অন্য সময় হলে এ গল্প হয়তো যথেষ্ট উপভোগ করতাম, কিন্তু দারুণ গরমে যখন প্রাণ যাবার উপক্রম তখন অন্য কিছুতে কি মন যায়!
দুদিন দুরাত সেই আগ্নেয়গিরির খোল থেকে বেরুবার প্রাণপণ চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোনও ফল হল না। চারধারে পাথরের দেওয়াল কতকটা ঢালু হলেও এমন উলটোভাবে খাঁজ কাটা যে তা বেয়ে গড়িয়ে পড়া সহজ হলেও ওঠা একেবারে অসম্ভব।
ইতিমধ্যে আগ্নেয়গিরির গরম জলের স্রোতের রহস্য আমরা বুঝে ফেলেছি। যে খোলের ভেতর আমরা পড়েছি তার দুদিকে দুটি ছোট ছোট ফোকর আছে। একদিকের ফোকর দিয়ে বাইরের তুষার ভেতরে এসে মাঝখানের একটা কড়াই এর মতো গর্তে জমা হয়ে নীচেকার প্রচণ্ড উত্তাপে ফুটে উঠছে। তারপর সেই ফুটন্ত জল আর একদিকের ঢালু ফোকর দিয়ে স্রোত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। নামমাত্র একেবারে সেদ্ধ হয়ে যাবার ভয় না থাকলে সেই স্রোতের জলের সঙ্গেই বেরুবার চেষ্টা হয়তো আমরা করতাম, কিন্তু তার কোনও উপায় নেই।
এদিকে প্রচণ্ড গরমে মারা যাবার আগেই আমাদের পাগল হবার উপক্রম। আগ্নেয়গিরিটা এখনও একরকম ঘুমন্ত বলা চলে। স্রোতের জলকে ফুটিয়ে তোলা ছাড়া তার কোনও উপদ্রব এখনও দেখা দেয়নি। কিন্তু দেখা দিতে কতক্ষণ!
বাইরের তুষার-প্রান্তরে থাকলেও খুব বেশি দিন আমরা বেঁচে থাকতে পারতাম জানি, কিন্তু এই বদ্ধ গুহায় মরার চেয়ে সে যেন অনেক ভাল।
দুদিন দুরাত ধরে এ গহ্বর থেকে বেরুবার ব্যর্থ চেষ্টায় হয়রান হয়ে সেনকে সেই কথা বলতে গিয়ে রাগের মাথায় ছড়িটা যে-ই গহ্বরের মেঝেতে ঠুকেছি অমনই এক ভয়ংকর আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল।
দমকলের মুখ দিয়ে যেমন তোড়ে জল বেরোয় আমার ছড়ির ডগায় মেঝের সেই জায়গাটা ফুটো হয়ে তেমনই প্রচণ্ড বেগে সাতটা ইঞ্জিনের শিষের মতো আওয়াজ করে ধোঁয়াটে গ্যাসের পিচকিরি আগ্নেয়গিরির মুখ ছাড়িয়ে লাফিয়ে উঠল। গ্যাসের সে ফোয়ারা আর থামে না!
সেই গ্যাসের তোড়েই সে যাত্রা বেঁচে গেলাম, বলে ঘনাদা থামলেন।
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, গ্যাসের তোড়ে বাঁচলেন কী রকম?
