গৌর তখন উত্তেজিত ভাবে বলে চলেছে, রাইফেলের সব গুলি আগেই ফুরিয়ে গেছল। এবার কোনও উপায় না দেখে সেটা লাঠির মতো করে ধরে ফিরে দাঁড়ালাম…
ভয়ে শিবুর গলা দিয়ে যেন স্বর বার হচ্ছে না, এমনই ভাবে বললে, তারপর?
কিন্তু গৌর কিছু বলবার আগেই ঘনাদার গলা-খাঁকারি শোনা গেল।
এবার আর তাঁকে অবজ্ঞা করা যায় না। গৌর তাঁর মৌরসিপাট্টা ইজিচেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, আরে, ঘনাদা যে! কখন এসেছেন টেরই পাইনি!
নির্বিকার মুখে ইজিচেয়ারটায় এসে বসে ঘনাদা বললেন, তা পাবে কী করে? যে রকম মশগুল হয়ে গল্প করছিলে। তা গল্পটা হচ্ছিল কোথাকার?
আজ্ঞে, দক্ষিণ মেরুর। পাছে ঘনাদার দিকে চাইলে নিজেকে সামলাতে না পারে সেই ভয়ে গৌর মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে যতদূর সম্ভব সহজ গলায় বলে গেল, সেবার একটা অভিযানে দক্ষিণ মেরুতে যেতে হয়েছিল কিনা!
হাসি চাপবার জন্য আমরা মুখ নিচু করে রইলাম।
ঘনাদার কিন্তু কোনও প্রকার ভাবান্তর দেখা গেল না। গৌরের পক্ষে দক্ষিণ মেরু যাওয়াটা যেন নিতান্তই বোটানিক্স কি চিড়িয়াখানা যাওয়ার শামিল এইভাবে তিনি বললেন, তা, সাদা ভাল্লুকটাকে করলে কী? বন্দুকের বাড়িতেই সাবাড় করে দিলে নাকি?
গৌরের সেইরকমই কিছু বলবার বাসনা ছিল, কিন্তু ঘনাদার ওপর আর এক কাঠি সরেস হবার এমন সুযোগ কি ছাড়া যায়! একটু হেসে সে বললে, আজ্ঞে না, তার দরকার হল না। বন্দুকের ঘা দেবার আগেই দেখি ভালুক ভায়া চিৎপটাং। বরফের মেঝে একেবারে কাঁচের মতো তেলা কিনা! ।
ঘরময় এমন কয়েকটা শব্দ শোনা গেল যা অন্য কেউ হলে চাপা হাসি বলেই মনে করত।
কিন্তু ঘনাদার সেদিকে গ্রাহ্য নেই। গম্ভীরভাবে বললেন, সাদা ভাল্লুকটার ছাল-চামড়া না হোক নিদেনপক্ষে একটা দাঁত কি নখও যদি আনতে পারতে বিজ্ঞানের রাজ্যে হুলুস্থুল পড়ে যেত।
এবার আমাদেরই হতভম্ব হবার পালা।
কেন বলুন তো? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে গৌর, বৈজ্ঞানিকেরা কি সাদা ভাল্লুক দেখেননি?
অন্তত দক্ষিণ মেরুতে কখনও দেখেননি। পেঙ্গুইন পাখি ছাড়া সেখানে ডাঙায় চরবার মতো কোনও প্রাণীই নেই। ঘনাদা হাই তুলে দুবার তুড়ি দিলেন।
এমনভাবে জব্দ হব ভাবিনি। কথাটা তাড়াতাড়ি ঘুরিয়ে দিয়ে শিবু জিজ্ঞেস করলে, দক্ষিণ মেরুতেও গিয়েছিলেন আপনি?
হ্যাঁ, গেছলাম একবার। যা গরম।
এবার আমাদের চোখ কপালে উঠল। ঘনাদাকে আমরা চিনি, তবু তাঁর মুখে দক্ষিণ মেরুতে গরম শুনে খানিকক্ষণ মুখ দিয়ে কথা বেরুল না।
শুধু বললাম, দক্ষিণ মেরুতে গরম!
