আমার বিদ্রুপে এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে প্যাপেন বললে, তুমি সেই খোঁজেই এসেছ আমরা জানি। কিন্তু এ সন্ধান তোমায় ছাড়তে হবে।
কেন, নাৎসি জার্মানির হয়ে শুধু তোমরাই সে সন্ধান করবে বুঝি?
হ্যাঁ, আমরাই করব। এ পাহাড়ে যে ইউরেনিয়াম-ঠাসা পিচব্লেন্ডের শিরা আছে সে খবর পেয়েই আমরা এসেছি। শুধু তুমি কোথা থেকে এ খবর পেলে বুঝতে পারছি না।
একটু হেসে বললাম, নাৎসিদের ওপর কেউ টেক্কা দিতে পারে তা সহজে বিশ্বাস হয় না, না?
যার পায়ে কেবিন ট্রাঙ্ক পড়েছিল সে-ই এবার হুংকার দিয়ে উঠল, নাৎসিদের ওপর টেক্কা দিতে চেষ্টা করলে কী হয় এখনই হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেব।
হেসে বললাম, তার আগে একটা কথা বুঝিয়ে দিলে খুশি হতাম। নাৎসি জার্মানির হঠাৎ ইউরেনিয়ামের ওপর অত ঝোঁক পড়ল কেন?
এবার প্যাপেনের সঙ্গী দুজন হেসে উঠল। তারপর ঘৃণাভরে বললে, তোমরা যার গোলাম সেই ইংরেজ-জাতকে তাদের দ্বীপ সমেত একেবারে নস্য করে শূন্যে মিশিয়ে দেবার জন্য।
প্যাপেন বাধা দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ছোকরাদের মুখ তখন খুলে গেছে। থামায় কার সাধ্য। উত্তেজিতভাবে বলে চলল, রেডিয়াম থেকে শুধু সামান্য দু-একটা রোগ সারাবার ছেলেখেলাই এতদিন দেখেছ, জার্মানি এবার এমন কিছু তা থেকে তৈরি করবে, দশ হাজার বজ্র যার কাছে পটকাবাজি।
সত্যিই অবাক হয়ে বললাম, যে অ্যাটম বোমা এতদিন শুধু কল্পনাতেই ছিল, নাৎসিরা তা তৈরি করবে!
হ্যাঁ, আর সেই জন্যেই এ তল্লাটে আর কোনও ভাগীদার আমরা সহ্য করব না। সুবোধ ছেলের মতো তোমায় ঘরে ফিরতে হবে।
যদি না ফিরি? বলার সঙ্গে সঙ্গে দুটো পিস্তল আমার দিকে উঁচু হয়ে উঠল।
পায়ে চোট খাওয়া জার্মান জোয়ান মুখ বেঁকিয়ে বললে, ভালয় ভালয় এই বেলা যদি সরে না পড়ো তা হলে…
তার কথা শেষ হবার আগেই প্যাপেন চমকে উঠে বললে, ও কী! ওটা কীসের আওয়াজ!
