কী এখন করা যায়! যতদূর বোঝা যাচ্ছে জংলিরা দল বেঁধে অনেক আগেই রওনা হয়েছে। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই হিংস্র বন্যার মতো তারা এই অধিত্যকায় এসে পৌছবে। এখন পালাবার কথা ভাবা বাতুলতা, অথচ কুলিরা যেভাবে সব লুট করে নিয়ে গেছে তাতে বন্দুক দূরের কথা, যুঝে মরবার মতো একটা লোহার ডাণ্ডাও নেই।
এইবার প্যাপেনদের কী অবস্থা হয়েছে দেখতে গিয়ে আরও অবাক হলাম। কুলিরা তাদেরও সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে সত্যি, কিন্তু বাঁধা পড়ে আছে শুধু একা প্যাপেন। বাঁধন খোলবার পর প্যাপেনের কাছে সব খবর পেলাম। তার সঙ্গী দুজন একেবারে আকাট গোঁয়ার নাৎসি। ঢাকের আওয়াজের মর্ম নিয়ে প্যাপেনের সঙ্গে তাদের ঝগড়া হয়েছে। প্যাপেন তাদের ফিরে যেতে পরামর্শ দিয়েছিল। তাতে তারা তাকে ভীরু কাপুরুষ বলে গাল দিয়ে নিজেরাই বন্দুক টর্চ ও গেগার কাউন্টার নিয়ে সেই রাত্রেই পাহাড়ের দিকে রওনা হয়ে গেছে। জংলিরা আসুক না-আসুক, ইউরেনিয়ামের খনির খোঁজ তারা করবেই।
ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে জংলিদের ঢাকের বাদ্যি আর চিৎকার ক্রমশ আরও কাছে তখন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু জংলিদের হাতে প্রাণ যাওয়ার চেয়ে এই বিপদটাই তখন বড় মনে হল। বিহে অধিত্যকায় ইউরেনিয়াম যে কী পরিমাণ আছে তা আমি নিজেই গত কয়েকদিনে জানতে পেরে অবাক হয়েছি। পিচব্লেন্ডের সে সব মোটা মোটা শিরার সন্ধান পাওয়া জার্মান ছোকরা দুজনের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব নয়। এত কষ্ট এত ফন্দি ফিকিরের পর এই ঐশ্বর্য শেষ পর্যন্ত তা হলে নাৎসিদের হাতেই পড়বে! না, তা কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু জংলিদের হাতে খানিক বাদেই যার প্রাণ যেতে বসেছে তার পক্ষে কী এমন করা সম্ভব!
হঠাৎ প্যাপেনকে একটা চুরুট ধরাতে দেখে মাথার মধ্যে আমার যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এখনও হয়তো এক ঢিলে দু পাখি অনায়াসে মারা যায়। নাৎসি ছোকরারা দক্ষিণ দিকের পাহাড়েই গেছে, জংলিরাও সেই দিক থেকে আসছে। জংলিদের হাতে তারা
পড়ুক বা না পড়ুক, এক উপায়ে দুই শত্রুকেই এখন হার মানানো যেতে পারে।
উত্তেজিত কণ্ঠে বললাম, শিগগির, প্যাপেন, শিগগির, তোমার দেশলাইটা দাও। দেশলাই! দেশলাই কী হবে?
রেগে উঠে বললাম, জংলিদের হাত থেকে বাঁচতে যদি চাও তো শিগগির দেশলাইটা দাও।
দেশলাই দিয়ে তুমি হাজার হাজার জংলি ঠেকাবে! প্যাপেন যেভাবে আমার দিকে তাকাল তাতে বুঝলাম আমার মাথা নিশ্চিত বিপদের মুখে খারাপ হয়েছে বলে তার ধারণা।
এবার ধমকে উঠলাম, দেশলাই তুমি দেবে কি না?
প্যাপেনের কথায় কিন্তু একেবারে বসে পড়লাম। আমার মারমূর্তি দেখে সভয়ে সে বললে, দেশলাই কোথায় পাব। মাত্র ওই একটা কাঠিই ছিল। কুলিরা কি কিছু রেখে গেছে!
