তা দিয়ে গেছেন। ড. লার্বো হতাশ ভাবে বললেন, কিন্তু এই ভাঙা শরীর নিয়ে একলা সেই অজানা বিপদের দেশে গুপ্ত ঐশ্বর্য সন্ধান আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তা ছাড়া বলেছি তো আমি সর্বস্বান্ত। এই সুদানে এসেছি আমেরিকার এক মিউজিয়মের টাকায়। এখানে থেকে ক্যামেরুনসে যাবার আর এক বছর ধরে মান্দারা পার্বত্য অঞ্চলে খোঁজ করবার মতো সম্বলই আমার নেই।
যা বলতে যাচ্ছিলাম তা আর বলা হল না। আমার আগেই করুণ মুখে ক্যাপেলা বললে, যদি সহায় সম্বল দুই-ই আপনি পান ড. লার্বো?
সহায় সম্বল দুই-ই! ড. লার্বো একটু হতভম্ব হয়ে ক্যাপেলার দিকে তাকিয়ে বললেন, তার মানে…
তার মানে, আমি আপনার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত, ড. লাবো। আপনার যা খরচ লাগে তা-ও জোগাতে!
আপনি সত্যি আমায় এই সাহায্য করবেন, সেনর ক্যাপেলা! ড. লার্বো উচ্ছ্বসিত হয়ে ক্যাপেলার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।
তাকে বাধা দিয়ে ক্যাপেলাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি ভাল করে বুঝেসুঝেই ড. লার্বোকে সাহায্য করতে যাচ্ছেন তো, সেনর ক্যাপেলা?
বোঝবার এমন কী আছে! ক্যাপেলা করুণ মুখে হেসে বললে, ড, লার্বোর বাবা আঁদ্রে লাববার আমি একজন ভক্ত ছিলাম। ছেলে বয়সে আফ্রিকা সফরে একবার তাঁর সঙ্গী হবার সৌভাগ্যও হয়েছিল। দেখতেই পাচ্ছেন আফ্রিকার পুরোনো জিনিস খুঁজে বার করা আমার ব্যবসা। বাতিকও বটে। আঁদ্রে লার্বোর সম্মানে সেই বাতিকেই না হয় কিছু সময় আর পয়সা খরচ করলাম!
খুশি মুখে বললাম, খুব ভালো কথা। আঁদ্রে লার্বোর গুপ্তধন কী তা জানি না, কিন্তু তা পাওয়া গেলে ভাগ চাইবেন না তো?
না, ভাগ আমি চাইব না, ষণ্ডামাকা ক্যাপেলা কাঁদোকাঁদো গলায় বললে, ভাগ আমি চাইব না, দিব্যি গেলে বলছি।
লার্বোর আর তর সইছিল না। ক্যাপেলাকে সঙ্গীসহায় পেয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই আফ্রিকার পুর থেকে একেবারে পশ্চিম প্রান্তে ক্যামেরুনসে রওয়া হয়ে গেল। যাবার আগে আমার দু-একটা পরামর্শ নিয়ে কথা দিয়ে গেল যে ফলাফল যা-ই হোক এক বছরের মধ্যে খবর একটা দেবেই।
কিন্তু খবর আর আসে না। তাদের সুদান থেকে ক্যামেরুনস যাবার সময়টা মোটামুটি বাদ দিয়ে এক বছর পূর্ণ হতে যখন হপ্তা দুয়েক মাত্র বাকি, তখন আর ধৈর্য ধরতে না পেরে নিজেই রওনা হয়ে পড়লাম। প্রথমে বাইট অফ বিয়াফ্রা, অর্থাৎ বিয়াফ্রা উপসাগরের ধারে দৌয়ালা শহরে নামলাম। সেখান থেকে নতুন রাজধানী ইয়াওন্দে-তে। সেখানে একটা ছোট প্লেনের ব্যবস্থা টেলিগ্রামেই করিয়ে রেখেছিলাম। প্লেনটা নিয়ে মান্দারা পাহাড় অঞ্চলেই সোজা যেতে পারতাম। কিন্তু তার বদলে প্রথমে মাঝামাঝি রেই-বৌবা শহরে নেমে হের ব্রান্টের আস্তানায় একবার গেলাম। ব্রান্ট আমার অনেক কালের চেনা বন্ধু। আফ্রিকায় তার সঙ্গে বিরল অজানা প্রাণীর খোঁজে কয়েকবার ঘুরেছি। আপাতত সে রেই-বৌবা শহরকে ঘাঁটি করে আশপাশে জীববিজ্ঞানের সন্ধান চালাচ্ছে জানতাম। ব্রান্টের সঙ্গে আলাপ সেরে ল্যামি দুর্গের কাছে একটি হাউসাদের গ্রামে নেমে আমার পুরোেনো বন্ধু মোড়লের সঙ্গে একবার দেখা করে এলাম। সেখান থেকে প্লেনে উঠে মান্দারা পাহাড়ের দিকে রওনা হবার আগে ফেন অর্থাৎ মোড়লকে শুধু বলে এলাম, ইদান মুগুন মুতুম ইয়া শিরকা জানবা, কাই কা স লাওজে কা ইয়াঙ্কে!
