কিন্তু বাইরে যা এনেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ এনেছিলেন পোলো তাঁর স্মৃতিতে বহন করে। জেনোয়া-র কারাগারে বসে সেই স্মৃতি-সমুদ্র-মথিত কাহিনীই তিনি মুগ্ধ শ্রোতাদের কাছে বলে যেতেন।
মুগ্ধ শ্রোতা কারা? না, শুধু তাঁর কারাসঙ্গীরা নয়, জেনোয়া-র অভিজাত সম্প্রদায়ের আমির-ওমরাহ পুরুষ-মহিলা সবাই। এই কারাকক্ষ তখন জেনোয়া-র তীর্থস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে রূপকথার চেয়ে বিচিত্র সুদূর ক্যাথের অপরূপ কাহিনীর মধুতীর্থ।
কিন্তু সাগর-সম্রাজ্ঞী ভেনিসের পরম শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পাত্র মার্কো পোলো জেনোয়ার কারাগারে কেন? সে অনেক কথা। দেশে ফেরবার মাত্র তিন বছর বাদে ভেনিস-এর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী জেনোয়া-র নৌবাহিনী লাম্বা দোরিয়ার নেতৃত্বে একেবারে আদ্রিয়াতিক সাগরে চড়াও হয়ে এল। আর সকলের সঙ্গে মার্কো পোলো গেলেন একটি রণতরীর অধিনায়ক হয়ে যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়েই আরও সাত হাজার ভেনিসবাসীর সঙ্গে তিনি জেনোয়ায় বন্দি হলেন।
জেনোয়া-র কারাগারে তাঁর মুগ্ধ শ্রোতাদের মধ্যে হেলে-পড়া মিনারের শহর পিসা-র এক নাগরিক ছিলেন। নাম তাঁর রাস্টিসিয়ানো। কাব্যের ভাষা প্রেমের কাহিনীর অপরূপ ভাষা হিসেবে ফরাসি তখনই ইউরোপে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। পিসার লোক হলেও সেই ফরাসি ভাষায় রাস্টিসিয়ানোর অসাধারণ দখল ছিল। মার্কো পোলোর অপূর্ব সব কাহিনী সেই ভাষায় তিনি টুকে রাখতেন।
তাঁর সেই টুকে রাখা কাহিনীই সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে তারপর। দেড়শো বছর বাদে জেনোয়া-র আর এক নাবিক সেই কাহিনীর ল্যাটিন অনুবাদ পড়তে-পড়তে, সিপার সোনায় মোড়া প্রাসাদচূড়া যেখানে প্রভাত-সূর্যের আলোয় ঝলমল করে সেই সুদূর ক্যাথের স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেছেন। সে নাবিকের নিজের হাতে সই করা ও পাতার ধারে ধারে মন্তব্য লেখা বইটি এখনও সেভিল-এর কলম্বিনায় গেলে দেখতে পাওয়া যায়। সেনাবিকের নাম কলম্বাস।
আরও প্রায় দু-শো বছর বাদে ড্যানিয়েল ডিফো মাদ্রিদ-এর এক টুকিটাকি শখের জিনিসের দোকানে রাস্টিসিয়ানোর অনুলিখিত এমনই আর-একটি পুঁথির সন্ধান পান। সেই পুঁথি থেকেই তেত্রিশ বছর বাদে রবিনসন ক্রুশোর গল্প তিনি গড়ে তোলেন।
মর্মরের মতো মস্তক যাঁর মসৃণ সেই শিবপদবাবু এবার বুঝি না বলে পারলেন না, কিন্তু রবিনসন ক্রুশো মেয়ে হলেন কী করে?
সান কাও চি-র যে-গল্প মার্কো পোলোর মুখে শুনে রাস্টিসিয়ানো টুকে রেখেছিলেন, তাতে মেয়ে বলেই তাঁকে বর্ণনা করা আছে। ড্যানিয়েল অবশ্য সেগল্পের নায়িকার নাম ও জাতি দুই-ই পালটেছেন।
মাথার কেশ যাঁর কাশের মতো শুভ্র সেই হরিসাধনবাবু বললেন, কিন্তু সেই পুঁথির গল্পটা কিছু শুনতে পারি?
