যাকে সুস্থ-সবল জোয়ান দেখেছিলাম ভেঙেপড়া কুঁজো এক আধবুড়ো চেহারায় তাকে আর চিনব কী করে! লার্বো নিজে থেকে এসে পরিচয় দেবার পর শুধু তার চেহারা দেখে নয়, আরও অনেক কিছুতেই অবাক হয়েছিলাম।
তখন সুদানিদেরই একটা আধা হোটেল আধা সরাইয়ে আছি। একাধারে হোটেলের খানসামা ও বাবুর্চি ওসমান এসে খবর দিলে, দুজন সাহেব আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
দুজন এসে ঘরে ঢোকবার পর কাউকেই চিনতে পারলাম না। একজনের হেভিওয়েট বসারের মতো বিরাট চেহারা। আর একজন শুকনো শীর্ণ বুড়োটে মানুষ।
বুড়োটে মানুষটিই প্রথম সম্ভাষণ করে বললে, আমায় চিনতে পারছেন না নিশ্চয়, মি. দাস। আমার সঙ্গে প্যারিসে আপনার দেখা হয়েছিল কয়েকবার। আমার নাম ড. লার্বো।
সত্যিই প্রথমটা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। লার্বোর কাছে তার কাহিনী শোনবার জন্যে উদগ্রীব হলেও আপাতত তার আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার কারণ জানতে চাইলাম।
কারণ আর কিছু নয়, আমায় দিয়ে একটা পুরোনো পুঁথির দাম যাচাই করানো। পুঁথিটা ষণ্ডামাকা ক্যাপেলাই অনেক কষ্টে নাকি সংগ্রহ করেছে। ড. লার্বো টুকিটাকি পুরোনো পাণ্ডুলিপি, হাতের শিল্পকাজ এই সবই এখন সংগ্রহ করে নানান মিউজিয়মে আর খেয়ালি বড়লোকদের কাছে বিক্রি করে। পুঁথিটা ক্যাপেলার কাছে সে কিনতে চায়। আমায় ওয়াদি ঘাজালে দেখে চিনতে পেরে একটু পাকা মতামত নিতে এসেছে।
পুঁথিটা নাড়াচাড়া করে হেসে বললাম, কেনবার তো অনেক কিছু আছে ড. লাবো। এ-পুঁথি না-ই বা কিনলেন?
কেন, এ-পুঁথির দাম নেই?ক্যাপেলা আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে জানতে চাইলে। পালোয়ানের মতো চেহারা হলেও মানুষটার মুখ-চোখের গড়ন এমন যে সব সময়েই করুণ দেখায়।
দুঃখের সঙ্গে বললাম যে, সস্তা কাগজে লিখে তেঁতুল জলে ভিজিয়ে রেখে পুরনো করা হয়েছে তার বেশি কিছু দাম ও-পুঁথির নেই। এ পুঁথির এরকম আরও দুটো নকল যে আমি দেখেছি তাও জানালাম।
বুদ্ধির গোড়ায় তখন আমাদেরও ধোঁয়া লেগেছে। চট করে ধরে ফেলে শিবুই সবার আগে বলে ফেললে, এই ইবন জুবেরের নকল পুঁথিই নাকি সেটা!
হুঁ, এই পুঁথিরই আরেক নকল! ঘনাদা বলতে শুরু করলেন, দুজনকে নকলের প্রমাণগুলো বুঝিয়ে দিয়ে লার্বোকেই জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু আপনার আসল কাজ ছেড়ে এসব বাজে মালের কারবারে এসেছেন কেন?
