বনোয়ারি এতক্ষণে শিঙাড়াগুলো ভাজিয়ে আনল বোধ হয়।
ঘনাদা একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন।
মৌলবি সাহেবকে অনেক আশা দিয়ে আমরাই এনেছিলাম।
তাহলে ভালই হয়েছে চলে এসে। মৌলবি সাহেবকে নিরাশ আর করতে হল । ঘনাদা এতক্ষণে মুখ খুললেন।
তার মানে! আমরা বিমূঢ়, ঘরের দরজা থেকে একটা কথা না বলে ফিরে এলেন। আর নিরাশ করা কাকে বলে!
ঘরে ঢুকলে আরও নিরাশ করতে হত! ঘনাদার উক্তি তাঁর গড়গড়ার ধোঁয়ার মতোই।
আমাদের হাঁ করা মুখগুলোর দিকে চেয়ে ঘনাদার করুণা হল কি না জানি না। দয়া করে একটু সবিস্তারে বললেন, নিরাশ করতে হত এই জন্যে যে ও-পুঁথি জাল। যত তেতোই হোক সত্যি কথাটা তো না বলে পারতাম না!
ও পুঁথি জাল!
আপনি জানলেন কী করে?
পুঁথি তো চোখেও দেখেননি।
শোনেননি পর্যন্ত তখন পুঁথির কথা।
জাল আর আসল পুঁথি কি শুকেই বোঝা যায়!
জাল পুঁথির গন্ধ পেয়েই চলে এলেন নাকি!
আমাদের প্রত্যেকের বিস্ময় নানা ভাবে নানা ভাষায় প্রকাশ পেল। ঘনাদা ততক্ষণ নির্বিকার ভাবে রাম টানে গড়গড়ার জলে তুফান তুলছেন।
আমাদের কথা শেষ হতেই এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে ঘনাদা যা বললেন তাতে আমরাও চতুর্দিকে শুধু ধোঁয়াই দেখলাম।
পুঁথির গন্ধে নয়, চলে এসেছি ঘরের দুর্গন্ধে! ঘনাদা কড়া গলায় জানালেন।
দুর্গন্ধে! আমরা তাজব—ও-ঘরে দুর্গন্ধ! রোজ সকালে দস্তুরমতো ফিনাইল দিয়ে ও-ঘর মোছা হয়। তার ওপর ফ্লিট দিয়েছি আধঘণ্টা আগে!
ওঃ, ফ্লিট দিয়েছ? ঘনাদা প্রায় তাঁর কলকের মতোই গরম হয়ে উঠলেন— তাই বিশ্রী বিদঘুটে প্রাণবারকরা দুর্গন্ধ!
বলেন কী, ঘনাদা। ফ্লিট তো মাছি তাড়াবার জন্য দিতে হয়। আপনি তো আর মাছি নন! মেসের সব ঘরেই তো ফ্লিট দিচ্ছি এখন। বর্ষায় যা মাছি বেড়েছে! আপনার ঘরেও তো আজ দেব।
আমার ঘরে ফ্লিট দেবে! ঘনাদা যেন তাঁর কলকের জ্বলন্ত টিকেই হয়ে উঠলেন, তার চেয়ে ঘরে আগুন দেবে বলল না!
ফ্লিট আর আগুন এক! আমরা একেবারে থ—ঘরের মাছি তাড়াতে আপনি চান না!
না। বজ্রগম্ভীর স্বরে বললেন ঘনাদা, তোমাদের ওই আধা বৈজ্ঞানিক বাতিক
আমার নেই। পোকা, মাকড়, মাছি-সব একেবারে দুনিয়া থেকে সোপার্ট করে দেবে, কেমন! এদিকে পোকা মারবার বিষে মানুষই জরজর হতে চলেছে-সে খোঁজ রাখো? জানো খাবারের জলে হাওয়ায় কী পরিমাণ বিষ ক্রমশ ছড়িয়ে যাচ্ছে।
লক্ষণ সব শুভ! পালে হাওয়া লেগেছে। এখন শুধু হালটা ঠিকমতো ধরতে পারলেই হয়।
জোয়ারের টানেই নৌকোর মুখটা ধরে রেখে বললাম, কিন্তু মাছি বাড়লে বড় জ্বালাতন করে যে!
করুক। ঘনাদা নির্বিকার—একটা কৃতজ্ঞতা তো আছে?