সেই গল্প শুনতে চান? কিন্তু আসল কাহিনী অনেক দীর্ঘ, সংক্ষেপে তার সারটুকু আপনাদের বলছি শুনুন—
সুং রাজবংশের রাজধানী তখনও উত্তরের কাইফেং থেকে টাসুট দৌরাত্ম্যে কিত্সাই নগরে সরিয়ে আনা হয়নি। পৃথিবীর আশ্চর্যতম শহর হিসাবে কিনসাই-এর নাম কিন্তু তখনই মালয়, ভারতবর্ষ, পারস্য ছাড়িয়ে সুদূর ইউরোপে পর্যন্ত পৌঁছেছে। দ্বাদশ তোরণ ও দ্বাদশ সহস্র সেতুর এই নগরে চুয়ান উ নামে এক সদাগর তখন বাস করেন। সদাগরের মণি-মাণিক্য ধন-রত্নের অবধি ছিল না, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান যে-সম্পদ তাঁর ছিল, সে হল তাঁর একমাত্র কন্যা নান সু।
কিসাই-এর খ্যাতি যেমন সারা পৃথিবীতে, নান সু-র রূপের খ্যাতি তেমনই সারা। চিনে তখন ছড়িয়ে গেছে। অসামান্য রূপ হয় নিজের, নয় সংসারের সর্বনাশ ডেকে আনে। নান সু-র রূপের বেলায়ও সে নিয়মের ব্যতিক্রম হল না? উত্তরের কিতানরা তখন কাইফেং-এর ওপর সমুদ্রের তরঙ্গের মতো বারবার হানা দিচ্ছে। সেই কিতানদের দলপতি চুয়ো সান-এর কানে একদিন কী করে নান সু-র অসামান্য রূপ-লাবণ্যের খবর পৌঁছোল। কাইফেং-এর নগর প্রাকারের ধারে তার দুরন্ত সৈন্যবাহিনীকে থামিয়ে চুয়োে সান তার সন্ধির শর্ত সুং রাজসভায় জানিয়ে পাঠাল, দ্বাদশ তোরণ ও দ্বাদশ সহস্র সেতুর যে নগরের মরকত নীল হ্রদের জলে স্বপ্নের মতো সব হরিৎ দ্বীপ ভাসে সেই নগরের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ চিনের নয়নের মণি নান সু-কে তার চাই। নান সু-কে পেলেই কাইফেং-এর প্রান্ত থেকে ভাঁটার সমুদ্রের মতো তার দুর্ধর্ষ বাহিনী সরে যাবে।
রবি ন স ন তু শো মেয়ে ছিলে ন
২৩ সমস্ত চিন চঞ্চল হয়ে উঠল এ-সংবাদে, রাজসভা হল চিন্তিত, নান সুর পিতা চুয়ান উ সদাগর প্রমাদ গনলেন।
একটি মাত্র মেয়ের জীবন বলি দিয়ে সমগ্র চিনের শান্তি ক্রয় করতে সুং রাজসভা শেষ পর্যন্ত দ্বিধা করলেন না। চুয়ান উ-র কাছে আদেশ এল নান সু-কে কাইফেং-এ পাঠাবার।
জাফরি কাটা জানলার ভেতর দিয়ে আর গজদন্তের পাখার ওপর দিয়ে ব্রীড়াবনতা নবযৌবনা নান সু তখন বাইরের পৃথিবীর যেটুকু পরিচয় পেয়েছে তার সমস্তই জুড়ে আছে একটিমাত্র মানুষের মুখ। সে-মুখ কিত্সাই নগরের তরুণ নৌ-সেনাপতি সি হুয়ান-এর।
নান সু কেঁদে পড়ল বাপের পায়ে, নতজানু হল সি হুয়ান। কিন্তু চুয়ান উ নিরুপায়। রাজাদেশ লঙ্ঘন করার শক্তি তাঁর নেই।
যেতেই হবে নান সু-কে সেই বর্বর কিতান-দলপতিকে বরণ করবার জন্যে উত্তরের সেই হিমের দেশে। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সি হুয়ান-এর ওপরই নান সু-কে নিয়ে যাবার ভার পড়ল।
