সত্যি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে বললাম, তার মানে লার্বো সময়ের দাম বুঝতে চাইছেন না এখনও! কোথায় তিনি?
সামনের পাহাড়ে ওই মস্ত বড় গুহাটা দেখছেন। সোজা ওর ভেতর চলে যান। আমি একটু পরে আসছি!
সেই দিকেই যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে ফিরে তাকালাম।
তারপর ঠাণ্ডা গলাতেই বললাম, আপনি যেন প্লেনটায় উঠতে চান মনে হচ্ছে, সেনর ক্যাপেলা?
সেই রকমই তো বাসনা। করুশ স্বরে বললে ক্যাপেলা, জিপে করেই যাচ্ছিলাম, ভাঙাচোরা রাস্তা হলেও শ-আড়াই মাইল সময় মতো যাওয়া যেত। কিন্তু প্লেনটা যখন পাওয়া গেল তখন ছাড়া উচিত কি! উড়ে গেলে তো মাত্র শ-দুই মাইল।
হুঁ, গলাটা মধুর করেই বললাম, রেই-বৌবা পাহাড়েই যেতে চান নিশ্চয়। যেখানে এই অঞ্চলের মালিকের সেরেস্তা। লার্বোর নিজের লোক বলে তারা আপনাকে জানে। সুতরাং সময়ের মেয়াদ ফুরোবার আগেই গুপ্তধন দখলের কথা তাদের জানালে আপনার কাজ হাসিল হবে। তারা বিশ্বাসঘাতক বলে আপনাকে সন্দেহ করবে না। কিন্তু প্লেনে যে যাচ্ছেন গুপ্তধন তো দেখছি না। আসল মালই না থাকলে দাবি দিয়ে লাভ কী?
সে ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না। ক্যাপেলা মিহি সুরে জানালে, আপনি বোধহয় খবর রাখেন না যে আগেকার মালিক মারা যাবার পর তার সম্পত্তি এখন এক ট্রাস্টের জিম্মায়। সেই ট্রাস্টের সঙ্গে এখানে আসবার আগে আমাদের কথা হয়ে গেছে যে শর্ত মতো নির্দিষ্ট সময়ের এক সেকেন্ড আগে দাবি জানাতে পারলেও তা গ্রাহ্য হবে তো বটেই, গুপ্তধন সরিয়ে আনবার জন্যেও একটা উপরি দিন পাওয়া যাবে। আর গুপ্তধন সঙ্গে না নিলেও এইটি আমি নিয়ে যাচ্ছি। আপনার বন্ধু অমন বেয়াড়া বলেই এটি হাত করতে এত দেরি হয়েছে।
ওটা তো দেখছি একটা চাবি! হেসে বললাম, গুপ্তধনের সিন্দুক আছে নাকি এখানে।
সিন্দুক নয়, ইস্পাতের তৈরি গুপ্ত এক ঘর। আঁদ্রে লার্বো প্রথম মহাযুদ্ধের কিছু আগে বিপদের দিন আসছে বুঝে গোপনে এক ইস্পাতের দুর্ভেদ্য দরজা দেওয়া লুকোনো ঘরটি এই পাহাড়ের এক গোপন গুহায় তৈরি করান। তার ভেতরই তাঁর সমস্ত ঐশ্বর্য লুকোনো। এ-ঘরের উড়ো খবর আমি জানতাম, কিন্তু আসল হদিস পাইনি বলে কিছু করতে পারিনি। তারপর ভাগ্য কী ভাবে ড. লার্বোর সঙ্গে আমার যোগাযোেগ করিয়ে দেয় তা তো আপনিও জানেন।
বাঃ, আপনার মতো সহজ সরল শয়তান আমি কখনও দেখিনি। কিন্তু শয়তানদেরও কখনও কখনও কথার ঠিক থাকে। আপনি যেন গুপ্তধনের ভাগ নেবেন না বলেছিলেন মনে পড়ছে। সেকথার খেলাপ তো করছি না।করুণ ভাবে হাসল ক্যাপেলা—ভাগ তো নয়, গুপ্তধনের সবটাই আমি নেব যে!
