থানা পুলিশ! শিবু তাচ্ছিল্য ভরে উড়িয়ে দিলে, রাতদিন পুলিশ পাহারায় নিজেরাই জেলখানায় থাকব নাকি!
কিন্তু এ তো হেঁজিপেঁজির কথা হচ্ছে না, কে এখানে আছে তা দেশে দশে জানে। বিধানসভা কেঁপে উঠবে না তা হলে? দিল্লির পর্যন্ত টনক নড়বে না? গৌরের গর্জন।
তা নড়লেও লাভটা হচ্ছে কী! শিশিরের বিজ্ঞ বিশ্লেষণ, তখন তারা বলবে, ও ছাই করপোরেশন কেন, ঘনাদার জন্য রাজসভা, লোকসভাই তো হা-পিত্যেশ করে আছে। সেখানে চালান করে দিয়ে দিল্লির সাউথ কি নর্থ অ্যাভেনিউ-এর এমপি কোয়ার্টারে তুলতে চাইবে। ঘনাদা কি তাতে রাজি হবেন? সে সাধ থাকলে ওঁকে আটকাতে পারত কেউ? উনি নিরিবিলিতে অজ্ঞাতবাসে থাকতে চান বলেই না আমাদের এই অখদ্দে মেসে পড়ে আছেন।
কিন্তু এখানে থাকতে হলেও যে ইলেকশনে দাঁড়াতে হয়? গৌরের দুর্ভাবনা।
আর না দাঁড়ালেও ওদের জুলুমবাজি সইতে হয়! আমার দুশ্চিন্তা।
তা হলে উপায়টা কী? গৌরের ব্যাকুল জিজ্ঞাসা।
উপায় হল, শিবুর সুচিন্তিত বিধান, এ পাড়াই ছেড়ে দেওয়া। এমন পাড়ায় যাওয়া যেখানে এ-সব ঝামেলাই নেই, পাড়াপড়শিও এমন ওঁচা নয়।
এটা তো খুব ভাল বুদ্ধি! আমরা সকলে একসঙ্গে উৎফুল্লভাবে মাথা নেড়ে ঘনাদার দিকে তাকালাম।
কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা!
যাঁর হয়ে এত তর্কাতর্কি, বিচার-বিশ্লেষণ, তিনি যেন আমাদের মধ্যে থেকেও নেই। বাইরের দরজার দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় সিগারেটও প্রায় শেষ করে এনেছেন তখন নির্লিপ্ত উদাসীনভাবে।
অগত্যা জিজ্ঞেস করতেই হল, নতুন সেই বাড়িটাই কি তা হলে দেখব নাকি, ঘনাদা? এখনও চেষ্টা করলে হয়তো পাওয়া যাবে।
ঘনাদা এতক্ষণে মুখ খুললেন। কিন্তু যা বেরিয়ে এল তা দার্শনিক বুজকুড়ি। মানে, যেমন খুশি বোঝো!
বললেন, হ্যাঁ চেষ্টা করলে তো অনেক কিছুই পাওয়া যায়।
তার পরই হঠাৎ উত্থান ও আমাদের হতভম্ব করে রেখে প্রস্থান-শিশিরের সিগারেটের টিনটা সমেতই অবশ্য।
পরের দিন আরও কড়া দাওয়াইয়ের ব্যবস্থা করতেই হল। দলের সব কটি একেবারে বাছা বাছা। নিজেদের পাড়ার নয়। এধার ওধার নানা তল্লাট চষে চারটি যে চেহারা জোগাড় হয়েছে, সিনেমায় পেলে বোধ হয় তাদেরকে লুফে নেয়।
দশরথ শিবুর মামার বাড়ির পাড়ায় কুস্তি করে। ছোটখাটো একটি হাতি বিশেষ। কামানো মাথাটা ঘাড়ের মাংসের মধ্যে কখন ড়ুবে যাবে সন্দেহ হয়। কাত হয়ে ছাড়া গেরস্ত বাড়ির দরজা দিয়ে যেতে পারে না। আর দশরথের চেলা বিশে তারই কিঞ্চিৎ সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। এদের সঙ্গে পাল্লা ঠিক রাখতে নফর আর হাবুল দুজনে দুটি সিড়িঙ্গে সুপুরি গাছ।
দশরথ আর বিশের গায়ে মোটা খদ্দর, নফর আর হাবুলবাবুর কোঁচানো শান্তিপুরি ধুতি, কলিদার গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। চার জনের শুধু একটি মিল কানে শুনে যাচাই করে নেওয়া। সবাই এরা স্যামবাজারের সসিবাবু।
সাতসকালেই তারা আমাদের ফরমাস মতো এসে হাজির। আমরাও হন্তদন্ত হয়ে একেবারে তেতলার ঘরে।
কী হবে, ঘনাদা? ওঁরা যে এসে গেছে!
