ঘনাদা সত্যিই একটু কি গললেন নাকি?
ঠিক বোঝা গেল না। উলটো হাওয়া চালাতে হল তাই তৎক্ষণাৎ।
বললাম, কিন্তু এটা একটু বাড়াবাড়ি নয়? ঘনাদার মত না নিয়েই আগে থাকতে ওঁর নাম দিয়ে কাউন্সিলার হবার জন্য উনি প্রার্থী বলে দরখাস্ত করে দেওয়া!
শুধু তা-ই! শিবুও পোঁ ধরলে, রাস্তায় এরই মধ্যে ওগুলো সব!
শিশির যেন আকাশ থেকে পড়ল, রাস্তায় আবার কী হল?
ও, তা-ও বুঝি জানো না! শিবু বিজ্ঞ সাজল, ঘনাদার চোখেও কি আর পড়েনি! উনি তো এই মাত্র ফিরলেন।
আমরা উৎসুক ভাবে ঘনাদার দিকে তাকালাম। এইবার একটা সাড়া যদি পাওয়া যায়। কিন্তু না লাল, না সবুজ। এখনও শুধু হলদে। কোন দিকে যাবে বোঝবার জো নেই।
ঘনাদার সিগারেটের টানটা একটু লম্বা হল।
আবার খোঁচাতেই হল অগত্যা।
শিবুকে যেন ধমকে বললাম, হেঁয়ালি রেখে আসল কথাটা বলবি! কী হয়েছে
রাস্তায়?
এরই মধ্যে রাস্তায় পোস্টার পড়ে গেছে।
পোস্টার! আমরা যেন হতভম্ব, কীসের পোস্টার?
ঘনাদার জন্যে ভোটের, শিবু রহস্য তরল করলে, আজ শুধু দেয়ালে দেয়ালে খড়ি দিয়ে লিখেছে। কালই শুনলাম ছাপানো পোস্টারে এ তল্লাট ছেয়ে দেবে! তা স্লোগান কিন্তু দিয়েছে ভাল।
শিবুর গদগদ হওয়াটাকেই যেন সন্দেহ করে জিজ্ঞাসা করলাম, কী স্লোগান দিয়েছে?
দিয়েছে, শিবু সুর করে আওড়ালে,
দেশের নাড়ি বড় ক্ষীণ
ঘনাদাকে ভোট দিন।
ঘনাদার দিকে আড়চোখে চেয়ে আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করলাম, এ আর কী স্লোগান হল এমন!
আরও আছে শিবু আশ্বাস দিলে, যেমন,
সফেদ হবে লাল-চীন।
ঘনাদাকে ভোট দিন।
শিবুর স্লোগান শুনে গৌরেরও যেন নেশা ধরে গেল। বললে, তার চেয়ে আরও ভাল স্লোগান দিলেই পারত। যেমন,
ভোট দেবেন কাকে?
বিশ্ব-ঘনাদাকে!
কী করবেন তিনি?
কালো বাজার সাদা করে
সস্তা চাল তেল চিনি।
গৌর যদি এগোতে পারে আমিই বা পিছিয়ে থাকি কেন? বললাম স্লোগান আরও জবর হতে পারে!
কী রকম? গৌরের গলাটাই যেন একটু বেশি রুক্ষ।
বেশ কাঁপানো গলায় শোনালাম,
শুন শুন সর্বজন, শুন দিয়া মন
ঘনাদাকে ভোট দিতে কহি কী কারণ।
ঘোর কলিকাল এবে পাইতে উদ্ধার–
ঘনাদার স্কন্ধে হও দুঃখসিন্ধু পার।
ত্বরা করি ভোট দাও যে চাও তরিতে—
বিলম্বে হতাশ হবে ধন্দ নারি ইথে।
ছো? গৌরই সবার আগে সশব্দে তার মতামত জানালে। সঙ্গে সঙ্গে সবাই।
ওটা একটা স্লোগান হল?
একি পাঁচালি পেয়েছিস?
ভোটাররা ও স্লোগান শুনলে হাসতে হাসতেই ভোট দিতে ভুলে যাবে!
প্রতিভার আদর যে এ দেশে নেই তা অনেক কাল আগেই বুঝেছি। গুম হয়ে তাই চুপ করে রইলাম। কিন্তু নিজেদের মধ্যে খাওয়াখাওয়ি করে আসল কাজটা তো ভেস্তে দেওয়া যায় না!