সত্যিই এবার হতাশ হলাম। সামান্য একটা দেশলাই-এর কাঠির অভাবে এত বড় সুযোগটা নষ্ট হয়ে যাবে। হঠাৎ নিজের পকেটে কী একটা হাতে ঠেকল। তুলে দেখি, একটা কাঁচের টুকরো। আগের দিন দূরবিন থেকে খুলে গেছল বলে পকেটে রেখে দিয়েছিলাম। কুলিরা দূরবিনটা নিয়ে গেছে, কাঁচটায় আর হাত দেয়নি।
ঘনাদা একটু থেমে সগর্বে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, এই কাঁচের টুকরোর জোরেই জংলিদের হাত থেকে সে যাত্রা বেঁচে ফিরলাম, নাৎসিরাও অ্যাটম বোমা তৈরি করবার মতো ইউরেনিয়াম পেল না।
শিশির ভুরু কুঁচকে বললে, তার মানে?
অনুকম্পার হাসি হেসে ঘনাদা বললেন, এই সোজা ব্যাপারটা আর বুঝতে পারলে না! আগেই তো বলেছি বিহে অধিত্যকায় সারাদিন উত্তর-পশ্চিম থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়া বয়, সমস্ত অধিত্যকাটা তার ওপর শুকনো ঘাসের জঙ্গলে ঢাকা। এই কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো ফোকাস করে সেই ঘাসে আগুন ধরিয়ে দিলাম। দেখতে দেখতে কোটি কোটি নাগনাগিনীর মতো সে আগুন দক্ষিণ দিকে যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে গেল। জংলিরা আমাদের আক্রমণ করবে কি, প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে তখন বাঁচে। আর নাৎসি ছোকরারা সে আগুনে যদি রক্ষাও পেয়ে থাকে তা হলেও ইউরেনিয়াম খোঁজবার ফুরসত আর তাদের মেলেনি।
হঠাৎ শিশিরের হাতটা টেনে নিয়ে হাত-ঘড়িটা দেখে ঘনাদা বললেন, তাই তো শিবু, তোমাদের ক্লাবের অনুষ্ঠানটা তো শেষ হয়ে গেল দেখছি। আজ আর গিয়ে তো লাভ হবে না কিছু।
শিশিরের সিগারেটের টিনটা ভুলে তুলে নিয়ে ঘনাদা উঠে গেলেন। আমরা থ হয়ে বসে রইলাম।
ছড়ি
ফন্দিটা ভালই আঁটা হয়েছিল।
ঘনাদাকে জব্দ করার ফন্দি।
রোজ রোজ তিনি আমাদের মাথায় আষাঢ়ে গল্পের চাঁটা মেরে যাবেন, আর আমরা মুখ বুজে তাই সয়ে থাকব, সেটি আর হচ্ছে না।
এবার তাঁর ওপরেও টেক্কা দেওয়া চাই।
ঘনাদা তখনও এসে পৌঁছোননি।
ইতিমধ্যে চর পাঠিয়ে খবর নেওয়া হয়েছে যে সন্ধেবেলায় লেকের ধারে বেড়ানো সেরে তিনি এইমাত্র মেসের গলির মুখে দেখা দিয়েছেন।
সিড়িতে তাঁর পায়ের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বেশ তন্ময় হয়ে যে যার জায়গায় বসে পড়লাম।
ঘনাদা যখন ঘরে ঢুকলেন তখন আমরা রুদ্ধনিঃশ্বাসে সবাই শুনছি আর গৌর বলে যাচ্ছে, যেদিকে তাকাই, শুধু সাদা বরফ—আকাশ সাদা, সব কিছু সাদা, আর ঠিক আমার পেছনে সেই সাদা ভালুক, সাক্ষাৎ যমের মতো পেছনের দু-পায়ে ভর দিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে আসছে।
ঘনাদা যে ঘরে ঢুকেছেন আড়চোখে সবাই দেখে নিলেও বাইরে একেবারে কেউ টের পাইনি এমনই ভান করে রইলাম। ঘনাদার মুখখানা সত্যি তখন দেখবার মতো। এরকম অবস্থায় আগে কখনও বোধহয় পড়েননি। চিরকাল সভার মধ্যমণি হয়ে জাঁকিয়ে বসাই যাঁর অভ্যাস—তাঁর প্রতি আজ কিনা কারুর ভ্রুক্ষেপও নেই!
