আইনস্টাইনকে যেন গুণ-ভাগ জানেন কি না জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, ঘনাদা এমনই একটু অনুকম্পার হাসি হাসলেন।
শিবু হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ তুলে বললে, কিন্তু নাম যাই দিক, মাউন্ট এভারেস্ট চড়া আর মানুষের সাধ্যে কুলেল না। সুইসরাও তো হার মেনে ফিরে এল।
হ্যাঁ! ঘনাদা অবজ্ঞাভরে বললেন, রুন-এর শেকড় তো আর চেনে না। রুন-এর শেকড় মানে? আমাদের চোখ কপালে উঠেছে তখন।
রুন-এর শেকড় চিনলে কী হত? অবাক হয়ে আমরা আবার জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না।
কী আর হত! টুপিটা তাহলে ফিরিয়ে আনতে পারত! ঘনাদা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথাটা বলে ওঠবার উপক্রম করলেন।
রুন-এর শেকড় আর টুপিতে মিলে আমাদের মাথা তখন ঝিমঝিম করছে, তবু একরকম জোর করেই চারজনে তাঁকে ধরে বসিয়ে দিলাম।
ঘনাদা যেন নেহাত নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছার সঙ্গে শুরু করলেন, ড. তানাকার নাম তোমরা বোধহয় শোনোনি? অত বড় পণ্ডিত-পর্যটক সোয়েন হেডিন-এর পর কমই দেখা গেছে। ইউরোপ-আমেরিকার লোক হলে তাঁর নাম অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ত। এশিয়ার লোক বলেই তাঁর নাম অনেকে এখনও জানে । অনেক কাল আগে সেই ব্রিটিশ আমলে তিব্বতে যাবার নতুন একটা পথ, যাকে বলে গিরিবর্ত্ম, খুঁজে বার করবার জন্যে বেরিয়ে থিয়াং বোচি মঠে সেবার তিনি ক দিনের জন্যে বিশ্রাম করছিলেন। নেপালের উত্তরে নামচে। সেখান থেকে থিয়াং বোচি আসতে হলে প্রথমে দুধকোশি নদীর ওপরকার খাড়া পাহাড়ের গায়ে দু হাজার ফুট উঁচু দুর্গম পথ পার হতে হয়। সে-পথ কিছুদূর গিয়ে আবার দুধকোশিতে নেমে সেখানে কাঠের একটা নড়বড়ে পোল পার হলে— সামনের একটি দুহাজার ফুট উঁচু চূড়ার মাথায় থিয়াং বোচি মঠ দেখা যায়।
ভারতবর্ষের দিকে এর চেয়ে উঁচু বৌদ্ধ মঠ আর নেই। তিব্বতে যাওয়া-আসার সে । মঠের বৌদ্ধ মোহান্তদের সঙ্গে তানাকার বেশ আলাপ হয়ে গেছল। এবারে অভ্যর্থনাটা তাই ভালই হল। মোহান্তদের অনুরোধে দুদিনের জায়গায় প্রায় পাঁচ দিন কাটিয়ে দেবার পর হঠাৎ একদিন সকালবেলা একজন ছোট মোহান্তকে দেখে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। এ লোকটির সঙ্গে এ ক-দিন তাঁর বিশেষ দেখাশোনাই হয়নি৷ শুনলেন—তিব্বতের পাঞ্চেন লামার চিঠি নিয়ে তিনি থিয়াং বোচি মঠের প্রাচীন তিব্বতি ধর্মগ্রন্থগুলির তালিকা করতে এসেছেন। লোকটির যা পরিচয় পাওয়া গেল, তাতে তাঁর সঙ্গে তানাকার কোনওদিন দেখাশোনা হওয়া অসম্ভব। তবু মনের খটক তাঁর গেল না। কেন জানি না তাঁর মনে হল তাঁর অত্যন্ত চেনা কোনও একজনের সঙ্গে এই মোহান্তর তাত্যন্ত মিল আছে। সঠিক পরিচয়টা তবু কিছুতেই মনে আনতে পারলেন না।
