ডিসেম্বর মাসের শেষ। তিমি ধরার মরশুম প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর কিছুদিন রবে। আমাদের জাহাজ তিমির চর্বির ভারে ড়ুবুড়ুবু। যা চর্বি আমরা পেয়েছি তাতে বছর তিনেক দুহাতে খরচ করেও রাজার হালে বসে বসে আমরা কাটাতে পারব। সেন রোজ তাই ফেরার জন্যে পেড়াপিড়ি করে। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি নই।
সেদিন সকালবেলা কাকের বাসায় পাহারা দিতে দিতে সেন হঠাৎ নীচে নেমে এল। আমি তখন একজন খালাসিকে দিয়ে হারপুন কামানটা পরিষ্কার করাচ্ছি। সেনকে দেখে একটু অবাক হয়ে বললাম, নেমে এলে যে বড়! এইটুকুর মধ্যে বড় কোনও শিকার যদি ফসকে যায়।
ফসকে গেলে ক্ষতিটা কী! সেনের মুখ বেশ বিরক্ত, আর শিকার গাঁথলে মাল কোথায় রাখবে বলতে পারো? জাহাজে আর জায়গা আছে?
সেনের বিরক্তি দেখে একটু হেসে বললাম, আমি যে শিকারের সন্ধান করছি তার মাল রাখবার যথেষ্ট জায়গা এখনও জাহাজে আছে। আর সে মালের কাছে তোমার জাহাজভর্তি চর্বি নেহাত তুচ্ছ।
সেন খানিকক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, তার মানে এখনও তুমি অ্যাম্বারগ্রিস-এর আশায় আছ?
আমাদের মুখের ভাব দেখে ঘনাদা গল্প থামিয়ে একটু যেন করুণার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, অ্যাম্বারগ্রিস কাকে বলে, জানো না বুঝি?
আমরা মাথা নাড়লাম। ঘনাদা ঈষৎ বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন, সাপের মাথার মণির কথা শুনেছ তো? সে মণি শুধু আজগুবি কল্পনা, কেউ কখনও পায়নি। কিন্তু অ্যাম্বারগ্রিস তিমির মাথার নয়, পেটের সত্যিকার মণি। শুধু একজাতের তিমির নাড়িভুঁড়ির মধ্যে পাওয়া যায়। তাও আবার সে জাতের সব তিমির নয়, দু-চারটির। তিমির পেট থেকে ছাড়া সমুদ্রের জলে আর সমুদ্রের ধারের পলিতেও অনেক সময় হালকা নুড়ির মতো কালচে ধোঁয়াটে রঙের অ্যাম্বারগ্রিস পাওয়া যায়। এসেন্স আতরের কারবারে সে নুড়ির দাম তার ওজনের সোনার চেয়ে কম নয়।
হ্যাঁ, তারপর যা বলছিলাম। সেনের কথা শুনে একটু হেসে বললাম, অ্যাম্বারগ্রিস-এর আশায় আছি মানে? তুমি কি মনে করো তোমার ওই নোংরা চর্বির লোভে এই যমের দক্ষিণ দুয়ারে তিমি-শিকারে এসেছি। না হে, না, আমার নজর আরও অনেক উঁচুতে। অ্যাম্বারগ্রিস বেশ ভাল রকম আছে এমন একটা তিমি যদি পাই, তাহলে ও চর্বির বখরা তোমায় এমনিই দিয়ে দেব।
তোমার উদারতার জন্য ধন্যবাদ। সে একটু বিদ্রুপ করেই বললে, তবে অ্যাম্বারগ্রিস তো আর যেখানে সেখানে ছড়ানো নেই। স্পার্ম-তিমি ছাড়া ও-জিনিস পাওয়া যায় না, জানো বোধহয়, আর স্পার্ম-তিমি এ অঞ্চলে খুব কমই পাওয়া যায়।
হেসে বললাম, কিন্তু পাওয়া যা যায় তা দস্তুর মতো বড় গোছের। এ অঞ্চলে ছুটোছাটা ছিটকে যেকটা স্পার্ম-তিমি এসে পড়ে সেগুলো সবই বুড়ো ধাড়ি। অ্যাম্বারগ্রিস তাদের পেটেই পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
যেন আমার কথার মান রাখবার জন্যেই আধ মাইলটাক দূরে একটা জলের ফোয়ারা হঠাৎ সমুদ্র থেকে লাফ দিয়ে উঠল।
হাজার হলেও সেন জাত-শিকারি। এক মুহূর্তে ঝগড়াঝাঁটি ভুলে দূরবিন চোখে লাগিয়ে সে উত্তেজিত হয়ে উঠল।
তিমি! স্পার্ম-তিমি! সমুদ্রের দেবতা তোমার কথা শুনেছে, দাস! আর ভাবনা নেই।
হায়! সমুদ্রের দেবতার মনে কী ছিল তখন যদি জানতাম!
