অন্যদিন হলে শিশির তৎক্ষণাৎ সায় দিয়ে হ্যাঙ্গাম চুকিয়ে দিত। কিন্তু সেদিন সেও কেমন বেয়াড়া জেদ ধরে বসেছিল, না, ঘনাদা, ও তিন হাজার দুশো তেইশ-ই হবে।
না, তিন হাজার দুশো উনিশ! ঘনাদা প্রবল প্রতিবাদ করে জানিয়েছিলেন।
শিশির তবু নাছোড়বান্দা। মাথা নেড়ে বলেছিল, না, আপনি যা ই বলুন, ও দুশো। তেইশ। আমার গুনতে ভুল হয় না।
গুনতে ভুল তাহলে আমারই হয়েছে বলতে চাও। ঘনাদা গরম হয়ে উঠেছিলেন। বেশ গুনতেই যখন জানি না, তখন তোমার সিগারেট আমার না খাওয়াই ভাল।
ঘনাদা হঠাৎ আরামকেদারা থেকে উঠে ঘর থেকেই বেরিয়ে গেছলেন। অবশ্য সিগারেটটি হাতে নিয়েই।
সেই থেকে তিনি যে আমাদের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ করেছেন, তাঁর অভিমান তারপর আর ভাঙানোই যায়নি।
এদিকে আমাদের দিন কাটানো দায় হয়ে উঠেছে। এবারের বর্ষা একটু বিলম্বে দেখা দিয়ে শেষের দিকে একেবারে সুদসুদ্ধ পুষিয়ে নিচ্ছে। ফুটবলের রথী-মহারথীরা সব হেলসিঙ্কিতে, কী রাজ্য জয় করতে গেছেন, তাঁরাই জানেন। ওদিকে খেলার মাঠে যেতে মন চায় না, এদিকে আমাদের বর্ষার সন্ধ্যাগুলো মাঠেই মারা যাচ্ছে।
ঘনাদাকে অনেকরকম ঘুষ দিয়ে দলে ভেড়াবার চেষ্টা এ দুদিন করা হয়েছে। প্রথম দিন পাড়ার বিখ্যাত তেলেভাজার দোকান থেকে ফুলুরি বেগুনি ভাজিয়ে এনে ওপরের বসবার ঘরে একেবারে থালাসুদ্ধ সাজিয়ে নিয়ে বসেছিলাম, ঘনাদা যদি গন্ধে এসে বসেন।
ঘনাদা তাঁর ওপরের ঘর থেকে নেমে এলেন ঠিকই, কিন্তু তারপর মাত্র দু সেকেন্ড আমাদের আড্ডা-ঘরের দরজায় দ্বিধাভরে দাঁড়িয়ে আবার নীচে চলে গেলেন।
দ্বিতীয় দিন ঘনাদার জন্য আস্ত একটা সিগারেটের টিন শিশির টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছে। সেই সঙ্গে মোড়ের রেস্তোরাঁ থেকে চিংড়িমাছের কাটলেট।
এদিন চৌকাঠ থেকে চলে না গিয়ে ঘনাদা ঘরের ভেতরে এসে বসেছেন, কিন্তু। আমরা যে ঘরে আছি, তা যেন তিনি দেখতেই পাননি।
শিশির অন্যমনস্কভাবে সিগারেটের টিনটা তাঁর দিকে বাড়িয়ে ধরতেই কিন্তু সব মাটি হয়ে গেছে। সিগারেটের বদলে শিশিরকেই যেন জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টিতে ভস্ম করে ঘনাদা উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন।
আজ তিনদিনের দিন আমরা একেবারে তাই নতুন পচি ধরেছি।
আজ টেবিলের ওপর ফুলুরি, বেগুনি বা কাটলেট নয়, গরম হিঙের কচুরি একথালা সাজানো আছে, সেই সঙ্গে সিগারেটের টিনও বটে। কিন্তু ওগুলো আসল টোপ নয়, চার মাত্র।
আসল টোপ হল আমাদের এই কিচির-মিচির, এবং সেই টোপেই ঘনাদাকে গাঁথা গেল শেষ পর্যন্ত।
গৌর, শিশির ও আমার চালিয়াতি পর্যন্ত ঘনাদা কোনওরকমে সহ্য করেছিলেন, মা শিবুর শেরিং চেড়ংগা পোতাং শুনে একেবারে চিড়বিড়িয়ে উঠে আর থাকতে পারলেন না।
