লার্বোকে সুস্থ করে তার সমস্ত কাহিনী শুনতে প্রায় ঘণ্টা চারেক তখন কেটে গেছে। ক্যাপেলার অবস্থা দেখবার জন্যে একবার যাওয়া দরকার মনে করে উঠতে যাচ্ছি—এমন সময়ে গুহামুখে একটা ছায়া পড়ল।
অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, ক্যাপেলাই টলতে টলতে গুহার বাঁকটার মুখে ঢুকে দাঁড়াল।
আরে, আসুন, আসুন, সেনর ক্যাপেলা! আপনি এত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন ভাবতে পারিনি। ভেতরের দুর্ভাবনা যথাসাধ্য চেপে হাসিমুখে বললাম, কিন্তু সুস্থ হয়েই আবার কষ্ট করে এখানে এলেন কেন?
একটা দরকারি কাজ বাকি ছিল বলে আসতে হল।ক্যাপেলার করুণ সুরটা একটু বেশি চড়া মনে হল।
কী কাজ? আমাদের কাছে মাপ চাওয়া?
না। একটা ছুঁচো আর একটা ইঁদুরকে জ্যান্ত কবর দেওয়া। এগোবার চেষ্টা করিস। , আমার হাতে এই হ্যান্ড গ্রেনেড দেখছিস। এটা ছুঁড়ে তোদের এখুনি শেষ করে দিয়ে যেতে পারি। কিন্তু অত সহজে মেরে আমার আশ মিটবে না। যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেখানকার ওপরের পাথর আলগা। এই গ্রেনেড ফাটলেই সে সব পাথর পড়ে এ গুহার মুখ এমন বন্ধ হয়ে যাবে, অন্তত একশো জোয়ান না হলে সে পাথর সরানো অসম্ভব। একশো জোয়ান দূরে থাক, একটা মাছিও এখানে আসবে না খোঁজ করতে।
না-ই আসুক, মাছি এখান থেকে উড়ে যেতে তো পারবে!
এই জ্যান্ত কবরে পচে মরতে মরতে ও-রকম রসিকতা ভাববার অনেক সময় পাবি। এখনও শুধু শেষ একটা সুযোগ দিচ্ছি প্রাণে বাঁচবার। চাবিটা আর গুপ্তগুহার হদিস যদি এখনই পাই তো ছেড়ে দিতে পারি তোদের।
কিন্তু চাবি আর গুপ্তগুহার হদিস পেলেই কিছু লাভ হবে কি আর? হেসে বললাম, সময় তো ক্রমশই ফুরিয়ে আসছে।
সময় যথেষ্ট আছে এখনও। সে ভাবনা তোদের নেই। এখনও আট ঘণ্টা তেইশ মিনিট আটাশ সেকেন্ড। তোর প্লেনে চড়ে বড় জোর দেড় ঘণ্টার মধ্যেই রেই-বৌবায় পৌঁছে যাব। তারপর ট্রাস্টিদের অপিসে পৌছোতে বড় জোর আধ ঘন্টা।ক্যাপেলা আমাদের যন্ত্রণা দিতেই যেন করুণ স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে শোনালে।
এবার হেসে উঠলাম, বললাম, হিসেবে আপনার যে একটু ভুল হচ্ছে, সেনর ক্যাপেলা। ও-প্লেনে একটু কারসাজি না করে কি আর আমি নেমেছি! এরোপ্লেনের কলকবজার ব্যাপারে ওস্তাদ না হলে সে কারসাজি ধরে প্লেন চালাতে কেউ পারবে না।
এবার ক্যাপেলাই হেসে উঠে বললে, সেই ওস্তাদই আমি। প্লেনের মিস্ত্রি হয়ে দুবছর তোর ওই ফক্কার প্লেনের কারখানাতেই কাজ করেছি। ও-প্লেন খুলে ফেলে আবার জুড়তে পারি।
শুনে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠলেও বাইরে হাসিমুখে বললাম, কিন্তু যত বড় মিস্ত্রিই আপনি হন, আপনার এই শরীরে একা একা ও-প্লেন পাঁচ ঘণ্টার আগে চালু করতে পারবেন না যে!
তাতেও যা সময় থাকবে তা যথেষ্ট। কিন্তু সে ভাবনা তোদের নয়। এখন যা চাইছি তা দিবি কি না।
এত করে চাইছেন, আর না দিয়ে পারি! তবে আপনাকে একটু কষ্ট করে কাছে এসে হাতে হাতে নিতে হবে!