সকলেরই বোধহয় সে হুঁশ হল। শিশিরই হাওয়াটা ঠাণ্ডা করবার জন্যে প্রথম বললে, যাক গে। ঘনাদা ইলেকশনে নামলে স্লোগান ঢের জুটবে। বাংলা দেশের বাঘা বাঘা কবিকে সব লাগিয়ে দেব। কিন্তু দেয়ালে দেয়ালে এখনই এই সব লেখা কি উচিত হয়েছে? আবার কাল বলছে, ছাপানো পোস্টার ছাড়বে! ঘনাদার মতটা তো তোর আগে নেওয়া উচিত ছিল।
মত নেবে ওরা! শিবু আসল রাস্তা ধরলে, ওদের তো চেনো না। ঠিক যখন একবার করে ফেলেছে তখন ঘনাদাকে ওরা দাঁড় করাবেই।
ঘনাদা যদি রাজি না হন তবু? গৌর যেন রেগে কাঁই। রাজি ঘনাদাকে হতেই হবে। না হয়ে উপায় নেই। শিবু নিজেই যেন নাচার।
একি জুলুম নাকি! এতক্ষণে অভিমানটা সামলে আমিও সুর মেলালাম।
জুলুম জবরদস্তি যাই বলল, দেয়ালে যখন খড়ির দাগ কেটেছে, ওরা ঘনাদাকে দাঁড় করিয়ে ছাড়বে না! শিবু সার কথা শুনিয়ে দিলে।
ঘনাদা এতক্ষণে একটা সিগারেট শেষ করে আর একটা ধরিয়েছেন শিশিরের এগিয়ে দেওয়া টিন থেকে। কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ তাঁর দিক থেকে শোনা যায়নি। চোখ দুটো মাঝে মাঝে কোঁচকানো ছাড়া কোনও ভাবান্তরও নয়।
কিন্তু এরকম শালগ্রাম শিলা হলে আমাদের তো চলবে না। আশেপাশে ঝোপঝাড় না নেড়ে একেবারে সোজাসুজি তাই খোঁচাতে হল।
আপনাকে তো দাঁড়াতেই হচ্ছে দেখছি, ঘনাদা!
আমাদের চার জোড়া চোখ যাকে বলে ঘনাদার মুখে নিবদ্ধ।
ঘনাদা সিগারেটের ছাই ঝেড়ে শুধু বললেন, হুঁ!
হু! শুনেই আমরা কিন্তু হাঁ। ঘনাদা বলেন কী! শেষে নিজেদের ফাঁসে নিজেরাই গলা গলিয়ে দিলাম নাকি!
তাড়াতাড়ি যা যা প্যাঁচ হাতে ছিল সব ছাড়তে হল।
অবশ্য ঘনাদাকে দাঁড় করাবার গরজ ওদের আলাদা। শিবু গম্ভীরভাবে জানালে।
কী গরজ? গৌর যেন অবাক।
ওদের দুজন কন্ট্রাক্টরকে কাজ পাইয়ে দিতে হবে। শিবু গোপন রহস্যটা ফাঁস করে দিলে যেন অনিচ্ছায়, আরবারে চুরির দায়ে তাদের নাম কাটা গেছল কিনা!
আর ওই চাঁইদের বাড়ির ট্যাকস কমানো! শিশির জোগান দিলে, দাড় করাবার কড়ারই তো তা-ই।
জন কয়েককে চাকরিও দিতে হবে। আমি জুড়ে দিলাম, শুনলাম এসবের মধ্যে বাঁ হাতের পাওনাও কিছু মিলবে!
তার মানে ঘুষ! আর ঘনাদা এতে রাজি হবেন! গৌরের গলায় আগুনের জ্বালা।
না হলে যে ছাড়ানছিঁড়েন নেই! শিবুর হতাশ মন্তব্য।
কেন, সাফ না বলে দেবেন। কী, করবে কী ওরা! গৌর রোখ দেখাল।
কী করবে! শিবুর মুখে যেন আতঙ্কের ছায়া, এ-পাড়ায় তা হলে বাস করতে পারব? রাস্তা দিয়ে হাঁটা যাবে না। চাকর পালিয়ে যাবে, ইলেকট্রিকের লাইন কাটা যাবে। দিন নেই, রাত নেই, মেসে ঢিল পাটকেল পড়বে। তারপর বোমা-ই বা ফেলতে কতক্ষণ!
একি মগের মুল্লুক নাকি! একটু প্রতিবাদ জানাতেই হল, থানা পুলিশ নেই?