ঘনাদা সবে শিশিরের কালকের কৌটো থেকে একটি সিগারেট বার করে সামনে বনোয়ারির আনা চায়ের পেয়ালাটি নিয়ে মৌজ করতে বসেছেন।
আমাদের আর্তনাদে প্রথমে চমকে প্রায় লাফিয়েই উঠলেন। তারপর অবশ্য সামলে গিয়ে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কারা?
ওই সেই ইলেকশনের পাণ্ডারা। আমরা তখনও যেন হাঁপাচ্ছি, একেবারে দল বেঁধেই এসেছেন!
ওঃ! ঘনাদা চায়ের পেয়ালাটা তুলতে গিয়ে আবার নামালেন।
গলাটা যেন একটু ভারীই লাগল বেশ। মুখেও যেন আর-এক পোঁচ ছায়া।
উৎসাহিত হয়ে বললাম, পরে আসতে বলব, ঘনাদা? বলব যে বেড়াতে বেরিয়ে গেছেন?
তাতে কী লাভ হবে? গৌর আমার প্রস্তাব সংশোধন করলে, ওরা তো তা হলে মাটি কামড়ে বসে থাকবে ঘনাদার ফেরার অপেক্ষায়। চা সিগারেট জোগাতে আমরা ফতুর। তার বদলে বলি, ঘনাদার কাল রাত থেকে, কী বলে, খুব বাড়াবাড়ি অসুখ, নস্ট্যালজিয়া কি হাইড্রোফোবিয়া!
তোর যেমন বুদ্ধি! ঘনাদার কুটিটুকু দেখা দিতে না দিতেই শিবু গৌরকে ধমক দিয়ে সামলাল, ঘনাদার হাইড্রোফোবিয়া হতে যাবে কোন দুঃখে। ও-রোগ তো কুকুরে কামড়ালে হয়। আর নস্ট্যালজিয়া কি রোগ নাকি? ও তো নিজের বাড়ি কি আগেকার দিনের জন্য মন কেমন করা!
আহা কে অত বুঝবে! শুধু ইয়া দিয়ে যাহোক একটা হলেই হল! গৌর ভাঙবে তবু মচকাবে না, ওই ইয়া লাগালেই রোগ লোগ বলে মনে হয়। ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, নিউমোনিয়া, অ্যানিমিয়া, পায়োরিয়া..
থাক, থাক! শিশির ব্যস্ত হয়ে গৌরকে থামাল, একেবারে হাসপাতাল করে তুললি যে! এর পর তেলাপিয়া, বোগেনভিলিয়াও রোগ বলে মনে হবে।
কিন্তু ওদিকে ওরা নীচে দাঁড়িয়ে, সে খেয়াল আছে! শিবু স্মরণ করিয়ে দিলে, ওদের যা হোক একটা কিছু বলে বিদায় না করলে তো নয়!
ঘনাদার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে শিবু তার প্রস্তাবটা জানালে, বলে দিই, ঘনাদাকে কাল হঠাৎ গুয়াতেমালা যেতে হয়েছে। কবে ফিরবেন, ঠিক নেই।
গুয়াতেমালা কেন? শিশিরের আপত্তি, যাবার আর জায়গা নেই?
থাকবে না কেন! শিবু বোঝাবার চেষ্টা করলে, ঘনাদা তো ইচ্ছে করলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি যেখানে খুশি যেতে পারেন। কিন্তু শুনলে একটু ভড়কে যায় এমন জায়গায় যাওয়াই ভাল নয়?
যদি জানতে চায় গুয়াতেমালায় কেন? শিশির ফ্যাকড়া তুলল।
সেখানে যাকে বলে জাতীয় সংকট! জবাবটা যেন শিবুর জিভের ডগাতেই ছিল। রাজ্য টলমল। প্রেসিডেন্ট জরুরি তার করে প্লেন পাঠিয়ে দিয়েছে। ঘনাদা না গেলে কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে।
