানাকা ফারিচে গাঁয়ে যখন এসে পৌঁছোলেন তখন সেখানে জনমানব নেই। শীত এবার একটু তাড়াতাড়ি পড়েছে। রাখালরা তাই তাদের চমরী গোরু বলদ নিয়ে আগেই নেমে গেছে।
ফারিচে গাঁয়ে এসে মনে হল পুঁথিচোর জাল মোহান্তকে ধরা বোধ হয় খুব শক্ত হবে না। এখান থেকে উত্তরে ছাড়া আর কোনওদিকে তার যাওয়া অসম্ভব। অথচ উত্তরে যাওয়া মারাত্মক পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। সেখান থেকে তিব্বতের দিকে যাওয়ার কোনও পাস বা গিরিপথ যদি থাকেও, তা অত্যন্ত দুর্গম হতে বাধ্য। তা ছাড়া এদেশের সবচেয়ে সাহসী ও ঝানু শেরপা জোয়ানদের পক্ষেও একলা সে-পথ খুঁজে বার করা সম্ভব নয়।
ফারিচে গ্রাম ছাড়িয়ে পরের দিন তানাকা লবুজ্যা খোলায় গিয়ে পড়লেন। এই উপত্যকা দিয়েই খুম্বু গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ নেমে এসেছে। লবুজ্যা খোলা উপত্যকার একটু ওপরে উঠতেই পুমোরি, লোলা, লিঙট্রেন প্রভৃতি মাঝারি চূড়ার সঙ্গে মাউন্ট এভারেস্টের পশ্চিম ঢাল দেখা গেল। ওদিকে নুপৎসে-লোৎসে আর এদিকে এই সব চূড়া যেন পারিষদবর্গের মতো মহামহিম সম্রাট এভারেস্টকে ঘিরে আছে। পারিষদেরাও কেউকেটা নয়। বিশ থেকে আটাশ হাজার ফুট তাদের উচ্চতা।
সবুজ্যা খোলায় এসেও জাল মোহান্তের খোঁজ না পেয়ে তানাকা একটু অবাক হলেন। তাঁর সমস্ত অনুমানই কি তাহলে ভুল? সন্ধের দিকে সেদিন দারুণ তুষারঝড় উঠল। চারজন শেরপা কুলি একটি তাঁবুতে আর একটিতে তানাকা একলা। সমস্ত রাত প্রায় জেগেই কাটালেন। ঝড়ে তাঁবু উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ভয় যথেষ্ট, কিন্তু তখন তাঁর মনে আর এক ভাবনা তার চেয়ে বেশি প্রবল।
মাঝরাত্রে তুষারঝড় থেমে গেল। সামান্য ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে ভোর হতে না হতেই সাজগোজ করে বন্দুক আর দূরবিন হাতে তানাকা বেরিয়ে পড়লেন।
শেরপা কুলিরা তখনও বোধ হয় অঘোরে ঘুমোচ্ছ। তাদের তাঁবুর চারিধারে নরম তুষারের ওপর একটা তুষার-চিতার পায়ের দাগ তাঁর চোখে পড়ল। তুষার-চিতাটা অচেনা জিনিস দেখে একটু শোঁকাকি করে নীচের দিকে নেমে গেছে।
শেরপাদের তাঁবু থেকে আধ মাইলটাক এগিয়ে যাবার পর তিনি তুষারের ওপর আবার এক ধরনের পায়ের দাগ দেখে কিন্তু একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। উপত্যকার একদিকের পাহাড়ের ধার থেকে বেরিয়ে সে পদচিহ্ন তুষার-নদী পেরিয়ে আর একদিকে চলে গেছে।
কোনও চতুষ্পদ প্রাণীর পায়ের দাগ তা কিন্তু নয়, মানুষের মতোই দু-পায়ে হাঁটা কোনও জীবের। কিন্তু পায়ের অতবড় প্রকাণ্ড মাপ কোনও মানুষের হওয়া তো অসম্ভব! তা ছাড়া এই আকাশ-ছোঁয়া চিরতুষারের দেশে, খালি পায়ে হাঁটবার মতো মানুষ কে থাকতে পারে!