মোড়লকে ওই সব আপনি বললেন! আর শুনেও আপনাকে ছেড়ে দিলে!
বেটপকা শিবুর এই কথায় আমাদের কাশি যদি হঠাৎ সংক্রামক হয়ে ওঠে তাহলে বোধহয় খুব দোষ দেওয়া যায় না।
ঘনাদার মুখের চেহারা দেখে গৌরই প্রথম সামলে নিয়ে ভালমানুষ সাজলে, ওটা ওই হাউসা ভাষা? না ঘনাদা?
হ্যাঁ, হাউসাদের একটা প্রবাদ! ঘনাদা কিছুটা যেন তুষ্ট হয়ে প্রবাদটা ব্যাখ্যা না করেই বললেন, মান্দারা পাহাড়ের কোলে প্লেন নামাতে তারপর বেশ বেগ পেতে হল। পাহাড়ি জায়গা। সমতল কোথাও নেই বললেই হয়। তার মধ্যে ওপর থেকে একটা জিপ গোছের গাড়ি এক জায়গায় দেখে লার্বো আর ক্যাপেলার আস্তানা কাছাকাছি হতে পারে বলে অনুমান করেছিলাম। নামবার পর দেখলাম আমার অনুমানে ভুল হয়নি। প্লেন থেকে মাটিতে পা দিতেই প্রথম অভ্যর্থনা করলে স্বয়ং ক্যাপেলা। প্লেন দেখে জিপটা চালিয়েই সে ছুটে এসেছে। কাছে এসে তার মার্কামারা করুশ স্বরে বললে, আপনি সত্যিই অন্তর্যামী, দাস।
একেই লড়াইয়ে ষাঁড়ের মতো শরীর, তার ওপর এক মুখ দাড়ি-গোঁফ গজিয়ে আর এই পাহাড়ি মরুর রোদে জলে পোড় খেয়ে ক্যাপেলার চেহারা একেবারে দুশমনের মতো হয়েছে। কিন্তু চোখ মুখ গলার স্বর সেই করুণ।
হেসে বললাম, কেন বলুন তো! আপনাদের ডেরা ঠিক চিনে নেমেছি বলে?
না, বুদ্ধি করে প্লেনটায় এসেছেন বলে। একটা প্লেনই চাইছিলাম।
হ্যাঁ, আপনার মেয়াদ তো ফুরিয়ে এল! হাতে আর কত সময় আছে?
বারো ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট আটাশ সেকেন্ড! কাঁদো কাঁদো সুরে বললে ক্যাপেলা।
একটু অবাক হয়ে বললাম, সময়টার ঠিক হিসাব রেখেছেন? ১৯০৩ সালের চুক্তি মনে আছে?
খুব মনে আছে। ক্যাপেলা করুণভাবে আশ্বাস দিলে, সময়ের হিসেব একেবারে কাঁটায় কাঁটায় রেখেছি।
একটা কথা বলতে গিয়েও থেমে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে এখনও আপনারা হাত গুটিয়ে বসে আছেন কী বলে? সময় তো মাত্র এই!
সেইটে আপনার বন্ধু ড. লার্বোকে বোঝাতে পারেন? ক্যাপেলার গলায় যেন করুশ মিনতি।
