দ্বাদশ তোরণ আর দ্বাদশ সহস্র সেতুর নগর থেকে সি হুয়ান-এর রণপোত যেদিন মেঘের মতো সাদা পাল মেলে রওনা হল সমস্ত কিসাই নগর সেদিন চোখের জল ফেললে। কিন্তু সি হুয়ান আর নান সুর মনে কোনও দুঃখ সেদিন নেই। ভাগ্য তাদের যদি পরিহাস করে থাকে ভাগ্যকেও তারা বঞ্চনা করবে—এই তাদের সংকল্প।
সাত দিন সাত রাত রণপোত ভেসে চলল সীমাহীন সাগরে। রণপোতের হাল ধরে আছে স্বয়ং সি হুয়ান। উত্তরে হিমের দেশের কোনও বন্দরে নয়, দক্ষিণের রৌদ্রোজ্জ্বল সাগরের মায়াময় কোনও দ্বীপই তার লক্ষ্য। একবার সেখানে পৌঁছেলে নিঃশব্দে রাত্রের অন্ধকারে নান সু-কে নিয়ে সে নেমে যাবে। সুং সাম্রাজ্যের অবিচার আর বর্বর কিতান বাহিনীর অত্যাচার যেখানে পৌঁছোয় না তেমনই এক নির্জন দ্বীপে নান সু-কে নিয়ে সে ঘর বাঁধবে। হালকা হাঁসের পালকের ভেলা সেজন্যে সে আগে থাকতেই সঙ্গে নিয়ে এসেছে।
মানুষের এ-স্পর্ধায় ভাগ্য বুঝি তখন মনে মনে হাসছে। সাত দিন সাত রাত্রি বাদে হঠাৎ দুর্যোগ নেমে এল আকাশে। দুর্যোগ ঘনাল মানুষের মনে।
সি হুয়ান নিজের হাতে হাল ধরায় তার অনুচরেরা গোড়া থেকেই একটু বিস্মিত হয়েছিল, সাত দিন সাত রাত্রিতেও গন্তব্য স্থানে না পৌঁছে তারা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। উত্তর নয়, দক্ষিণ দিকেই তাদের রণপোত চলেছে, আকাশের তারাদের অবস্থানে সে-কথা বোঝবার পর তাদের সে-সন্দেহ বিদ্রোহ হয়ে জ্বলে উঠল।
রাত্রের আকাশে তখন প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে। সমুদ্র উঠেছে উত্তাল হয়ে। ভাগ্যের সঙ্গে যারা জুয়া খেলে, বিপদকেই সুযোগরূপে ব্যবহার করবার সাহস তারা রাখে। এই ঝটিকাক্ষুব্ধ সমুদ্রেই পালকের ভেলা সমেত নান সু-কে নীচে নামিয়ে সি হুয়ান তখন নিজে নেমে যাবার উপক্রম করছে। বিদ্রোহী অনুচরেরা হঠাৎ এসে তাকে ধরে বেঁধে ফেলল।
উন্মত্ত এক তরঙ্গের আঘাতে রণপোত থেকে ভেলা সমেত দূরে উৎক্ষিপ্ত হতে-হতে নান সু শুধু ঝড়ের গর্জন ছাপিয়ে একটা চিৎকার শুনতে পেল, ভয় নেই, নান সু, ভয় নেই। আমি যাচ্ছি। আমি যাব-ই।
জ্ঞান যখন হল নান সুর ভেলা তখন ছোট্ট এক পার্বত্য দ্বীপের সৈকতের ওপর পড়ে আছে।
সভয়ে নান সু উঠে বসল, উৎকণ্ঠিতভাবে তাকাল চারিদিকে। কয়েকটা সাগর-পাখি ছাড়া কোথাও কোনও জনপ্রাণী নেই। দূরে অশান্ত নীল সমুদ্রের ঢেউ পার্বত্য তটের ওপর ক্ষণে ক্ষণে আছড়ে এসে পড়ছে।
শশকের মতো ক্ষুদ্র নবনী-কোমল নান সু-র পা—সে পা তো কঠিন পার্বত্য ভূমির ওপর দিয়ে হাঁটবার জন্য নয়, তবুনান সু-কে ক্ষত-বিক্ষত পায়ে সমস্ত দ্বীপ পরিভ্রমণ। করতে হল, কোথাও কোনও জনপ্রাণীর দেখা সে পেলে না।
তুষারধবল নান সুর অতিসুকোমল হাত—গজদন্তের চিত্রিত পাখা ছাড়া আর কিছু যে-হাত কখনও নাড়েনি, তবু সেই হাতে কণ্টকগুল্ম থেকে ফল ছিঁড়ে নান সু-কে ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে হল।
