কিন্তু ঘরে ঢুকে খাটের তলায় উঁকি মেরে সত্যিই থ হয়ে গেলাম। ঘনাদা খাটের তলায় মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন।
সে দৃশ্যটা ভোলবার নয়। খাটের তলায় ঘনাদা আর বাইরে আমরা বিমূঢ় হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। আমরা তো এমন হতভম্ব যে হাসতে পর্যন্ত ভুলে গেছি।
ঘনাদা কিন্তু সেই অবস্থাতেও এক মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে এমনভাবে খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এলেন যেন খাটের তলায় শুয়ে থাকাটা তাঁর একটা স্বাভাবিক নিত্য-নৈমিত্তিক অভ্যাস।
এতক্ষণে আমাদের মুখে কথা ফুটল।
ব্যাপার কী, ঘনাদা! এমন সময়ে খাটের তলায়। জিজ্ঞাসা করলে শিশির।
ঘনাদা কিছু না বলে গম্ভীরভাবে শুধু ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন! হাতে যা রয়েছে। সেটা একটা চশমার কাচ বলেই মনে হল।
এতক্ষণ ধরে খাটের তলায় ওই একটা ভাঙা কাঁচের টুকরো খুঁজছিলেন! আমি বলে পারলাম না।
তার উত্তরে ঘনাদা নাকের ভেতর দিয়ে যে শব্দটা বার করলেন, তার অর্থ বিরক্তি অধৈর্য অবজ্ঞা সবই একসঙ্গে হতে পারে। তারপর শব্দটাকে ভাষায় রূপ দিয়ে আমাদের দিকে করুণার দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন, একটা ভাঙা কাঁচের টুকরো— কেমন?
গতিক সুবিধে নয় দেখে শিবু তাড়াতাড়ি বললে, ওদিকে বসিং কিন্তু শুরু হয়ে যাবে…
আর বসিং! ঘনাদার গল্প তখন শুরু হয়ে গেছে, এই ভাঙা কাঁচের টুকরোটি না থাকলে হিরোসিমা নাগাসাকির বদলে লন্ডনেই প্রথম অ্যাটম বোমা পড়ত তা জানো!
জানবার আমাদের দরকার নেই—শিবু দুর্বলভাবে শেষ চেষ্টা করে বললে,
এখন আপনি চলুন তো!
এই যে যাই, বলে খাটের ওপরই বেশ আরাম করে বসে ঘনাদা বললেন, ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর! তারিখটা তোমাদের মনে আছে নিশ্চয়। যে মহাযুদ্ধে সমস্ত পৃথিবী রক্তে ভেসে গেল তার প্রথম ফুলিঙ্গ সেইদিন জার্মানি আর পোল্যান্ডের সীমান্তে জ্বলে উঠেছিল। হিটলারের দুরন্ত বাহিনী সেদিন পোল্যান্ডের ওপর বন্যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে আর আমি বেঙ্গুয়েলা বন্দর থেকে ছ্যাকরাগাড়ির মতো এক ট্রেনে চেপে অ্যাংগোলার মাঝামাঝি কুয়াঞ্জা স্টেশনের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। আমার লক্ষ্য অবশ্য কুয়াঞ্জা স্টেশন নয়। সেখানে নেমে কুয়াঞ্জা নদীর যেখানে উৎস সেই বিহে পাহাড়েই যাবার জন্যে আমি বেরিয়েছি।
একটু হেসে আমাদের মুখের ভাবগুলো একটু লক্ষ করে ঘনাদা বললেন, ভূগোলের পরীক্ষার মতো লাগছে বুঝি। বুঝিয়ে বলছি দাঁড়াও। অ্যাংগোলার নাম নিশ্চয় শুনেছ। না শুনে থাকলে আফ্রিকার ম্যাপটা একবার খুলে দেখো। তলার দিকে পুবের আতলান্তিক মহাসাগরের ধারে একটা সবুজ রঙের ছাপা দেশ পাবে। দেশটা পর্তুগিজদের দখলে, কিন্তু রেলটা ইংরেজদের। আর ওই রেলপথ আর সমুদ্রের ধারের কিছু কিছু জায়গা ছাড়া ভেতরের অধিকাংশ পাহাড় জঙ্গল মরুপ্রান্তর এখনও প্রায় অজানা বললেই হয়। সেখানে বানিগ্রো জাতের কাফ্রিরা একরকম স্বাধীনভাবেই থাকে।