চো—মোহিয়ান মি! ঘনাদা খ্যাপা ঘোড়ার মতো ঘর কাঁপিয়ে যেন চিহি চিহি ডাক ছাড়লেন।
ঠিকমতো টোপ দিয়ে ঘনাদাকে গাঁথতে পেরে আমরা যেমন খুশি তেমনই বেশ একটু হতভম্বও হলাম।
ঘনাদার মান ভাঙানোর সঙ্গে সত্যি কথা বলতে গেলে তাঁকে একটু জব্দ করার ইচ্ছেও আমাদের ছিল। যত বড় সবজান্তা হবার ভানই করুন, আমাদের ও কিচির-মিচিরের মর্ম বোঝা ঘনাদার পক্ষেও সম্ভব নয় বলে আমরা মনে করেছিলাম।
সত্যি কথা বলতে কি গত দুদিন ধরে শিবু আর গৌর একরাশি পুঁথি-পত্র বই কাগজ ঘেঁটে ওই সব উদ্ভট আজগুবি আওয়াজ জড়ো করেছে।
এত করেও ঘনাদার ওপর টেক্কা দেওয়া কিন্তু গেল না।
চো—মোহিয়ান মি! বলে, চিহি ডাক ছেড়ে, ঘনাদা তিনদিন বাদে তাঁর নিজস্ব আরামকেদারায় এসে বসে মুখ বেঁকিয়ে বললেন, চালবাজি তো করছ, জানো মানে এসব কথার?
আমরা যতখানি সম্ভব বেকুবের মতো তাঁর দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি ততক্ষণে থালার হিঙের কচুরির দিকে মনোনিবেশ করেছেন। পুরো থালাটাই প্রায় সাবাড় করে সিগারেটের টিনটার দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি হঠাৎ থেমে ভুরু কুঁচকে শিশিরের দিকে তাকালেন।
আমারই ভুল হয়েছিল ঘনাদা, শিশির তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তিন হাজার দুশো উনিশই হবে।
না, তিন হাজার দুশো কুড়ি। বলে শিশিরের ভুল শুধরে ঘনাদা সিগারেট ধরালেন। তারপর আগেকার প্রশ্ন আবার তুলে বললেন, বলো দেখি, কথাগুলোর মানে কী?
এবার চুপ করে থাকলে আর চলে না। গৌর তাই আমতা আমতা করে বললে, ও সব হল মাউন্ট এভারেস্টের নাম।
হ্যাঁ, নাম তো বটে, কিন্তু ও সব নামের মানে কী, আর কোন নামটা ঠিক? ঘনাদা অবজ্ঞাভরে আমাদের দিকে চাইলেন। আমাদের মুখে আর কথা নেই দেখে ঘনাদাই আবার করুণার দৃষ্টিতে আমাদের ওপর চোখ বুলিয়ে শুরু করলেন, কথাগুলো যা আওড়াচ্ছিলে, সবই হল মাউন্ট এভারেস্টের তিব্বতি নাম। চো। মো লঙ মা মানে হল লঙ মা দেবী। লঙ মা বলে কোনও শব্দের অর্থ কিন্তু হয় না। লঙ বলতে অবশ্য দেশ বোঝায়! জা মো লাং মা মানে হল একসঙ্গে পক্ষিণী-দেবী আর গো-দেবী। কাং তন তিং মানে হল ঊধ্ব-লোকের নীল তুষার। নামটায় কবিত্র আছে, কিন্তু এটা বা শেরিং চেড়ংগা পোতাং অর্থাৎ অমর পঞ্চ দেবীর প্রাসাদও আসল। নাম নয়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ চুড়ার আসল তিব্বতি নাম হল, চো মো হিয়ান মি অর্থাৎ বিশ্বজননীর পূত সলিল। চিনারা তিব্বতের রাজধানী লাসা অধিকার করার পর এই তিব্বতি নামটিই চালু করেছে। ভুল করে অনেকে এটা অবশ্য চু মুলান মি বলে বানান করে।
বলা বাহুল্য, আমরা এতক্ষণ হাঁ করে ঘনাদার দিকে চেয়ে ছিলাম। গৌরই প্রথম যেন সামলে উঠে জিজ্ঞাসা করলে, আপনি তিব্বতি ভাষা জানেন নাকি?
