কোথায় গেলেন ঘনাদা!!
সবাই মিলে সারাদিন যাঁকে চোখে চোখে পাহারায় রাখা হয়েছে, এই ভর সন্ধের সময় সকলকে ফাঁকি দিয়ে তিনি কোথায় পালালেন—এবং কেমন করে!!!
নীচে ওপরে ছাদে পর্যন্ত আমরা সবাই ঘুরে এলাম। কোথাও ঘনাদার চিহ্ন নেই।
সত্যিই কি ঘনাদা তাঁর গল্পের বাহাদুরির খেল আমাদের প্রত্যক্ষ দেখিয়ে দিলেন?
তেতলার ছাদ থেকে লাফিয়েই পড়লেন আমাদের এড়াতে?
আমাদের এড়াতে চাইবার কারণ একটা অবশ্য ছিল, কিন্তু সত্যি, সেটা ঘনাদার কাছে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে বাধ্য করবার মতো গুরুতর হতে পারে তা আমরা ভাবিনি।
আমরা শুধু একটা মজাই করতে চেয়েছিলাম ঘনাদাকে নিয়ে।
ফন্দিটা শিবুর। ঘনাদা সেদিন তাঁর মৌরসিপাট্টা করা আরামকেদারায় বসে শিশিরের সিগারেটের টিনের সদ্ব্যবহার করতে করতে আমাদের দু-চারটে খোশগল্প শোনাচ্ছেন, এমন সময় শিবু যেন অত্যন্ত ব্যস্তভাবে ঘরে ঢুকে বললে, এই যে, ঘনাদা! আপনাকেই খুঁজছিলাম।
শিবুর কথার ধরনে আমরা একটু অবাক হয়েই তার দিকে তাকালাম। ঘনাদাই নিজের দরকারে যথাসময়ে আমাদের খুঁজে বার করেন, এক গল্প শোনা ছাড়া তাঁকে গরজ করে খোঁজবার কারণ আর কিছু তো কখনও দেখা যায়নি!
ঘনাদার পাশেই একটা মোড়া টেনে নিয়ে বসে শিবু বেশ ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করলে, কাল বিকেলে আপনার তেমন জরুরি কোনও কাজ আছে নাকি!
আমরা এবার অতিকষ্টে হাসি চাপলাম। ঘনাদার কাজ! এত বড় আজগুবি কথা কখনও আমরা শুনিনি।
ঘনাদা শিবুর প্রশ্নে বোধহয় আমাদের মতোই হতভম্ব হয়েছিলেন, কিন্তু দস্তুর মতো গম্ভীরভাবে বললেন, কাল বিকেলে? দাঁড়াও…কমিশনারের সঙ্গে একবার…প্রিমিয়ারকে একটা ফোন..
মনে মনে সশব্দে ঘনাদা যা আওড়ালেন তাতে বোঝা গেল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে চার্চিল সাহেবকে একদিনে এতগুলো দায় একসঙ্গে সামলাতে হয়নি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিবুর ওপর সদয় হয়ে বললেন, তা খানিকক্ষণ সময় হতেও পারে, কিন্তু কেন বলো তো?
না, এমন কিছু না। আমাদের Athletic Club-এ কাল একটা ব্যাপার আছে কিনা, তাতে আপনাকে একটু থাকতে হবে।
ঘনাদার মুখ তাঁর পক্ষে যতখানি সম্ভব উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শিবুদের ক্লাবে এর আগে একবার তাঁর যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে শরীরচর্চা যতটা না হোক, এ সমস্ত অনুষ্ঠানে ভোজটা বেশ জমকালো রকমেরই হয়। ঘনাদা উৎসাহটা যতদূর সম্ভব লুকোবার চেষ্টা করে বললেন, তা বলছ যখন এত করে, তা না হয় যাব-খন। কিন্তু কী ব্যাপারটা বল তো?
একটা বকসিং কন্টেস্ট—মুষ্টিযুদ্ধের প্রতিযোগিতা—আপনাকে সালিশি অর্থাৎ রেফারির কাজ করতে হবে।
মুষ্টিযুদ্ধ শুনে ঘনাদার মুখে যেটুকু ছায়া নেমে এসেছিল, রেফারিগিরি শুনেই সেটুকু কেটে গেল। বললেন, রেফারি হতে হবে। বেশ বেশ! তা ভাল রেফারি বুঝি আর কাউকে পেলে না!