পিস্তলের দিকে নজর থাকলেও কান আমার এই আওয়াজের জন্যই এতক্ষণ সজাগ হয়ে ছিল। যাক, কুয়াঞ্জা শহরে নেমে আমার অতি মূল্যবান একটি বেলা নষ্ট করা বিফল হয়নি। আমার পুরোনো অনুচর নোয়ালা তার কথা রেখেছে তা হলে।
নিস্তব্ধ রাতের বুকের স্পন্দনের মতো সুদূরের দ্রিম দ্রিম আওয়াজটা এবার স্পষ্ট শোনা গেল। প্যাপেন কাঁচা আনাড়ি লোক নয়। আফ্রিকায় এতকাল ঘুরে এ শব্দের ভাষা সে বোঝে।
সঙ্গীদের একজন কী বলতে যাচ্ছিল, তাকে ধমকে থামিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একমনে সে একটানা সমস্ত শব্দগুলো শুনে গেল, তারপর আপনা হতেই তার চোখ আমার ওপরেই এসে পড়ল।
মুখটা যথাসম্ভব করুণ করে বললাম, আমি সত্যি দুঃখিত, প্যাপেন, মনে হচ্ছে আমায় সরিয়ে দিলেও এ তল্লাটে তোমরা বেশিদিন টিকতে পারবে না।
প্যাপেনের মুখ তখন বেশ ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। গম্ভীর মুখে বললে, হ্যাঁ, জংলিদের ঢাক তো তা-ই বলছে। কালকের মধ্যেই ওদের পক্ষে আমাদের আক্রমণ করা অসম্ভব নয়।
এত বড় বিপদের মুখে আমার কথাটা প্যাপেন ও তার সঙ্গীদের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল। নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করবার জন্য তারা বেরিয়ে যাবার পর প্রাণভরে নিজের মনে এক চোট হেসে নিলাম। নোয়ালাকে দিয়ে সময় মতো দূর থেকে ঢাক বাজাবার ফন্দিটা এতখানি সফল হবে কিনা সে বিষয়ে মনে একটু সন্দেহ সত্যিই ছিল।
নিজের ফন্দিতে নিজের কী সর্বনাশ ডেকে আনছি তখনও কি জানি? বুঝতে পারলাম হঠাৎ শেষরাত্রে ঘুম থেকে চমকে জেগে উঠে। প্যাপেনরা কী করেছিল জানি না, আমি কিন্তু তাদের ভড়কে দিয়ে বেশ নিশ্চিন্ত মনেই ক্যাম্প খাটে শুয়ে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ জেগে টের পেলাম জনকয়েক কালো মুশকো জোয়ান মুখে কাপড় গুঁজে আমারই খাটের সঙ্গে শক্ত করে আমায় বাঁধছে। তাদের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে বুঝতে তখন আমার বাকি নেই যে আমার দুষ্ট বুদ্ধি আমারই কাল হয়েছে। প্যাপেনকে ভয় দেখিয়ে এ অঞ্চল থেকে তাড়াবার জন্যে নোয়ালাকে দিয়ে যে মিথ্যে ঢাকের বাদ্যি বাজিয়েছিলাম, প্যাপেনের কুলিরাও তা সত্যি বলে ধরে নিয়েছে। কাফ্রি কুলিরা এ ঢাকের ভাষা বোঝে। জংলিরা যখন পরের দিন আমাদের শেষ করে দেবে-ই এবং তখন সঙ্গে থাকলে কুলিদেরও যখন মারা পড়তে হবে তখন সময় থাকতে প্রাণ বাঁচাবার সঙ্গে উপরি লাভ তারা করে নেবে না কেন, এই হল তাদের কথা। জানাশোনা বিশ্বাসী কুলির দল এরকম অবশ্য সাধারণত করে না, কিন্তু ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখবার জন্যে প্যাপেন সম্ভবত নতুন অজানা লোক ভাড়া করে এনেছিল। তাইতেই সর্বনাশ!
কুলিরা যেভাবে বেঁধে গেছল তাতে পরের দিন নোয়ালা এসে না খুলে দিলে ওই অবস্থাতেই হয় অনাহারে শুকিয়ে, নয় জংলিদের হাতে মরতে হত। কিন্তু নোয়ালা যে খবর নিয়ে এল তা আরও ভয়ংকর। অবশ্য এই দুঃসংবাদ দেবার দরকার না থাকলে নোয়ালা আমার খোঁজে আসত না এবং আমারও মুক্তি হত না। নোয়ালার খবর শোনবার পর কিন্তু মুক্তি পাওয়া না-পাওয়া সমান কথা মনে হল। নোয়ালার মিথ্যে ঢাকের আওয়াজে শুধু কুলিরাই ভুল বোঝেনি, দূর-দূরান্তের জংলি জাতেরাও তাতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। দিনের বেলা এ অঞ্চলের শুকনো লম্বা ঘাসের জঙ্গলের ওপর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম থেকে সারাক্ষণ প্রচণ্ড এক হাওয়া বয়। সে হাওয়ার শব্দের জন্য আর নিজের দুঃখের চিন্তায় এতক্ষণ যা খেয়াল করিনি, এইবার কান পেতে তা শুনতে পেলাম। দক্ষিণের সমস্ত আকাশ ঢাকের আওয়াজে গমগম করছে।
