এর মধ্যেই অত হতাশ হচ্ছেন কেন? যে উড়ে গেছে সেই পৌছোতে পারে কিনা, দেখুন। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই তো জানতে পারবেন।
কী করে? হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করলে লার্বো।
এই আফ্রিকারই বেতার টেলিগ্রামে। সে-ই ব্যবস্থাই করে এসেছি। আর তো কয়েক মিনিট মাত্র। কানটা শুধু খাড়া করে রাখুন।
ড. লার্বো নিজের হাতের ঘড়িটা দেখে বললেন, একটা বছর পূর্ণ হতে আর তো মাত্র উনিশ মিনিট আটাশ সেকেন্ড বাকি।
হেসে বললাম, সেই হিসেব ধরেই ওইটুকু সময় ধৈর্য ধরে থাকুন না। টমটমের খবর আসতে অবশ্য মিনিট কয়েক দেরি হতে পারে।
দেরি বিশেষ হল না। মিনিট পঁচিশ বাদেই এক টমটম থেকে আর এক টমটমে হাত ফেরতা হয়ে সংকেত ধ্বনি আমাদের কাছে পৌছে গেল।
ভাল করে কান পেতে শুনে বললাম, ক্যাপেল ট্রাস্ট সেরেস্তায় পৌঁছেছে ঠিক তিনশো পঁয়ষট্টি দিন পাঁচ ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট একুশ সেকেন্ডের মাথায়।
তাহলে তো সব আশা-ভরসা শেষ।ডা. লার্বোর গলা যেন কান্নায় ধরে গেল।
না, ড. লর্বো। চুক্তির শর্ত রাখতে পারেনি বলে ক্যাপেলার দাবি গ্রাহ্য হয়নি।
তার মানে? আমরাই এবার উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। বছর পূর্ণ হবার বেশ কয়েক সেকেন্ড আগেই তো ক্যাপেলা পৌঁছেছে।
আমাদের দিকে চেয়ে ঘনাদা অনুকম্পার হাসি হেসে বললেন, ড, লার্বোও ওই প্রশ্নই করেছিল অবাক হয়ে। তাকে তখন বলেছিলাম, চুক্তির আসল শর্তটা ভুলে যাচ্ছেন কেন ড. লার্বো। ১৯০৩ সালের ইজারা। পুরো বছরের হিসাবটা ১৯০৩ সালের মাপ ধরেই হবে।
তাতে হয়েছে কী! লার্বো তোমাদের মতোই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেছিল।
১৯০৩ আর ১৯৪৫-এর হিসাব এক নয়, হয়েছে শুধু এই বলে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম ব্যাপারটা, ১৯০৩ সালে পুরো বছরের মাপ তিনশো পঁয়ষট্টি দিন পাঁচ ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট আটাশ সেকেন্ড ছিল না।
আটাশ সেকেন্ড কী বলছেন! গৌর প্রতিবাদ জানালে, দিন ঘণ্টা মিনিট সব ঠিক আছে, কিন্তু আটাশ নয়, ওটা ছেচল্লিশ সেকেন্ড।
ঘনাদার চোখে সেই অনুকম্পার দৃষ্টি। হেসে বললেন, ছেচল্লিশ সেকেন্ড এই আজ ১৯৬৩ সালে। ১৯৪৫-এ ছিল আটাশ সেকেন্ডের কিছু কম বেশি, আর ১৯০৩ সালে ছিল তিনশো পঁয়ষট্টি দিন পাঁচ ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট এগারো সেকেন্ড মাত্র। পৃথিবীর সূর্য প্রদক্ষিণের সময় প্রতি বছরই প্রায় এক সেকেন্ড করে বাড়ছে, কখনও একটু-আধটু আবার কমেও যায় কোনও অজানা কারণে। ১৯০৩ সাল থেকে ১৯৬৩-এর মধ্যে সময়টা ৩৫ সেকেন্ড বেড়ে গেছে।
একটু থেমে আমাদের হাঁ করা মুখগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে ঘনাদা আবার বললেন, সব শুনেও লার্বো তেমনই হতাশ ভাবে বললেন, ক্যাপেলার দাবি গ্রাহ্য হয়নি ঠিকই, কিন্তু তাতে আমাদের কী লাভ! আমাদের দাবি তো তাতে সাব্যস্ত হয়নি!