উত্তেজনার ঝোঁকে সেন দুরবিন ছেড়ে তখন হারপন-কামানে হাত দিয়েছে। আমি বাধা দেবার আগেই প্রচণ্ড শব্দে ভেন্ড-ফয়েন কামানের হারপুন ছুটে বেরিয়ে গেল।
সেন এমনিতেই বেশ ভাল শিকারি। কিন্তু উত্তেজনাতেই তার টিপ তখন বুঝি খানিকটা নষ্ট হয়ে গেছে। বোমামুখো হারপুন তিমিটার গায়ে না লেগে কাছাকাছি পড়ে ফেটে গেল। আর তাইতেই হল সর্বনাশ। সঙ্গে সঙ্গে একটি ফোয়ারা ছেড়ে তিমিটা এমন ড়ুব মারল যে আর পাত্তাই নেই।
কিন্তু আমরাও তখন নাছোড়বান্দা। এত বড় একটা স্পার্ম-তিমির সন্ধান পাওয়ার পর আমরা তাকে বেহাত হতে দিই! যত গভীর জলেই ড়ুব দিক না কেন, বাছাধনকে নিশ্বাস নিতে, দূরে তোক কাছে হোক, কোথাও উঠতেই হবে। খুব বেশিক্ষণ ড়ুবে থাকাও তার চলবে না, কারণ আমাদের হারপুনের হুমকিতে ভাল করে নিঃশ্বাস নেবার ফুরসত তার মেলেনি। তিমিরা নিঃশ্বাস নেবার পর বহুক্ষণ ড়ুবে থাকতে পারে বটে, কিন্তু পুরোপুরি দম নেওয়া তাদের একেবারে সারা হয় না। জল থেকে হাওয়ায় এসে তারা বারকয়েক ফোয়ারা ছেড়ে, নিঃশ্বাস নিয়ে, তবে আবার অনেকক্ষণের জন্য ড়ুব মারে। এ বেচারাকে কিন্তু একটিবার ফোয়ারা ছেড়েই তাড়াহুড়ো করে ড়ুব দিতে হয়েছে। সুতরাং সাধারণ অবস্থায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ ড়ুব মেরে থাকা সম্ভব হলেও এখন মিনিট দশ-পনেরোর বেশি জলের তলায় থাকতে সে পারবে না।
সেনকে কাকের বাসায় পাঠিয়ে হারপুন কামান ধরে আমি সজাগ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সারেং আমাদের হুকুম মতো তখন মাইলখানেক ব্যাস ধরে জাহাজটাকে চক্কর দেওয়াতে শুরু করেছে।
কিন্তু স্পার্ম-তিমি নয়, নিয়তিই ওই ছদ্মবেশে আমাদের নাকাল করতে এসেছে কী করে বুঝব! তিমির দেখা আমরা আবার কেন, অনেকবার পেলাম, কিন্তু সে যেন মন্ত্ৰপড়া তিমি, হারপুন দিয়ে তাকে কিছুতেই ছুঁতে পর্যন্ত পারা গেল না। সে যেন ভেলকি জানে। হারপুন কামান থাকে জাহাজের সামনের দিকে। তিমিটা যেন তা জেনেই প্রত্যেকবার ঠিক জাহাজের পেছন দিকে ভেসে ওঠে। জাহাজ ঘুরিয়ে ভাল করে তাকে তাগ করবার আর সুযোগ মেলে না। তার আগেই সে ড়ুব দেয়। দু-চারবার এমনই করে ফসকাবার পর হঠাৎ আমাদের হারপুন কামানটাই গেল আশ্চর্যভাবে বিগড়ে। কামান মেরামত যতক্ষণ না হয় ততক্ষণ তিমিটাকে নজরে রাখা ছাড়া আর আমাদের কোনও উপায় নেই। তিমিটা যেন আমাদের মতলব বুঝেই তখন ক্রমশ আরও দক্ষিণে পাড়ি দিতে শুরু করেছে। কিন্তু আমরাও তখন মরিয়া হয়ে উঠেছি। হারপুন কামান ঠিক যদি না হয় তাহলে হাতে-ছোঁড়া হারপুন দিয়েও আগেকার যুগের তিমি-শিকারিদের মতো তাকে আমরা ধরবই এই আমাদের পণ।
