তা বলা যায় বটে! আমি প্রস্তাবটার পোকা বাছলাম, কিন্তু ঘনাদা তো আর ঘরবন্দী হয়ে থাকতে পারবেন না। এ পাড়ায় যাওয়া আসা করলেই ওদের চোখে পড়ে যাবে যে!
থাকবেন কেন এ পাড়ায়? শিবুর সহজ সমাধান, কালই আমরা রাতের অন্ধকারে নতুন পাড়ায় নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠছি। তখন আর আমাদের নাগাল পাবে কে? তা হলে ওই গুয়াতেমালাতেই আপনি গেছেন, কী বলেন ঘনাদা?
না! ঘনাদা আমাদের একেবারে বসিয়ে দিয়ে বললেন, ওঁদের নীচে বসাও, আমি যাচ্ছি।
ওঁদের মানে…আপনি…? আমাদের বাকবোধ হবার উপক্রম।
তবু শেষ আশায় ভর করে নীচে নেমে গিয়ে ভাড়াটে দলকে আর একটু তালিম দিয়ে দিলাম ঘনাদা আসবার আগে। তাদের বোলচালে যদি কিছু কাজ হয়।
প্রথমটা শুভ লক্ষণ-ই দেখা গেল।
এই যে, ঘনশ্যামবাবু! আসুন, আসুন! দশরথের বাজখাঁই গলার অভ্যর্থনা শুনেই ঘনাদাকে একটু যেন কাহিল মনে হল।
তার ওপর বিশের মন্তব্যে বেশ যেন ফ্যাকাশে। দশরথেরই কপি করা গলায় বিশে রীতিমতো মেজাজ দেখিয়ে বললে, অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছেন কিন্তু স্যার। কাউন্সিলার আপনাকে বানিয়ে দেব, কিন্তু আমাদের কাছে এসব চাল-ফাল চলবে না। আমরা গাছে তুলতেও জানি আবার মই কেড়ে নিতেও।
আহা, খ্যামা দে না, বিশে। দশরথই বিশেকে সামলাল, দেখছিস না, কাঁচা ইট, এখনও পোড় খায়নি। আপনি বিশের কথা কিছু ধরবেন না, ঘনশ্যামবাবু। ওর মেজাজটা বড় গরম! মুখ চালাতে কখন হাত চালিয়ে দেবে তাই আমি সামলে সামলে রাখি।
কিন্তু ঘনশ্যামবাবুর কাছে আমাদের আর্জিটা আগে পেশ করা দরকার নয় কি? বললেন নফরবাবু। যেমন তাঁর হাত জোড় করা বিনয়ের ভঙ্গি, তেমনই সরু-সুতো কাটা গলা।
আজি-ফার্জি আবার কীসের? বিশে গর্জে উঠল, আমরা ঠিক করেছি, ঘনশ্যামবাবুকে কাউন্সিলার বানিয়ে দেব, ব্যস, মামলা চুকে গেছে। উনি কি না বলবেন নাকি? ঘাড়ে তো দেখছি মাথা একটাই।
আঃ, ফের বিশে! দশরথ ধমক দিলে না আদর জানালে বোঝা গেল না, তুই বড় ফজুল বকিস! ঘনশ্যামবাবু আগে না বলুন তবে তো মেজাজ করবি? তারপর ঘনাদাকে মধুর আশ্বস, আপনি কিছু ভাববেন না, ঘনশ্যামবাবু। আমরা থাকতে আপনার কোনও ভাবনা নেই।
প্যাকাটি মার্কা হাবুলবাবু মিহি সুরে সায় দিলেন, আপনার গায়ে আঁচটি লাগতে দেব না আমরা। সব ঝঞ্জাট আমাদের, আপনার শুধু ওই হাজার দশেক যা খসবে!
হাজার দশেক খসবে, মানে? আমরাই যেন ঘনাদার জন্য কাতরে উঠলাম, ঘনাদাকে দশ হাজার টাকা দিতে হবে?
তা নয়তো কি মিনিমাগনা কাউন্সিলার হবেন নাকি? বিশে মুখ বেঁকিয়ে হেঁড়ে গলা ছাড়ল, হেঁড়া ন্যাকড়ায় শালের জোড়া! দশহাজার তো সস্তা, মশাই!
তা ঠিকই বলেছেন! একটা ভোটের লড়াই-এ দশহাজার তো নস্যি!
নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করব কি না বুঝতে না পেরে থ হয়ে গেলাম।
এ যে ঘনাদার গলা! ঘনাদা বলছেন, দশহাজার নস্যি!