এসেছি মামলায় সর্বস্বান্ত হয়ে। দুঃখের সঙ্গে বললে লার্বো।
মামলাটা যে কী লার্বো তারপর আমার অনুরোধে বিস্তারিত ভাবে জানালে।
ক্যামেরুনস যখন জার্মানদের দখলে তখন ১৯০৩ সালে লার্বোর বাবা আঁদ্রে উত্তরের মান্দারা পাহাড়ের কাছে একটা পাহাড়ি জায়গা একজন জার্মানের কাছে লেখাপড়া করে ইজারা নেন। কেন যে ওই অখদ্দে জায়গা তিনি বেছে নিয়েছিলেন ইজারা নিতে তা কেউ জানে না। শুধু শেষবার চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হবার আগে ছেলের কাছে একটি চিঠির চিরকুট তিনি পাঠান। তাতে দু-লাইনে লেখা ছিল—আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ সম্পদ আমি মান্দারা পাহাড়ে আগলে আছি। যত তাড়াতাড়ি পারো, এসো।
কিন্তু তখন প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ক্যামেরুনস নিয়েও লড়াই চলছে ইংরেজ ফরাসির সঙ্গে জার্মানদের। সেখানে যাওয়া অসম্ভব। যুদ্ধ থামবার পর গোল কমবার বদলে বাড়ল। জার্মানির অধিকার ভাগ করে নিলে ইংরেজ আর ফরাসি। সরকারি কাগজপত্র সব নষ্ট হয়ে গেছে। ইজারার দাবি প্রমাণ করাই শক্ত। তবু লার্বো একবার ইংরেজ একবার ফরাসি সরকারের সঙ্গে মামলা লড়লে। মামলায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বার হল। জানা গেল লাববার বাবার ইজারা নেওয়া জায়গা গোড়াকার মালিক দাবি করছে। লার্বোর বাবা আঁদ্রে নাকি তাঁর কাছেই ইজারা নিয়ে পুরো দাম দেননি। ইজারা বাতিল হলেও কী ঐশ্বর্যের কথা আঁদ্রে জানিয়েছিলেন তার একবার খোঁজ করতে পারলেও হত। কিন্তু সে জার্মান মালিক মান্দারা পাহাড়ের ও-অঞ্চলে লার্বোকে ঢুকতে দিতেই রাজি নয়। এক সঙ্গে ফরাসি সরকার ও সেই দাবিদার গোড়াকার মালিকের সঙ্গে সর্বস্বান্ত হয়ে লড়ে একেবারে না হারলেও ফল যা দাঁড়িয়েছে তা হতাশ হবারই মতো।
সেটা কী রকম? অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
লার্বো তার উত্তরে যা জানাল তা অদ্ভুত শর্তের এক চুক্তি। ১৯০৩ সালে আঁদ্রে ইজারা নেন জায়গাটা। ঠিক সেই ১৯০৩-এর হিসেবে মাপা একটি বছরের জন্যে লার্বো একবার মাত্র সেখানে গিয়ে যা খোঁজ করবার করে আনতে পারবে। বছরের এক সেকেন্ড পার হয়ে গেলে সেখানকার কোনও কিছুতে, এমনকী একটা নুড়িতেও, আর তার অধিকার নেই।
তাহলে মাপা বছর বলতে কী বোঝাল? গৌর তার বিদ্যে একটু জাহির করবার সুযোগ ছাড়তে পারল না, তিনশো-পয়ষট্টি দিন পাঁচঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট ছেচল্লিশ সেকেন্ড!
ঘনাদা গৌরের দিকে এমন ভাবে তাকালেন যে নিজের তথ্য নির্ভুল প্রমাণ করবার জন্য একটু ক্ষুণ্ণ হয়েই তাকে স্বীকার করতে হল, আজই সকালে এ বছরের বর্ষপঞ্জিতে পড়লাম যে!
ও, আজ পড়েছ! গৌরের এমন একটা পাণ্ডিত্যকে যেন তাচ্ছিল্য করেই ঘনাদা আবার শুরু করলেন, সব কথা শুনে একটু অসন্তুষ্টই হলাম। বললাম, তা এই চুক্তির সুযোগই আপনি নিচ্ছেন না কেন! যে কোনও সময় থেকে শুরু করে পুরো এক বছর তো! এক বছর নেহাত কম সময় নয়। আপনার বাবা যে ঐশ্বর্যের কথা বলেছেন সত্যি যদি তা থাকে তাহলে এক বছরে খুঁজে আনতে পারবেন না! আপনার বাবা গুপ্ত ঐশ্বর্যের কিছু হদিসও নিশ্চয় আপনাকে দিয়ে গেছেন!