হ্যাঁ, তাহলে কথার খেলাপ হয় না বটে। চাবিটা খুশি হয়ে ড, লার্বো আপনাকে দিয়েছেন বলে কিন্তু মনে হচ্ছে না।
না, তা দেননি।কাঁদোকাঁদো ভাবেই জানালে ক্যাপেলা, একটু পেড়াপিড়ি করতে হয়েছে। দুর্বল মানুষ একটু জখম হয়েছেন তাইতে। ওই গুহার ভেতর তাড়াতাড়ি গেলে হয়তো শুশ্রুষা করতে পারবেন।
কিন্তু চাবিটা তাঁকে ফেরত দিতে চাই যে!কাঁধের হ্যাভারস্যাকটা মাটিতে রেখেই বললাম, ওটা নিজে থেকে দিলেই বাধিত হব। আমার আবার তাড়াতাড়ি করতে গেলে হাতপাগুলো বশে থাকে না। তখন আপনারই শুশ্রুষা দরকার হবে।
না, তা বোধহয় হবে না। মুখখানা যেন কাঁচুমাচু করে জানালে ক্যাপেলা, আরশোলা টিকটিকি আমি পারতপক্ষে ছুঁই না, কিন্তু ছুঁলে আঙুলের টিপুনিতেই মারা যায়। আমার দুঃখের ইতিহাস আপনি বোধহয় জানেন না। দুনিয়ার সেরা মুষ্টিযোদ্ধা হয়তো হতে পারতাম, কিন্তু রাস্তার ঝগড়াঝাঁটিতে দুটো মানুষকে সাবাড় করার দরুন হুলিয়ার ভয়ে নাম ভাঁড়িয়ে এই আফ্রিকায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। এখানে একটা ছুঁচো মারলে অবশ্য হুলিয়ার ভয় নেই।
না, ভয় যা-কিছু থোঁতা মুখ ভোঁতা হবার। সবিনয়ে যেন গলবস্ত্র হয়ে বললাম, আপনার মতো খাঁটি নির্ভেজাল শয়তানের সে দুর্দশা আমায় দিয়ে করাবেন না।
চমৎকার! আপনার গলায় যেন মধু ধরে পড়ছে। ক্যাপেলা করুণ স্বরে বললে, আসুন, আপনার গলাটা একটু টিপে দিয়ে দেখি অত মধু কোথায় আছে।
ক্যাপেলা যেন আলিঙ্গন করতে এগিয়ে এল।
বার তিনেক একটু কষ্ট করতে হল। শেষবার ঘাড়মুড় গুঁজড়ে পড়ল প্রায় প্লেনটার চাকার তলায়।
হ্যাভারস্যাকটা আবার কুড়িয়ে নিয়ে চাবিটা তার পকেট থেকে তুলে বললাম, ঘণ্টা কয়েক এখন খোলা হাওয়ায় বিশ্রাম করতে পারবেন মনে হচ্ছে। ভাববেন না, হাত-পা খুঁজে নিয়ে আপনি ওঠবার আগেই ফিরে আসছি। দড়ি দড়ায় বেঁধে আপনার সম্মানটা তাই আর বাড়ালাম না।
সেই একটিমাত্র ভুলেই সর্বনাশটা হল।
গুহার ভেতর গিয়ে লার্বোকে পেলাম প্রায় সসেমিরে অবস্থায়। অনেক চেষ্টায় সুস্থ করে তোলবার পর তার মুখে যা শুনলাম তা ইতিমধ্যেই কল্পনা করে নিয়েছিলাম। মান্দারা পাহাড়ের এই অঞ্চলে আসবার কিছুদিন বাদেই ক্যাপেলার ভাবগতিক দেখে লার্বোর সন্দেহ হয়। গুপ্তধনের খোঁজ করবার হদিস লার্বো তাই কিছুতেই জানায়নি। এমনকী সে-গুপ্তধনভাণ্ডার একা একা নানা সুযোগে খুঁজে বার করবার পরও ক্যাপেলার কাছে তা লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু যত দিন গেছে ক্যাপেলা তত অস্থির হয়ে উঠেছে। লার্বোকে চোখে চোখে রেখেছে সারাক্ষণ। লার্বো ঠিক করেছিল কোনওমতে লুকিয়ে পালিয়ে গিয়ে তার দাবি পাকা করবে। কিন্তু ক্যাপেলা সে সুযোগ দেয়নি। ওই দিনটিতে সে কিন্তু আরও গভীর শয়তানি বুদ্ধি খাটিয়েছিল। ক্যাপেলার পাহারা সেদিন যেন আলগা মনে হয়েছিল লার্বোর। সেই সুযোগে পালাবার চেষ্টা কয়বার সময়েই লার্বোকে চাবি সমেত সে ধরে ফেলেছিল এই তক্কেই ছিল বলে। তারপর লার্বোর মতো একটা ক্ষীণজীবী মানুষের কাছে চাবি কেড়ে নিতে কতক্ষণ। চাবি নিয়ে জিপে করে ক্যাপেলা যখন রওনা হচ্ছে ঠিক সেই সময়েই এসে পড়েছি আমি।
