শেষ কথাগুলো আমাদের দিকেই চোখ রাঙিয়ে।
ঘনাদা যেন নিরুপায় হয়ে বললেন, বেশ, আপনারাই যখন মানা করছেন তখন নামব না।
হঠাৎ আমাদের দিকে নজর পড়ায় যেন অবাক হয়ে বললেন, আরে, তোমরা অমন চুপটি করে বসে কেন? ভদ্রলোকেরা এসেছেন, চা জলখাবার আনাও। আর এই নাও হে শিশির, অনেকক্ষণ শুকনো মুখে আছো, একটা সিগারেট খাও।
শিশিরের কৌটো থেকেই ঘনাদা উদারভাবে তাকে একটা সিগারেট দান করলেন।
হ্যাঁ, এখনও সেই বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন!
মাছি
ঘনাদা চৌকাঠ পেরিয়েই থমকে দাঁড়ালেন।
আমরা সবাই অবাক।
ঘনাদা তারপর নাকটা বার দুই কুঁচকোলেন সেই সঙ্গে ভুরু জোড়াও।
আমরা উৎকণ্ঠিত।
ঘনাদা নাসিকাধ্বনি করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দিশাহারা।
আমরা শশব্যস্ত হয়ে তখন যে যার আসন থেকে উঠে তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছি। হতভম্ব হয়ে। ঘনাদার এ নাসিকা কুঞ্চন মোটেই শুভলক্ষণ নয়। এত ভেবে চিন্তে যে ফন্দি করা হয়েছে তা বুঝি শুরুতেই যায় ভেস্তে।
কিন্তু তাই বা কী করে হয়? ঘনাদার পঞ্চেন্দ্রিয় অতি তীক্ষ না হয় মানলাম, কিন্তু আমাদের যা মতলব তা তো ঘ্রাণে টের পাবার জিনিস নয়। ঘনাদা নাকে শুকেই কি তাঁর জন্য সাজানো ফ্যাসাদটা আঁচ করে ফেললেন!
এ সব চিন্তা নিমেষে আমাদের মনে তখন খেলে গেছে।
ঘনাদাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আমরা রহস্যটা বুঝতে ও তাঁকে আশ্বস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
কী হয়েছে, ঘনাদা!
কী হয়েছে? ঘনাদা যেন আসামির দিকে সরকারি কৌঁসুলির মতো তাকিয়ে ফেটে পড়লেন, এখানে দু-দণ্ড এসে বসতাম। তা-ও বন্ধ করতে চাও।
বলেন কী, ঘনাদা! আমরা সত্যিই আকাশ থেকে পড়ি।
আপনার বসবার জন্যই তো এত আয়োজন! বললে শিবু।
বনোয়ারি এখুনি এল বলে। গৌরের ইঙ্গিত।
হাত না পড়লে ফেরত। আমি সে ইঙ্গিত একটু মোটা করে দিলাম।
একেবারে বাদশাহি শিঙাড়া। শিশির সোজা বাংলায় ব্যাখ্যা করে দিলে, হাতের মুঠোয় ধরে না।
কিন্তু কোনও টোপেই কাজ হল না।
ও ছাইপাঁশ তোমরাই খেয়ো।বলে ঘনাদা একেবারে রাইট অ্যাবাউট টার্ন করে সোজা তাঁর তেতলার কুঠুরির দিকে পা বাড়ালেন।
আমাদের তখন চোখ কপালে উঠেছে।
হরি ময়রার দোকানের বাদশাহি শিঙাড়া ঘনাদার কাছে ছাইপাঁশ! জেগে আছি না ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি চিমটি কেটে বুঝি দেখতে হয়!
