ঘনশ্যামবাবু এই সান্ধ্য-আসরের প্রাণস্বরূপ হলেও তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু কারও জানা নেই। কলকাতার কোনও এক মেস-এ তিনি থাকেন ও ছেলে-ছোকরাদের মহলে ঘনাদা-রূপে তাঁর অল্পবিস্তর একটা খ্যাতি আছে এইটুকু মাত্র সবাই জানে। শীর্ণ পাকানো চেহারা দেখে তাঁর বয়স অনুমান করা কঠিন আর তাঁর মুখের কথা। শুনলে মনে হয় পৃথিবীর এমন কোনও স্থান নেই যেখানে তিনি যাননি, এমন কোনও বিদ্যা নেই যার চর্চা তিনি করেন না। প্রাচীন নালন্দা তক্ষশিলা থেকে অক্সফোর্ড কেমব্রিজ হার্ভার্ড, চিনের প্রাচীন পিঁপিঁন থেকে ইউরোপের সালো প্রাগ হিডেলবার্গ লাইপজিগ পর্যন্ত সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেই তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে বলে মনে হয়।
তাঁর পাণ্ডিত্যে যত ভেজালই থাক, তার প্রকাশে যে মুনশিয়ানা আছে এ-কথা স্বীকার করতেই হয়।
তাঁর কথার প্রতিবাদ না করে আমরা আজকাল তাই নীরবে তাতে সায় দিয়ে থাকি।
রবিনসন ক্রুশোর প্রসঙ্গটার বেলায়ও সেইজন্যেই জিভের উদ্যত বিদ্রোহ আমরা কোনওরকমে সামলে নিলাম।
মাথার কেশ যাঁর কাশের মতো শুভ্র সেই হরিসাধনবাবুর ছোট্ট দৌহিত্রীটির দরুন সেদিন প্রসঙ্গটা উঠেছিল।
দৌহিত্রীটিকে সেদিন হরিসাধনবাবু বুঝি আদর করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। যে বয়সে ছেলেদের সঙ্গে তাদের পার্থক্যটা মেয়েরা বুঝতে শেখে না বা বুঝেও মানতে চায় না, মেয়েটির বয়স ঠিক তাই। আমাদের গল্পগুজবের মধ্যে কিছুকাল মনোনিবেশ করবার বৃথা চেষ্টা করে হ্রদের মাঝখানের দ্বীপের মতো জায়গাটিকে দেখিয়ে সে বুঝি বলেছিল, দেখেছ দাদু, ঠিক যেন রবিনসন ক্রুশোর দ্বীপ!
দাদু কিংবা আর কারও মনোযোগ তবু আকর্ষণ না করতে পেরে সে আবার বলেছিল, বড় হলে আমি রবিনসন ক্রুশো হব—জানো?
এত বড় একটা দুঃসাহসিক উক্তির প্রতি উদাসীন থাকা আর বুঝি আমাদের সম্ভব হয়নি। মেদভারে যাঁর দেহ হস্তীর মতো বিপুল সেই ভবতারণবাবু হেসে বলেছিলেন, তা কি হয় রে, পাগলি। মেয়েছেলে কি রবিনসন ক্রুশো হতে পারে।
মেয়েটির হয়ে হঠাৎ ঘনশ্যামবাবুই প্রতিবাদ করে বললেন, কেন হয় না? একটু চুপ করে কিঞ্চিৎ অনুকম্পার সঙ্গে আমাদের দিকে চেয়ে তিনি আবার যা বললেন, তার উল্লেখ আগেই করেছি।
আমাদের কোনও প্রতিবাদ করতে না দেখে ঘনশ্যামবাবু এবার শুরু করলেন, রবিনসন ক্রুশো ড্যানিয়েল ডিফোর লেখা বলেই আপনারা জানেন। এ-গল্পের মূল কোথায় তিনি পেয়েছিলেন তা জানেন কি?
মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবু সসংকোচে বললেন, যতদূর জানি, আলেকজান্ডার সেলকার্ক বলে একজন নাবিকের জীবনের অভিজ্ঞতা শুনেই এ-গল্প তিনি বানিয়েছিলেন।
যা জানেন তা ভুল! ঘনশ্যামবাবুর মুখে করুণামিশ্রিত অবজ্ঞা ফুটে উঠল, আত্মম্ভরি ইংরেজ সাহিত্যিকরা আসল কথা চেপে গিয়ে যা লিখে গেছে তা-ই অম্লান বদনে বিশ্বাস করেছেন। মনমাউথের বিদ্রোহে যোগ দেবার জন্যে ড্যানিয়েল-এর একবার ফাঁসি হবার উপক্রম হয় জানেন তো? লন্ডনের বাসিন্দা বলে কোনওরকমে। সে-যাত্ৰা তিনি রক্ষা পান। তারপর নতুন রাজা-রানি উইলিয়ম আর মেরি দেশে আসার পর ড্যানিয়েল কুগ্রহ কাটিয়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। সেই সময় ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে তাঁকে যেতে হয় স্পেনে। সেই স্পেনেই মাদ্রিদ শহরের এক ইহুদি বুড়োর দোকানে খুঁটিনাটি জিনিসপত্র ঘাঁটতে-ঘাঁটতে একটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর পুঁথি পেয়ে তিনি অবাক হয়ে যান। সে-পুঁথির অনুলেখক রাস্টিসিয়ানো আর তার কথক স্বয়ং মার্কো পোলো।
উদর যাঁর কুম্ভের মতো স্ফীত সেই রামশরণবাবু সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন মার্কো পোলো মানে, যিনি ইউরোপ থেকে প্রথম চিনে গেছলেন পর্যটক হয়ে, রবিনস ক্রুশোর মূল গল্পের লেখক তা হলে তিনি!
একটু রহস্যময়ভাবে হেসে ঘনশ্যামবাবু বললেন, না, তিনি হবেন কেন! তিনি শুধু সে-গল্প সংগ্রহ করে এনেছিলেন মাত্র। সংগ্রহ করেছিলেন চিন থেকে।
ষোলো বছর বয়সে মার্কো পোলো তাঁর বাপ আর কাকার সঙ্গে পৃথিবীর অদ্বিতীয় সম্রাট কুবলাই খাঁর রাজধানী ক্যাম্বালুকের উদ্দেশে সাগর-সম্রাজ্ঞী ভেনিসের তীর থেকে রওনা হন। ফিরে যখন আসেন তখন তাঁর বয়স একচল্লিশ। দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে অর্ধ-পৃথিবীর অধীশ্বর কুবলাই খাঁ-র বিশ্বস্ত কর্মচারীরূপে প্রায় সমস্ত চিন তিনি পর্যটন করে ফিরেছেন। ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে ইয়াং চাও-এর এক লবণের খনির পরদিৰ্শক হিসাবে কাজ করবার সময় বিখ্যাত চিনা লেখক ও সম্পাদক সান কাও চি-র সঙ্গে তাঁর সম্ভবত সাক্ষাৎ হয়। সান কাও চি তখন অতীতের সমস্ত চিনা কাহিনী ও কিংবদন্তি সংগ্রহ করে তাতে নতুন রূপ দিচ্ছেন। সেই সান কাও চির কাছে শোনা। একটি চিনা গল্পই রবিনসন ক্রুশোর প্রধান প্রেরণা।
মার্কো পোলোরা চিন থেকে তাঁদের বিশ্রী ননাংরা বেঢপ তাতার পোশাকের ভেতরে সেলাই করে শুধু হীরা মোতি নীলা চুনিই নয়, আরও অনেক কিছুই এনেছিলেন। ভেনিস-এর ডোজেকে তাঁরা যা যা উপহার দেন, ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দে লেখা মারিনো ফালিএবোর প্রাসাদের মূল্যবান দ্রব্যের তালিকায় তার কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। সেসব উপহারের মধ্যে ছিল স্বয়ং কুবলাই খাঁর দেওয়া আংটি, তাতারদের পোশাক, তেলা একটি তরবারি, টাঙ্গুটের চমরিগাই-এর রেশমি ললাম, কস্তুরী মৃগের শুকিয়ে রাখা পা আর মাথা, সুমাত্রার নীলগাছের বীজ।