তানাকার সন্দেহ যে অমূলক নয়, তার পরের দিন সকালেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। খোদ মোহান্ত ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই তাঁর ঘরে এসে হাজির। তাঁদের মঠের নাকি সর্বনাশ হয়ে গেছে। পাঞ্চেন লামার চিঠি নিয়ে যে লোকটি এসেছিল, সে নাকি জাল। গত রাত্রে থিয়াং বোচি মঠের অত্যন্ত মূল্যবান ক-টি পুরনো তিব্বতি পুঁথি নিয়ে সে নাকি সরে পড়েছে।
খোদ মোহার কথা শুনে তানাকা বুঝলেন, তিনি ঠিক না চিনলেও জাল মোহান্ত তাঁকে ঠিক চিনেছিল এবং সেই জন্যই ধরা পড়বার ভয়ে সে নিজে থেকেই আগে পালিয়েছে।
কিন্তু পালিয়ে সে যাবে কোথায়? এখান থেকে নেপালের দিকে যাবার একটিমাত্র সংকীর্ণ পথ। সে পথে এখনকার যে-কোনও শেরপা জোয়ান একদিনে তাকে ধরে ফেলবে। আর—উত্তরে নুপসে ও লোৎসে এই দুই চূড়ার মাঝখানে বিরাট পঁচিশ হাজার ফুট পাহাড়ের দেওয়াল সেখানে যেন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে যাওয়া মানে আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু নয়।
খোদ মোহান্তকে সেই আশ্বাসই দিয়ে তানাকা বললেন যে, দক্ষিণে নামচে যাবার দিকে দুজন শেরপা জোয়ান তিনি যেন পাঠিয়ে দেন। উত্তর দিকে তিনি নিজেই যাচ্ছেন নতুন পথের সন্ধানে। সেদিকে যাওয়ার দুর্বুদ্ধি যদি তার হয়ে থাকে, জীবন্ত বা মত, যে-কোনও অবস্থায় তার কাছ থেকে সমস্ত পুঁথি তিনি উদ্ধার করবেনই।
খোদ মোহান্ত তানাকার কথায় কিছু আশ্বস্ত হলেন। ধর্মচক্র ঘুরিয়ে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে সেই দিনই দুপুরের আগে চারজন শেরপা কুলি নিয়ে তানাকা বেরিয়ে পড়লেন।
থিয়াং বোচি থেকে উত্তরে যাবার একটিমাত্র পথ দেবদারু, সরল ও ভুর্জ গাছের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে প্রথমে ইমজাখোলা নদীর ধারে নেমে গিয়েছে। ইমজাখোলা যেখানে ভুর্জ আর জুনিপার গাছের ঝোপের ওপর দিয়ে পাগলাঝোরা হয়ে নীচে অতল গহ্বরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তার একটু আগে দড়ির পোল দিয়ে তানাকা এই দুরন্ত নদী পার হলেন। সেখান থেকে পাং বোচি পর্যন্ত ওঠবার পরই বড় গাছপালা শেষ হয়ে শুধু মোটা পাহাড়ি ঘাসের প্রান্তর শুরু। সে প্রান্তরেও মানুষের সীমানাফারিচে গাঁয়ে এসে শেষ। তারপর চিরতুষারের দেশ, লোৎসে ও নুপৎসের মতো বিরাট সব গিরিচূড়া মাউন্ট এভারেস্টকে ঘিরে সেখানে অলঙ্ঘ্য নিষেধের প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে মানুষের পদচিহ্ন কালেভদ্রে যদি বা কখনও পড়ে, তাও বেশিদূর পর্যন্ত পৌঁছোয় না।
যে-ফারিচে গাঁয়ের কথা আগে বলেছি, তাকে গাঁ ঠিক বলা উচিত নয়। ও অঞ্চলের চমরী গাই যারা চরায়, সেই রাখালদের এটা একটা অস্থায়ী আস্তানা। শরৎকালে চমরী গাই চরিয়ে শীতের আগেই তারা এখান থেকে নেমে যায়। তারপর পাথরকাঠ দিয়ে তৈরি ক-টা পরিত্যক্ত কুঁড়ে শুধু পড়ে থাকে।