তা-ও হয়েছে!আশ্বাস দিয়ে বললাম, আমার বন্ধু ড. ব্রান্ট সে ব্যবস্থাও করেছেন
বলে জানাচ্ছেন।
ড. ব্রান্ট! জীববিজ্ঞানের সেই পণ্ডিত! কিন্তু তিনি কী করে ব্যবস্থা করবেন। এ খবর তাঁর কাছে ক্যাপেলার প্লেনেরও আগে পৌঁছোবে কী করে।
পৌঁছেছে মাছির পাখায়!
মাছির পাখায়! লার্বো অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, এটা কি ঠাট্টার বিষয়, দাস।
ঠাট্টা নয়, ড. লার্বো! সত্যি কথাই বলছি। আমার ওই জাল ঢাকা কৌটোয় এক জাতের মাছিই ছিল। তার নাম Cephenomya। শব্দের চেয়ে দ্রুত তাদের গতি। ঘণ্টায় ৮১৭ মাইল। সেই মাছি ছাড়া মাত্র দিগ্বিদিকে বিদ্যুৎ বেগে উড়ে গেছে। ড. ব্রান্টকে আমি সব বুঝিয়ে সজাগ থাকতে বলে এসেছিলাম। এ জাতের কোনও মাছি তাঁর এলাকায় নেই। সুতরাং একটা চোখে পড়লেই যেন তিনি আপনার নামে ট্রাস্টের সেরেস্তায় দাবি পেশ করেন। তিনি তা-ই করেছেন যথাসময়ে।
ঘনাদা তাঁর কথার ওজন বাড়াবার জন্য একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর স্বরে বললেন, মাছির ঋণ আমি ভুলতে পারি না বলেই ওসব ফ্লিটটিট আমার দুচক্ষের বিষ।
আচ্ছা, যার জন্য এত কুরুক্ষেত্র, শিবু জিজ্ঞাসা করলে, সেই ইস্পাতের দরজার আড়ালে লুকোনো গুপ্তধনটা কী!
আফ্রিকার সব চেয়ে বড় সম্পদ। না, হিরে-মানিক সোনা-দানা নয়, আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শিল্পী বেনিনদের বহু আগেকার লুপ্ত এক শাখা-জাতির আশ্চর্য শিল্পীদের তুলনাহীন ব্রাঞ্জের, হাতির দাঁতের আর খোদাই করা কাঠের সব মূর্তি আর আসবাব। ড, লার্বোর বাবা আঁদ্রে জীবন পাত করে সেসব সংগ্রহ করেছিলেন। ড. লার্বো এখনও সেগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন বলে এখনও বাইরের কেউ সেসব দেখতে পায়নি।
সবই বুঝলাম, শিশির হঠাৎ বেতালা প্রশ্ন করলে, কিন্তু আপনার ওই সেফেনোমিয়া না কি জেট প্লেনের যমজ মাছি গোটা আফ্রিকা থাকতে ঠিক রেই-বৌবায় আপনার বন্ধু ড. ব্রাস্টের কাছেই উড়ে গেল! শেখানো মাছি বুঝি?
ঘনাদা হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বললেন, ওহে তোমাদের দেবু, থুড়ি মৌলবি সাহেব যে নীচে একা একা বসে থেকে শেকড় গজিয়ে ফেললেন! এতক্ষণে গোঁফদাড়ি খুলে গেল কি না, দেখো গে যাও।
চমকে উঠে একবার ঘনাদার দিকে চেয়েই মাথা আমাদের সব হেঁট।
আর টু শব্দটি না করে সুড়সুড় করে সবাই নীচে নেমে গেলাম।
চালাকিটা যে ঘনাদা আগেই ধরে ফেলেছেন, তা কি জানি!
সত্যিই একটা হাতের লেখা পুরোনো উর্দু পুথি যোগাড় করে পাড়ার শৌখিন থিয়েটারের দল থেকে দেবুকে দাড়ি গোঁফ আর আচকান পরিয়ে মিশরী মৌলবি সাজিয়ে এনেছিলাম।
ঘনাদার গল্প (গল্পগ্রন্থ)
কাঁচ
ঘনাদা কোথায়?