একটু অনুকম্পার হাসি হেসে ঘনাদা বললেন, এটা আর বুঝতে পারলে না? কোমরে যে তাঁবুটা বাঁধা ছিল সেটা খুলে ধরে গ্যাসে ভর্তি করে নিলাম। তারপর দুজনে সেই বেলুনের দুদিকে দড়ি দিয়ে নিজেদের বেঁধে হাওয়ায় ভেসে গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম।
সেই বেলুনেই দক্ষিণ মেরু থেকে দেশে পৌঁছোলেন নাকি? গৌর গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলে।
না, ও বেলুনে আর কতদূর যাওয়া যায়!ঘনাদা একটু যেন বিরক্ত হয়ে বললেন, সে বেলুন থেকে গিয়ে পড়লাম এক পাহাড়ের ওপর। সাধারণ পাহাড় সেটা নয়— বিরাট Iceberg অর্থাৎ বরফের পাহাড়। এই সময়ে এই সব বরফের পাহাড় ঝড়ের বেগে ক্রমশ উত্তর দিকে ভেসে যেতে যেতে গলতে থাকে। আমাদের পাহাড়টা যখন গলতে গলতে কোনওরকমে দুজনের দাঁড়াবার মতো ছোট হয়ে এসেছে তখন ভাগ্যক্রমে একটা তিমি-ধরা জাহাজ সেইখান দিয়ে যেতে যেতে আমাদের দেখতে পেয়ে আমাদের তুলে নেয়। আমরা ভাসতে ভাসতে যে ম্যাকওয়ারি দ্বীপ পর্যন্ত এসে পড়েছিলাম তা ভাবতেও পারিনি।
ঘনাদা বলা শেষ করে শিশিরের দিকে ৩২৯৯তম সিগারেট ধার করবার জন্যে হাত বাড়ালেন।
গৌর হঠাৎ বলে উঠল, ছড়িটা আপনি সাউথ জর্জিয়া থেকে কিনেছিলেন বললেন না! আমাদের পাড়ার মিত্র ব্রাদার্সও বোধহয় সেখান থেকে ছড়ি আমদানি করছে আজকাল। ঠিক এইরকম ছড়ি সেখানে ক-টা দেখলাম যেন!
ঘনাদার সিগারেট ধার করা আর হল না। আমাদের, বিশেষ করে গৌরের, দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
টুপি
চু মু লান মি।
উঁহুঃ! চো মো লঙ মা!
না হে, না! আসলে ওটা জা মো লাং মা।
তার চেয়ে বলো নাকাং তন তিং, কিংবা শেরিং চেড়ংগা পোতাং-ও বলতে পারো।
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের মেসের বাসিন্দারা হঠাৎ খেপে গেছে বলে এ থেকে যদি কারুর ধারণা হয়, তাহলে খুব দোষ দেওয়া যায় না।
ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। এ সব অনুস্বার, বিসর্গ মেশানো কিচির-মিচিরের আসল লক্ষ্য হলেন ঘনাদা।
ঘনাদা আজ দুদিন হল আমাদের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ করেছেন। তার যথেষ্ট কারণ অবশ্য বর্তমান)।
দুদিন আগে ঘনাদা যথারীতি মেসের বসবার ঘরের সবচেয়ে লোভনীয় আরামকেদারাটি দখল করে বসে খবরের কাগজে চক্ষু নিবদ্ধ করে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে শিশিরের দিকে ডান হাতটি নিঃশব্দে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিটি তাতে এমন করে ফাঁক করে ধরা যে তা থেকেই তাঁর ইঙ্গিতটুকু পরিস্ফুট।
শিশির সে ইঙ্গিত অমান্য করেনি। অবিলম্বে একটি সিগারেট সেই আঙুলের মধ্যে ভরে দিয়ে সেটি জ্বালাবার পরিশ্রমটুকু থেকেও ঘনাদাকে বাঁচাবার জন্যে দেশলাই-এর কাঠি বাগিয়ে ধরেছিল।
অপরাধের মধ্যে সে শুধু সেইসঙ্গে মুখ টিপে আমাদের দিকে একটু হেসে বলেছিল, তিন হাজার দুশো তেইশটা হল, ঘনাদা!
ঘনাদা শিশিরের হাসিটুকু দেখতে পাননি, কিন্তু তৎক্ষণাৎ যেন বিছুটি গায়ে লেগেছে এমনইভাবে খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে উঠে বসেছিলেন।
কী রকম! প্রথমটা আমরা সবাই একটু হকচকিয়ে গেছলাম। ঘনাদার হঠাৎ হল কী?
গৌরই সকলের আগে ব্যাপারটা বুঝে হাসি চেপে বলেছিল, গোনায় কিছু ভুল। হয়েছে বুঝি?
ভুল হয়েছে মানে? ঠকিয়ে যেন আমরা তাঁর সর্বনাশ করে ফেলছি, ঘনাদন এইভাবে বলেছিলেন, একেবারে চার-চারটে বাড়িয়ে বলা।