তবু ঘনাদার সঙ্গে খানিকটা যেতে হল শেষ চেষ্টা করতে।
আপনার জন্য সবাই যে বসে আছি, ঘনাদা! আমার করুণ নিবেদন।
মৌলবি সাহেব সেই কায়রো থেকে এসেছেন! শিবুর বেফাঁস বোকামি। কিন্তু সেটা সামলাবার দরকার হল না। তাতেই কাজ হবে বলে একটু যেন আশা পেলাম।
কে এসেছেন! ঘনাদা সিড়ির পয়লা ধাপ থেকে ফিরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
মৌলবি জিয়াউদ্দিন খাঁ। অবস্থা বুঝে শিশির একটু উসকে দিল। মিশরের আল আঝার থেকে আসছেন শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আমি সবিস্তারে জানাতে বিলম্ব করলাম না।
কেন? ঘনাদার গলার স্বরটা কেমন যেন কম্পিত মনে হল। সেটা ভয়ে না বিরক্তিতে বোঝবার চেষ্টা না করাই ভাল।
আপনি ছাড়া আর গতি নেই যে! গৌর ঘনাদাকে টঙে তোলবার ব্যবস্থা করলে, ইবন জুবেরের ও পরোনো পথির নইলে মানে-করবে কে?
ঘনাদার মুখের ওপর দিয়ে একটু ছায়া সরে গেল কি? ও, ইবন জুবের। বলে যে রকম ব্যস্ত হয়ে সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলেন তাতে বুঝলাম তাঁর স্মরণশক্তিটা একটু খুঁচিয়ে দেওয়া দরকার।
ভাগ্যে ইবন জুবেরের নামটা আপনার কাছে শুনেছিলাম! তাঁর পিছু পিছু নাছোড়বান্দা হয়ে উঠতে উঠতে বললাম, মৌলবি সাহেবকে সে গল্প বলতেই উনি তো একেবারে আহ্লাদে আটখানা!
ঘনাদা ততক্ষণে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও।
রিলে রেসের মতো আমার কথার খেই ধরে গৌর শুরু করে দিলে, ইবন জুবেরের নিজের হাতে লেখা একটা দুষ্প্রাপ্য পুঁথি আপনাকে দিয়ে একটু পড়িয়ে নেবার জন্যে মৌলবি সাহেব অনেক আশা করে এসেছেন।
হুঁ, বলে ঘনাদা তাঁর গড়গড়ার কলকো তুলে নিয়ে তাতে টিকে সাজাতে ব্যাপৃত হলেন।
আপনার সঙ্গে আমরা অমন অভদ্রের মতো চলে আসায় কী ভাবছেন কে জানে!
ঘনাদা নীরবে টিনের কৌটো খুলে টিকের ওপর অম্বুরী তামাক রাখলেন গুলি পাকিয়ে।
শুধু একবার পুঁথিটা একটু পড়ে দিয়েই যদি চলে আসতেন, আমাদের মান থাকত। বড় মুখ করে ডেকে এনেছি।
ঘনাদা দেশলাই জ্বেলে একটা টিকে ধরাতে তন্ময় হলেন।
আরবি তো আপনার বলতে গেলে ডালভাত। সেই নকল ইবন ফরিদের আরবি শুনেই তার বিদ্যের দৌড় আর শয়তানি কী রকম সেবার ধরে ফেলেছিলেন। হতভাগা নাম ভাঁড়িয়ে ইবন ফরিদের নাম চালাতে গেছল আপনার কাছে। মার কাছে মামার বাড়ির গল্প!
ঘনাদারই পুরোনো গল্পের নজির টেনে তাঁকে তাতাবার চেষ্টা করলাম।
ঘনাদার তাতবার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। তাঁর কলকেটাই ধরে উঠল তাঁর ফুয়ে।
পুঁথিটা নাকি সুদানের ওয়াদি ঘাজালের এক বহু পুরোনো খুদে পিরামিডে মৌলবি সাহেব পেয়েছেন। আমরাও কোনওরকমে ফু দিয়ে চললাম ঘনাদার ছাইচাপা আগুন জাগিয়ে তোলবার আশায়।
ঘনাদা গড়গড়ার ওপর কলকে বসিয়ে নলটা বাগিয়ে ধরে মৃদুমন্দ টান দিতে শুরু করলেন।
ইবন জুবের স্পেনের গ্রানাদা থেকে বাগদাদ যাবার পথে এ-পুঁথি নাকি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এতদিন বাদে সে-পুঁথি উদ্ধার হয়েও শেষে পড়বার লোকের অভাবে মাঠে মারা যাবে!
ঘনাদার নয়, তাঁর গড়গড়ার নলের আওয়াজই শুধু শোনা গেল।