রেলের যে কামরাটায় উঠেছিলাম সেটা প্রথম শ্রেণীর। নোভা লিসবোয়া স্টেশন পর্যন্ত একাই বেশ আরামে সেটায় কাটালাম। নোভা লিসবোয়াতে নতুন দুজন যাত্রী উঠল। সারা রাস্তা একলাই একটা কামরা দখল করে যেতে পারব এ আশা করিনি, কিন্তু নতুন সঙ্গী দুজন অমন বেয়াড়া অভদ্র না হলে ভাল হত। কথাবার্তা ও চেহারা দেখে গোড়াতেই বুঝেছিলাম তাদের দুজনেই জার্মান। অ্যাংগোলা পর্তুগিজদের দখলে হলেও জার্মানদের আনাগোনা এখানে কিছুদিন ধরে খুব বেড়েছে জানতাম। শুধু নতুন নাৎসি তেলক কেটে তারা যে এখন সাপের পাঁচ পা দেখেছে তা জানা ছিল না।
নতুন যাত্রীদের লটবহর বড় বেশি। বড় বড় চটে মোড়া থলি প্যাকিং বাক্স প্রভৃতি এক গাড়ি মাল ব্রেকভ্যানে না দিয়ে কামরায় ভোলাই অন্যায়। তবু গোড়ায় তা নিয়ে কোনও প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু জার্মান যাত্রীদের অভদ্রতা ক্রমশ সীমা ছাড়িয়ে গেল। একটি কেবিন ট্রাঙ্ক ও একটি হোল্ডঅল ছাড়া আমার সঙ্গে কিছু নেই। কেবিন ট্রাঙ্কটা বার্থ-এর ওপর রেখে হোল্ডঅলটা খুলে তার ওপর শুয়ে শুয়ে আমি নতুন যাত্রীদের নাল তোলা দেখছিলাম, হঠাৎ একজন আমায় অসভ্যের মতো যা হুকুম করলে আমাদের ভাষায় অনুবাদ করলে তার অর্থ দাঁড়ায়, এই কালাভূত, তোর মোট সরা এখান থেকে?
যেন কিছুই বুঝিনি এইভাবে লোকটার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। দুজনের মধ্যে এই লোকটাই দেখলাম বেশি জোয়ান। ছ-ফুট লম্বা, পাক্কা আড়াই মন লাশ।
আমায় নড়তে না দেখে একটা গালাগাল দিয়ে লোকটা আমার হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে বললে, শুনতে পাচ্ছ না, জানোয়ার কোথাকার! বুটের একটা ঠোক্করে একেবারে গাড়ির বাইরে ফেলে দেব।
যেন কিছুটা বুঝতে পেরেছি এমনই ভাবে বোকার মতো উঠে দাঁড়িয়েই কেবিন ট্রাঙ্কটা টেনে নামিয়ে নীচে ফেললাম। দুর্ভাগ্যের বিষয় তার ডান পা-টা সেইখানেই ছিল। ট্রাঙ্কটা বেশ ভারী। পায়ের যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠে নেংচাতে নেংচাতে লোকটা প্রথম মিনিট কয়েক তো আমার চতুর্দশ পুরুষ উদ্ধার করলে। তারপর বুনো গণ্ডারের মতো তেড়ে এল আমার দিকে।
এবার একটা সিগারেট ধরালাম।
লোকটা তখন ডিগবাজি খেয়ে তার সঙ্গীর ঘাড়েই গিয়ে পড়ে দুজনে মিলে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দুজনে গা ঝেড়ে উঠে ঘুষি বাগিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে, এমন সময় দরজা থেকে শোনা গেল, আরে, আরে, হের ডস নাকি!
