তিনজনই অবাক হয়ে সেদিকে চাইলাম।
ট্রেন তখন ছেড়ে দিয়েছে। কামরার দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে পিপের মতো গোল, বেলের মতো চাঁচামাথা মাঝবয়সী যে-জার্মান ভদ্রলোকটি আমার দিকে এগিয়ে এল, প্রথমটা তাকে সত্যিই চিনতে পারিনি।
আমাদের কাছাকাছি এসে, মারমূর্তি তার দুটি সঙ্গীর দিকে চোখ পড়তে একটু অবাক হয়ে সে বললে, ব্যাপার কী হে! তোমরা লড়াই করছিলে নাকি?
এবার দুজনের মুখে খানিকক্ষণ খই ফুটল যেন। কালা আদমির কাছে জব্দ হয়ে গায়ের জ্বালা মুখের তোড়ে বার করতে তারা কিছু বাকি রাখলে না।
তাদের কথা শেষ হবার পর বেলের মতো তেল-মাথা জার্মানের সে কী হাসি। পিপের মতো ভুড়ি তার ফেটে যায় আর কি!
অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে সে বললে, তোমরা আর ঝগড়া করবার লোক। পাওনি?
আমার দিকে ফিরে তারপর বললে, কিছু মনে কোরো না, হের ডস, এরা সেদিনের ছোকরা, তোমার পরিচয় কোথা থেকে জানবে।
হেসে আবার বললে, আমায় চিনতে পারছ তো?
চিনতে আমি তখনই পেরেছি। মাথার শেষ ক-গাছি চুল উঠে গেলেও এবং ভুড়িটি বেশ কয়েক ইঞ্চি বাড়লেও আগেই তাকে আমার চেনা উচিত ছিল। দুনিয়ার পাণ্ডবর্জিত সব দুর্গম জায়গায় প্রাণ হাতে নিয়ে দুর্লভ ধাতুর খোঁজে যারা ঘুরে বেড়ায়, ফন্দিবাজ প্যাপেনকে তারা সবাই চেনে। অমন একটি ধূর্ত শয়তান এ লাইনে আর দুটি নেই। আমার সঙ্গে দু-চারবার তার ঠোকাঠুকি আগেই হয়ে গেছে বলেই আমার অত খাতির তার কাছে। শুধু দেশ দেখার জন্য এত লটবহর নিয়ে প্যাপেন যে এই জঙ্গল মরুভূমির দেশে আসেনি তা বুঝতে পারলেও, মুখে অমায়িক হেসে আমি তার হাত ঝাঁকানি দিলাম।
এইবার শেয়ানে শেয়ানে কোলাকুলি শুরু হল। আমি প্যাপেনকে দেখে যতটা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছি, প্যাপেনও আমাকে দেখে তার চেয়ে বেশি বই কম নয়। এখন কে কৌশলে কার পেট থেকে কথা বার করে নিতে পারে তারই প্যাঁচ কষাকষি চলল। আমার পাশে বসে প্যাপেন এমন অন্তরঙ্গের মতো গল্প শুরু করলে যেন কোনও রেষারেষি আমাদের মধ্যে নেই। দুজনের কেউই কম যায় না। ঘণ্টা দুয়েক সমানে নানান কায়দা করেও কেউ কারুর মুখ থেকে একটা বেফাঁস কথাও বার করতে পারলাম না। বাঁকা রাস্তায় সুবিধে করতে না পেরে প্যাপেন হঠাৎ হেসে উঠে সোজাসুজিই জিজ্ঞেস করে বসল, আর লুকোচুরিতে লাভ নেই। সত্যি করে বলল তো, ডস, কোথায় চলেছ?
হেসে বললাম, হয়তো সেখানে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।
আমার সঙ্গে দেখা! প্যাপেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ল, আরে আমি তো যাচ্ছি একেবারে অ্যাংগোলার শেষ প্রান্তে লুয়াও স্টেশনে।
তাই নাকি? হেসে বললাম, মালপত্র দেখে তাই মনে হচ্ছে বটে।
আরে, ওসব মালপত্র তো লুয়াওর এক হাসপাতালের জন্য নিয়ে যাচ্ছি।
আজকাল আর পাহাড়ে পর্বতে সোনা রুপো খুঁজে বেড়াবার মতো শরীরে সামর্থ্য নেই, তাই এই সব মাল জোগাবার কাজ নিয়েছি। প্যাপেন আমাকে একেবারে জল বুঝিয়ে দিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলে, কিন্তু তুমি কোথায় নামবে তা তো বললে না!