পাব না কেন? শিবু গম্ভীরভাবে বললে, কিন্তু এবারে একটু ফ্যাসাদ আছে। কিনা! জানাশোনা রেফারিরা কেউ রাজি হচ্ছে না!
কেন বলো তো? ঘনাদার জ একটু কুঞ্চিত মনে হল।
ব্ল্যাক টাইগারের নাম শুনেছেন কিনা জানি না, মিশকালো নিগ্রো বক্সার—আর একেবারে বাঘের মতোই হিংস্র। মাসখানেক হল কলকাতায় এসেছে। তার সঙ্গে আমাদের ওয়েলটার ওয়েট চ্যাম্পিয়ন সুরজিৎ দাসের লড়াই কিনা! তাতে রেফারির ভয়টা কীসের?আমরাই জিজ্ঞাসা করলাম।
ব্ল্যাক টাইগারের পরিচয় তা হলে জানো না মনে হচ্ছে, শিবু আমাদের দিকে একটু অনুকম্পাভরেই তাকাল, এ পর্যন্ত পাঁচজন রেফারিকে সে হাসপাতালে পাঠিয়েছে, একজন তো আর ফেরেইনি। একটু মেজাজ বিগড়োলে কে রেফারি আর কে তার প্রতিদ্বন্দ্বী তার হুশই থাকে না।
শিবু ঘনাদাকে লুকিয়ে আমাদের দিকে যৎসামান্য একটু চোখ টিপতেই ব্যাপারটা
আমাদের আর বুঝতে বাকি রইল না।
শিশির ন্যাকা সেজে জিজ্ঞাসা করলে, তা এ রকম খুনেদের আসরে ঘনাদাকে রেফারি করা কেন বাপু!
বাঃ, ঘনাদার মতো রেফারিই তো দরকার। রেফারিকে রেফারিগিরিও করবে, আবার কালা বাঘ কিছু বেয়াড়াপনা করলে একটি আপারকাট-এ তাকে শায়েস্তাও করতে পারবে! বলুন না ঘনাদা, সেই ব্যাটলিং মিকিকে আপনি শুধু স্ট্রেট লেফটে কী রকম নাজেহাল করেছিলেন?
অন্যদিন হলে ঘনাদাকে আর দুবার বলতে হত না, কিন্তু সেদিন মেজাজটা তাঁর কেমন বিগড়ে গেছে বলে মনে হল। বিরসভাবে একটু হেসে তিনি হঠাৎ উঠে পড়লেন।
গৌর অবাক হবার ভান করে জিজ্ঞাসা করলে, ও কী, উঠলেন কেন? কাল রেফারি হবেন তো?
ঘনাদা কিছু বলবার আগেই শিবু বলে উঠল, আরে ওকথা আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়। এমন একটা সুবিধে ঘনাদা ছাড়েন কখনও। কাল তা হলে সন্ধে ছটায় ঠিক রইল।
ঘনাদা কী একটা যেন বলতে গিয়ে না বলে বেরিয়ে গেলেন।
ওপরের সিঁড়িতে তাঁর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাবার পর আমাদের ঘর হাসির রোলে ফেটে যাবার উপক্রম।
তারপর আজ সেই সন্ধে থেকে ঘনাদাকে খুঁজছি!
হঠাৎ অদৃশ্য না হলে ঘনাদা যে আমাদের সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন না এ বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। কিন্তু তা হলে তিনি গেলেন কোথায়!
শিবুর সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। ঘর দোর ছাদ থেকে বাথরুম পর্যন্ত সব তন্ন তন্ন করে খুঁজে হতাশ হয়ে সে হঠাৎ বললে, আচ্ছা, খাটের তলাটা তো দেখা হয়নি।
আমরা হেসে উঠে আপত্তি জানালাম। আর যেখানে হোক খাটের তলায় গিয়ে ঘনাদা লুকিয়ে থাকবেন, এটা কল্পনা করা যায় না।