না, কানের কি চোখের ডাক্তারের কাছে দৌড়বার দরকার নেই। ঘনাদাই তাঁর মৌরসি আরামকেদারাটিতে বসে শিশিরের সিগারেটের টিনটিই অতিথিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সহাস্য বদনে বলে চলেছেন, এত সস্তায় হবে আমি তো ভাবতেই পারিনি। দু-চার হাজার উপরি অবশ্য আমি ধরেই রাখছি।
আমাদের শুধু নয়, এবার ভাড়াটে দলেরও সকলের চোখই ছানাবড়া।
গৌর কোনওরকমে ঢোক গিলে তোতলাতে তোতলাতে বলল, আপনি…কী বলে…তা হলে ইলেকশনে দাঁড়াতে রাজি?
কী করি, বলো! নিজের পাড়ার লোক। এত করে ধরেছেন। সামান্য দশ-পনেরো হাজারের জন্যে ওঁদের নিরাশ করতে তো পারি না। কোটি কোটি টাকাই যখন যাচ্ছে তখন বোঝার ওপর ওই শাকের আঁটিটুকু সইতে পারব।
কথা বলব কি, আমাদের হাঁ করা মুখ আর বুজতেই চায় না। চোয়াল যেন আটকে গেছে।
ঘনাদাই ততক্ষণে নিজের একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলে আবার বললেন, শুধু ওই শুশুকগুলোর কথা ভাবছি।
কাদের কথা? সিড়িঙ্গে নফরবাবুর মিহিসুতোকাটা গলাটাই প্রথম কিচকিচিয়ে উঠল।
ওই শুশুকগুলোর! মানে, ম্যানাটি বললে তো আপনারা বুঝবেন না। তাই শুশুক বলছি। ডিমপাড়া মাছ নয়। ওই শুশুকের মতোই একরকম হাওয়ায় নিশ্বাস নেওয়া স্তন্যপায়ী জলের জানোয়ার! তবে খায় শুধু নিরামিষ, জলের পানা-টানা, দাম-শ্যাওলা—এই সব।
তাদের কথা ভাবছেন কেন? এবার বিশের হেঁড়ে গলা, কিন্তু কেমন যেন একটু ধরা ধরা, ভ্যাবাচাকা খাওয়া।
ভাবছি, ওগুলোকে জংলিরা সব সাবাড় করে দেবে বুঝতে পেরে। ঘনাদার একটু দীর্ঘনিঃশ্বাস।
জংলিরা শুশুকগুলো সাবাড় করে দেবে প্যাকটি মার্কা হাবুলবাবু একেবারে থ। শুশুকগুলো আপনার?
হ্যাঁ, আমারই বলতে পারেন। আর কাপলান-এর।
কাপলান! কাপলান কে? পিপের দোসর বিশের হাঁ করা প্রশ্ন।
কাপলান আমার বন্ধু আর অংশীদারও বটে! সে-ই এখন ব্রিটিশ গায়নার ঘাঁটিতে কাজ করছে আমার হয়ে।
কী কাজ? ও! শুষ্ক চরানো? সিড়িঙ্গে নফরবাবু ধরা গলায় শুধোলেন।
তা-ও একরকম বলতে পারেন।
তা হলে জংলিরা শুশুকগুলো সাবাড় করবে কেন? বিশের ব্যাপারটা বুঝবার প্রাণান্ত চেষ্টা।
সাবাড় করবে কাপলান আর ওখানে থাকবে না বলে! আমার এ-খবর তার কানে গেলে সে সোজা উঠবে গিয়ে হাইতিতে! ঘনাদা অতি সহজ করে বোঝালেন।
কোথায়! মূর্তিমান জালা দশরথের হাবুড়ুবু খাওয়া অবস্থা।
হাইতিতে! ঘনাদা ধৈর্যের অবতার হয়ে বোঝালেন, হাইতির নাম শুনছেন কিনা জানি না। তবে আজকালকার খবরের কাগজে কিউবার খবর নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে। হাইতি আর কিউবা হল উত্তর আর দক্ষিণ আমেরিকার কোলের কাছে অতলান্তিক মহাসাগরের দুটো পাশাপাশি দ্বীপ। হাইতি অবশ্য একটা বড় দ্বীপের অংশ। ম্যাপে কিউবাকে গেলবার জন্য একটা কুমিরের মাথা যেন হাঁ করে আছে। দেখবেন। ওই মাথাটাই হল হাইতি আর বাকিটা ডোমিনিয়ন রিপাবলিক।