আগের মতোই হেসে বললাম, যেখানেই নামি, দেখা আমাদের যথাস্থানে হবে বলে মনে হচ্ছে।
হঠাৎ প্যাপেন গম্ভীর হয়ে বললে, দেখা কিন্তু এবার আমাদের না হলেই ভাল হত।
কেন বলো তো! একটু বিদ্রুপের সঙ্গেই বললাম, এবার থার্ড রাইখ অর্থাৎ নাৎসি জার্মানির হয়ে টহল দিতে বেরিয়েছ বলে?
খানিক চুপ করে থেকে প্যাপেন তেমনই গম্ভীরভাবে বললে, হ্যাঁ, তা-ই যদি বলি!
তা হলে বলব নাৎসিদের সে চরেদের দৌড় কত একবার দেখে মরতে চাই।
বাকি দুজন জার্মান গোঁজ হয়ে অন্য এক বেঞ্চিতে বসে এতক্ষণ কান খাড়া করে আমাদের আলাপ শুনছিল। আর থাকতে না পেরে তাদের একজন দাঁত খিচিয়ে বলে উঠল, তোমার বাসনা অপূর্ণ থাকবে না।
তার দিকে ফিরে একটু হাসলাম। ক-দিন বাদে তার অভিশাপ সত্যিই ফলবার উপক্রম হবে তখন ভাবিনি।
দিন পনেরো পরের কথা।
বিহে অধিত্যকায় একটা খাড়া পাহাড়ের চূড়ার নীচে তাঁবুর মধ্যে বসে লণ্ঠনের আলোয় সে অঞ্চলের একটা ম্যাপ আঁকছিলাম। অন্ধকার রাত, চারিদিক একেবারে নিস্তব্ধ। সারাদিন দক্ষিণ-পূর্ব মুখে যে ঝড়ের মতো হাওয়া বয়েছে তা-ও এখন যেন ক্লান্ত হয়ে থেমে গেছে।
ম্যাপ আঁকায় খুব যে আমার মন ছিল তা নয়। থেকে থেকে কান খাড়া করে যা শোনবার চেষ্টা করছিলাম হঠাৎ তার আভাস পেয়ে ম্যাপের ওপর নিবিষ্টভাবে ঝুঁকে পড়লাম। একটু পরেই ভারী গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম—একি! এখানেও হের ডস যে!
মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি প্যাপেন ও তার দুই সঙ্গী যথাসম্ভব নিঃশব্দে আমার তাঁবুর মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।
সারাদিন পাহাড়ের চূড়া থেকে লটবহর ও কুলির দল নিয়ে দূর থেকে তাদের আসা যে আমি লক্ষ করেছি, তাদের আসার জন্যই যে এমন করে আসর সাজিয়ে বসে আছি একথা ঘুণাক্ষরে বুঝতে না দিয়ে অত্যন্ত অবাক হবার ভান করে বললাম,
তাই তো, সত্যিই আমাদের আবার দেখা হল দেখছি।
হুঁ, কিন্তু না হলেই ভাল হত। প্যাপেনের মুখ রীতিমতো গম্ভীর। কেন বল তো! এ পাহাড়ে সোনাদানা যা আছে তাতে আমি আর কতটুকু ভাগ বসাতে পারব। তোমাদের যত খুশি নাও না।
সোনাদানার খোঁজে আমরা আসিনি, আর তুমিও না, প্যাপেন বেশ একটু রাগের সঙ্গেই বললে, সোনাদানার জন্যে কেউ গেগার কাউন্টার সঙ্গে আনে না।
মেঝের ওপর গেগার কাউন্টারটা যেন সেইমাত্র চোখে পড়ল, এইভাবে বললাম, তাই তো, গেগার কাউন্টারটা ভুলে সঙ্গে এনেছি দেখছি। ইউরেনিয়াম রেডিয়াম প্রভৃতি ধাতুর খোঁজে এ-যন্ত্রের দরকার হয় শুনেছি।