হুঁ, ক্যাপেলার মিহি গলা যেন ছুরির ডগা হয়ে উঠল, জ্যান্ত কবরই তোরা চাস বুঝলাম।
ক্যাপেলা টলতে টলতে চলে গেল। তারপর তার ছুঁড়ে-ফেলা গ্রেনেড ফাটার সঙ্গে গুহার ছাদের বিরাট সব পাথরের চাঁই ধসে পড়ে সত্যিই আমাদের জীবন্ত কবর।
আমরা অবশ্য তখন গুহার পেছন দিকে যতদূর সম্ভব সরে গেছি।
পাথর পড়া বন্ধ হবার পর এগিয়ে এসে পরীক্ষা করে দেখে বুঝলাম বড় বড় পাথরের চাঁইয়ের মধ্যে সামান্য যা ফাক কোথাও কোথাও আছে তা মাছি গলবার বেশি সত্যিই নয়। সে সব পাথর আমাদের দুজনের পক্ষে সরানোও অসম্ভব।
হ্যাভারস্যাক থেকে মিহি জালের ঢাকনি দেওয়া কৌটোটা এবার বার করলাম।
তারপর পাথরের একটা ফাঁকে কৌটোর মুখটা ধরে জালের ঢাকনিটা নিলাম সরিয়ে।
লার্বো আমার কাণ্ড দেখে হতাশ স্বরে বললে, তোমার মাথা কি এর মধ্যেই খারাপ হয়ে গেল, দাস। তিলে তিলে এই কবরে মরতে হবে জেনেও তুমি খেলা করছ। এসময়ে!
হেসে বললাম, আর কিছু যখন করবার নেই তখন খেলাই তো ভাল। এই খেলাই ভানুমতীর খেল হয়ে উঠতে পারে তো।
কিন্তু ভানুমতীর খেলের কোনও লক্ষণই আর দেখা যায় না। এক ঘণ্টা দু ঘণ্টা করে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা কেটে যাবার পর পাথরের ফাঁকে কান লাগিয়ে যে ক্ষীণ আওয়াজ পেলাম তাতে বুকটা আরও দমে গেল।
ক্যাপেলা সত্যিই আমার প্লেনের কারসাজি ধরে সারিয়ে সেটা চালিয়ে চলে যাচ্ছে।
আরও আধ ঘণ্টাটাক যাবার পর যখন সব আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছি তখন হঠাৎ পাথরের দেয়াল ভেদ করেও বাইরে বন্যার গর্জনের মতো একটা প্রচণ্ড আওয়াজ কানে এল। সমুদ্রের বন্যা নয়, মানুষের।
হুইসিলটা হ্যাভারস্যাকেই ছিল। সেটা বার করে পাথরের ফুটোয় ঢুকিয়ে সজোরে বাজালাম।
তারপর দুশো জোয়ানের শাবলে আর গাঁইতিতে পাথরের চাঁই সরিয়ে ফেলতে ঘন্টা দুয়েক লাগল মাত্র।
আমার হাউসা মোড়ল তাদের প্রবাদের মান রেখেছে। আফ্রিকার আশ্চর্য আদ্যিকালের বেতার-ডাক তাদের টমটম ঢাক বাজিয়ে খবর দিয়ে মান্দার পাহাড়ের কাছের এক গাঁ থেকে দুশো জোয়ান পাঠিয়েছে আমার সাহায্যে।
ওই হিজিবিজি প্রবাদের এত দাম! শিবু হঠাৎ বেয়াদবি করে বসল।
ঘনাদার ভুরু কুঁচকোতে গিয়ে করুণাতেই যেন ক্ষান্ত হল। না, হিজিবিজি নয়, ও প্রবাদের মানে হল দুশমন যদি শয়তানির বীজ বোনে তাহলে কাস্তে লাগাও তার বিষ ঝাড় কাটতে। বলে বুঝিয়ে ঘনাদা আবার শুরু করলেন, জ্যান্ত কবর থেকে বেরিয়ে এসে ড লার্বো কিন্তু খুশি হওয়ার বদলে একেবারে ভেঙে পড়ল। হতাশ ভাবে বললে, প্রাণে বাঁচলাম বটে, দাস, কিন্তু মনে হচ্ছে ওই গুহার মধ্যে মরাই উচিত ছিল। বাবার গুপ্তধন আর উদ্ধার হল না। উড়ে গেলেও আর রেই-বৌবায় পৌঁছে চুক্তির শর্ত রাখতে পারব না।