ভীরু সলজ্জ নান সুর চোখ—আঁখি পল্লব তার কাঁপতে কাঁপতে একটু উঠেই চিরকাল নেমে এসেছে, তবু সেই চোখ উৎকণ্ঠিতভাবে মেলে পাহাড়ের চূড়া থেকে দূর সাগরের দিকে তাকে চেয়ে থাকতে হল দিনের পর দিন সি হুয়ান-এর আশায়। আসবে, সে বলেছে, আসবেই।
কত দিন কত রাত গেল কেটে। উত্তরের আকাশে কতবার সপ্তর্ষিমণ্ডলের বদলে শিশুমার আর শিশুমারের বদলে সপ্তর্ষি ধ্রুবতারার প্রধান প্রহরী হয়ে তাকে প্রদক্ষিণ করে গেল, তার কোনও হিসেবই নান সুর আর রইল না।
কখন ধীরে ধীরে তার হৃদয় থেকে সমস্ত লজ্জা আর দেহ থেকে জীর্ণবাস খসে পড়ে গেল সে জানতে পারল না।
অনেক কিছু তার গেল, গেল না শুধু চোখের সেই উৎসুক দিগন্ত সন্ধানী দৃষ্টি আর মনের সেই অবিচলিত প্রতীক্ষা।
একদিন সেই প্রতীক্ষা সফল হল। দূর দিক্রবালে দেখা দিয়েছে সাদা পালের আভাস। দেখতে-দেখতে দূরের সেই পোত স্পষ্ট হয়ে উঠল, লাগল এসে শিলাকঠিন কূলে।
কে নামছে সেই পোত থেকে। ওই তো সি হুয়ান!
অধীর আগ্রহে পাহাড়ের চূড়া থেকে উচ্ছল ঝরনার মতো নামতে লাগল নান সু।
মাঝপথেই সি হুয়ান-এর সঙ্গে দেখা হল।
উচ্ছ্বসিতভাবে নান সু যেন গান গেয়ে উঠল, এসেছ, সি হুয়ান, এসেছ এতদিনে?
লুব্ধভাবে যে তার দিকে এগিয়ে আসছিল সে যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু বিমূঢ়ভাবে চমকে দাঁড়াল, কর্কশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলে, এসেছি এতদিনে মানে? কে তুমি!
সি হুয়ান-এর বিস্মিত অথচ লুব্ধ দৃষ্টি নিজের সর্বাঙ্গে অনুভব করে নান সু কাতরভাবে বললে, আমায় চিনতে পারছ না, সি হুয়ান? আমি নান সু।
নান সু!নান সু তো এই দ্বীপের নাম। যে-দ্বীপ খুঁজতে আমরা বেরিয়েছি, যে-দ্বীপ। এতদিনে খুঁজে পেয়েছি!
আমার খোঁজে তা হলে তুমি আসোনি? এসেছ দ্বীপের খোঁজে!
হ্যাঁ, এই নান সু দ্বীপের খোঁজে সাত সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য যার মাটিতে পোঁতা আছে। বলো কোথায় সে-ঐশ্বর্য?
অশ্রুসজল চোখে নান সু এবার যেন আর্তনাদ করে উঠল, তোমার কি কিছু মনে
নেই, সি হুয়ান! মনে নেই তোমার রণপোত থেকে কেমন করে ঝড়ের রাতে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়েছিল?
রণপোত থেকে ছাড়াছাড়ি! সাত পুরুষে আমাদের কেউ রণপোত চড়েনি। আট পুরুষ আগে এক সি হুয়ান কীরকম নৌ-সেনাপতি ছিলেন বলে শুনেছি। এই নান সু দ্বীপের গুপ্ত তথ্য নাকি তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া। কিন্তু সে তো কাইফেং যখন চিনের রাজধানী ছিল সেই দু-শতাব্দী আগের কথা!
দু-শতাব্দী আগেকার কথা! অস্পষ্ট আবেগরুদ্ধ স্বরে উচ্চারণ করলে নান সু, তারপর নবাগত নাবিকের লুব্ধ দৃষ্টিতে হঠাৎ নিজের পরিপূর্ণ নগ্নতা আবিষ্কার করে চমকে উঠল।