হ্যাঁ, গরম বলে গরম! কবে সেখানে গরমে গলে পচে মরতাম। ভাগ্যিস এই ছড়িটা ছিল।ঘনাদা হাতের ছড়িটা যেন আমাদের দিকেই দুবার আস্ফালন করলেন।
আমাদের আর কিছু বলতে হল না। ঘনাদা শিশিরের দিকে ফিরে বললেন, কই। হে, একটা সিগারেট ধার দাও না!
ঘনাদার আবার হিসেবে ভুল হবার জো নেই। শিশিরের কাছে সিগারেট নিয়ে ধরিয়ে বললেন, এই নিয়ে ৩২৯৮টা হল কিন্তু।
তারপর সিগারেটটায় একটা সুখটান দিয়ে শুরু করলেন, সেবার সমুদ্রে যেন তিমির গাঁদি লেগেছিল। দক্ষিণ মেরুর দিকে তিমিধরা জেলেদের নজর কয়েক বছর হল তখন পড়েছে। অবাধ বেপরোয়া তিমি শিকারের দরুন উত্তর অঞ্চলের তিমি প্রায় নিঃশেষ হওয়ার ফলেই দক্ষিণ দিকে ইংরেজ, নরউইজিয়ান, জাপানি আর আর্জেন্টাইন জেলেরা হানা দিতে শুরু করে বটে, কিন্তু দক্ষিণ মেরু অঞ্চলেও এত তিমি এর আগে কখনও দেখা যায়নি। নেহাত আনাড়ি জেলে-জাহাজও সেবার তিমির চর্বিতে বোঝাই হয়ে ঘাঁটিতে ফিরেছে! তুখোড় তিমি-শিকারিদের তো কথাই নেই।
আমার জাহাজ যে তিমির চর্বিতে বোঝই তা বোধহয় বলতে হবে না। নরওয়ের এক জেলে-জাহাজ আধাআধি বখরায় বন্দোবস্ত করে আর সব দল থেকে আলাদা হয়ে ক্যাম্পবেল দ্বীপে তখন আমার ঘাঁটি করেছি। আমার বখরাদারকে আমি সেন বলে ডাকি। তবে সে বাঙালি নয়, নরওয়ের লোক। পুরো নাম ওলাফ সোরেনসেন। আমি তাকে ছোট করে নিয়েছি সেন বলে।
সেন পাকা তিমি-শিকারি। বিশ বছর ধরে উত্তর দক্ষিণের দুই মেরুর হেন জাতের তিমি নেই, সে শিকার করেনি। দূর থেকে শুধু তিমির নিঃশ্বাসের ফোয়ারা দেখে সে নারওয়াল না স্পার্ম, কুঁজো না নীল তিমি, বলে দিতে পারে। আমাদের জাহাজের নাম আমি রেখেছিলাম যমুনা। জাহাজ বললে অবশ্য খানিকটা ভুল বোঝানো হয়। মাত্র চারশো টনের বড় স্টিমার, মোট ১৭৫ ফুট লম্বা। তবে তিমি-ধরা জাহাজের মধ্যে একেবারে সেরা আর সবচেয়ে হালফ্যাশানের। এই পিল্যাজিক জাহাজে তিমি ধরে চর্বি ছাড়াবার জন্য আর ঘাঁটিতে বয়ে নিয়ে যেতে হয় না। জাহাজের খোলের ভেতরেই সব বন্দোবস্ত আছে।
আমাদের জাহাজে মাঝি-মাল্লা নিয়ে তোক সবসুদ্ধ আমরা ১৮ জন। সেন জাহাজের কাকের বাসা অর্থাৎ মাস্তুলের ওপরকার পাহারা-মাচায় দূরবিন ধরে সমুদ্রে তিমির সন্ধান করে। আর আমি হারপুন-ছোঁড়া কামান চালাই। আমাদের জাহাজে সম্পূর্ণ আধুনিক ভেণ্ড ফয়েন (Svend Foyn) হারপুন কামান বসানো। তা থেকে চার ফুট লম্বা সওয়া মন ওজনের হারপুন বিদ্যুৎগতিতে তিমির গায়ে গিয়ে বেঁধে। সে হারপুনের মাথায় আবার ছোট বোমা গাঁথা। একবার ঠিক মতো তাগ করতে পারলেই তিমির গায়ে বেঁধবার তিন সেকেন্ডের মধ্যে সে বোমা ফেটে গিয়ে তিমিকে কাবু করে ফেলবেই।