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় তানাকা উত্তেজনার আনন্দে অধীর হয়ে উঠলেন। সব কিছু ভুলে সেই পায়ের দাগ অনুসরণ করলেন এবার। তুষার-নদীর ওপর দিকে হাঁটা খুব সহজ ও নিরাপদ নয়। কোথাও কোমর পর্যন্ত নরম তুষারে ড়ুবে যায়, কোথাও বিরাট তুষারের খাদ হাঁ করে আছে, অতি সাবধানে তার ধার দিয়ে পার হতে হয়। পায়ের দাগ অনুসরণ করতে গিয়ে কিন্তু বুঝলেন, যাকে অনুসরণ করছেন, এ তুষার-রাজ্যের কায়দাকানুন তাঁর চেয়েও তার অনেক বেশি জানা। অনায়াসে দুর্গম বিপজ্জনক সমস্ত জায়গা কখনও লাফ দিয়ে, কখনও পাশ কাটিয়ে সে পার হয়ে গেছে।
কিছুদূর গিয়ে সে-পদচিহ্ন আর কিন্তু অনুসরণ করতে পারা গেল না। তুষার নদীতে এক জায়গায় প্রায় মাইলখানেক লম্বা ও প্রায় ত্রিশ ফুট চওড়া একটি গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। সে-খাদের ওপারের পদচিহ্ন বেশ স্পষ্ট দেখতে পেলেও তাঁর পক্ষে শীতের পোশাক পরে তা লাফ দিয়ে পার হওয়া অসম্ভব। মাইলখানেক ঘুরে আবার তা অনুসরণ করারও তখন সময় নেই।
এমনিতেই আগ্রহে উত্তেজনায় অনেক দূর এসে পড়েছিলেন। তাঁবুতে যখন ফিরে গেলেন, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। পায়ের নীচে ঠাণ্ডা বরফ আর আকাশে জ্বলন্ত সূর্যের এমন তেজ যে, মুখ যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে। সেই অবস্থায় তাঁবুতে এসে তানাকা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। শেরপা কুলিরা সব গেল কোথায়? এতক্ষণে তো তাদের খাওয়া-দাওয়া সেরে তাঁবু তোলবার জন্যে প্রস্তুত হওয়ার কথা।
বাইরে থেকে শেরপাদের সর্দার দাওয়া আণুপকে ডাক দিলেন। কোনও সাড়া না পেয়ে এবার তাদের তাঁবুর ভেতরেই গিয়ে ঢুকলেন। চারজনের মধ্যে একটিমাত্র শেরপা কুলি সেখানে বসে তার জিনিসপত্র বাঁধছে। আর কোনও শেরপা কুলির চুলের টিকি দূরে থাক, জিনিসপত্র পর্যন্ত সেখানে নেই।
যে জিনিসপত্র বাঁধছিল, বাইরের আলো থেকে তাঁবুর ভেতরে এসে তানাকা প্রথমটা তাকে চিনতে পারলেন না। তবু অত্যন্ত কড়া গলায় অন্য শেরপারা কোথায় গেছে জিজ্ঞাসা করলেন।
মুখ না তুলেই লোকটা বললে, তারা পালিয়েছে।
পালিয়েছে! হঠাৎ এরকম পালাবার মানে?
জানি না!
তার উত্তরে নয়, তার কথা বলবার ধরনে হঠাৎ চমকে উঠে সজোরে দুহাতে তার গলাটা ধরে তানাকা তাকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে এলেন।
আরে, ছাড়ো, ছাড়ো, বন্ধু! গায়ের জোরটা ইয়েতিদের জন্যই মজুদ রাখো। শেরপা কুলির মুখে বিশুদ্ধ জাপানি ভাষা শুনে তানাকা একেবারে হতভম্ব।
অবাক হয়ে, তার গলা ছেড়ে দিয়ে বললেন, একি! মি. দাস।
গলায় হাত বুলোত বুলোতে এবার হেসে বললাম, যেরকম হাতের জোর দেখিয়েছ, আর একটু হলেই দাস হয়ে যেতাম।
রসিকতার মতো মনের অবস্থা তানাকার তখন নয়। বললেন, তুমিই তাহলে জাল মোহান্ত সেজে পুঁথি চুরি করেছ–!