মাছির কাছে কৃতজ্ঞতা! আমাদের চোখ সব কপালে উঠেছে তখন।
হ্যাঁ, জ্যোতিষের একটু হিসাব, আর এই মাছি না হোক, এদেরই জাত-ভাইয়ের সাহায্য না পেলে-
ঘনাদা কথাটা শেষ করবার আগেই শিবু চটপট পূরণ করে দিলে, পৃথিবীর ইতিহাস উলটে লেখা হত।
হিমালয়টা হঠাৎ কাত হয়ে পড়ে যেত। সংশোধন করলে শিশির।
রুশ মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি যেত বানচাল হয়ে। গৌর তার সিদ্ধান্ত জানালে।
না। ঘনাদা গড়গড়ার নলটাকে সরিয়ে রেখে আমাদের দিকে অনুকম্পাভরে চেয়ে বললেন, ওসব কিছু নয়, ক্যামেরুনসের মান্দারা পাহাড়ের একটা গোপন গুহায় দুটো কঙ্কাল পাওয়া যেত!
কার ঘনাদা?
একটা ডা. লার্বোর আর একটা ঘনশ্যাম দাসের!
কী সর্বনাশ! ভুলে ফেলে আসছিলেন বুঝি!
হাসি চেপে শিবুর বেয়াড়া মন্তব্য সামলাতে চটপট যার যা মাথায় আসে বলতে হল।
গুহার মধ্যে মানুষখেকো জন্তু জানোয়ার ছিল বুঝি! শিশিরের জল্পনা।
কামড় দিতে গিয়ে নাকে মাছি ঢুকে নিশ্চয় হেঁচে ফেলেছিল! আমার বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
না, না গুহার ভেতর চাপা পড়েছিলেন। আর এক ঝাঁক মাছি এসে পাথরটা সরিয়ে দেয়। গৌরের সহজ সরল সমাধান।
প্রায় তাই!
আমাদের চোখগুলো ছানাবড়া করে তুলে ঘনাদা শুরু করলেন, তখন সুদানের বহু পুরোনো এক খ্রিস্টান মঠের ধ্বংসাবশেষ দেখবার জন্যে ওয়াদি ঘাজালে কিছুদিনের জন্য আছি। সেখানেই হঠাৎ একদিন ড, লার্বো আর লুইগি ক্যাপেলা দুজনের সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল। ক্যাপেলাকে আগে কখনও দেখিনি। ড. লার্বো আমার চেনা। তবু ড. লার্বোকে প্রথম চিনতেই পারিনি। প্রথম মহাযুদ্ধের আগে ফ্রান্সে তার সঙ্গে পরিচয়। তখন লার্বো বয়সে তরুণ। তার বাবার সঙ্গেই আফ্রিকার নৃতত্ত্ব বিষয়ে কাজ করে সবে ডক্টরেট পেয়েছে। তার বাবা মঁসিয়ে আঁদ্রে লার্বোর কোনও রকম পদবি-টবি ছিল না। কিন্তু পর্যটক পণ্ডিত হিসেবে তাঁর নাম তখন যথেষ্ট। বাবা আঁদ্রের ব্যাপার নিয়েই তাঁর ছেলে লার্বো আমার কাছে এসেছিল। আঁদ্রে বছর কয়েক আগে আফ্রিকায় পর্যটনে গেছেন। তারপর থেকে তাঁর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। এরকম নিরুদ্দেশ হওয়া তাঁর স্বভাব। কিন্তু এবার যেন বড় বেশিদিন নিখোঁজ হয়ে আছেন। আমি তখন সদ্য আফ্রিকারই ক্যামেরুনস থেকে ফিরেছি। তাই লার্বো আমার কাছেই কোনও খবর পাওয়ার আশায় এসেছিল।
বিশেষ কিছু খবর তাকে দিতে অবশ্য পারিনি। ক্যামেরুনস তখন জার্মানদের দখলে। সমুদ্রের ধারে দৌয়ালা তাদের রাজধানী। সেখানে আঁদ্রের সঙ্গে একবার দেখা আমার হয়েছিল বটে। ক্যামেরুনসের উত্তরে একটা কী জায়গা যেন তাঁর ইজারা নেওয়া আছে। সেইখানেই তিনি যাচ্ছেন বলেছিলেন। লার্বোর সঙ্গে সেদিন আরও অনেক কথাই হয়েছিল। আফ্রিকার নৃতত্ত্ব শুধু নয়, সেখানকার বহু লুপ্ত শিল্পকলা সম্বন্ধে তার জ্ঞান দেখে খুশিই হয়েছিলাম।
