ঝগড়াটা এরপর কোন দিকে যেত বলা যায় না, কিন্তু শিবুই হঠাৎ বেয়াড়া খোঁচা তুলে সব ঠাণ্ডা করে দিলে।
কানি পেতে, না, ল্যাজারাসের খাটে শোবে সে ঝগড়া রেখে আসল বেড়াটা আগে ডিঙোও দেখি। তেতলার উনি বেঁকে দাঁড়াবেন না তো? চিন্তিতভাবে বলল শিবু।
ঘনাদা বেঁকে দাড়াবেন! উত্তেজিত হয়ে উঠল শিশির, এমন একটা দাঁও পাওয়ার মর্ম তিনি বুঝবেন না!
আলবত বুঝবেন! বোঝাতেই হবে তাঁকে। এখুনি। গৌর মূর্তিমান সংকল্পের মতো উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও।
তারপর সোৎসাহে সশব্দে সিঁড়ি কাঁপিয়ে দোতলা থেকে তেতলা।
ঘনাদাকে ভোট দিন (পার্ট ২)
খানিকবাদেই সেই সিঁড়ি দিয়ে যখন নামলাম তখন আর সে আওয়াজ নেই। পাগুলো যেন নড়তেই চায় না।
ঘনাদাকে আমাদের অনুরোধ-উপরোধ, যুক্তি তর্ক, প্রলোভন কিছুতে টলানো যায়নি। তাঁর ধনুকভাঙা পণ ওই তেতলার ঘর ছেড়ে পাদমেক ন গচ্ছামি।
খবরের কাগজে হলে নিশ্চয় একটা জুৎসই শিরোনাম দিত। সংকটজনক পরিস্থিতি গোছের কিছু।
তবু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলে তো চলে না। আমাদের মন্ত্রণাসভা বসল।
আমাদের অবশ্য উভয় সংকট। ঘনাদাকে বাদ দিয়ে নতুন বাড়িতে উঠে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না। আবার ঘনাদার জেদের কাছে হার মানলে এমন একটা দাও ফসকে যায়!
সুতরাং যেমন করে হোক ঘনাদাকে এ বাড়ি ছাড়তে রাজি করাতেই হবে।
কিন্তু তা কী করে সম্ভব?
ভূতের ভয় দেখিয়ে! শিবুর প্রস্তাব।
প্রস্তাবটা মন্দ নয়। কিন্তু ভয় দেখালে হিতে বিপরীতে যদি হয়! একটা ছুতোনাতা করে আমাদের রামভুজকেই হয়তো ভোলা ছাদে শুতে বাধ্য করবেন। একবার চোরের ভয় হতে যেমন করেছিলেন। রামভুজ বেচারারই প্রাণান্ত। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘনাদার বন্ধ দরজার ভেতর থেকে ডাক, রামভুজ জেগে আছ তো? তার সঙ্গে নুনের ছিটেটুকু আরও অসহ্য! রামভুজ হাঁ, বড়বাবু বলে সাড়া দেবার পর ঘনাদার উদার আশ্বাস,দেখো, ভয় পেও না। আমি তো আছি, তোমার ভয় কী?
না, ভূতের ভয় দেখানোটা বেকার। তা ছাড়া সদ্য সদ্য বাড়ি বদলের প্রস্তাবের পরই ভূতের ভয় দেখানোর মানেটা ধরেও ফেলতে পারেন।
শিবুর প্রস্তাব বাতিল হতেই শিশির নিজেরটা পেশ করল, মহামারির আতঙ্ক!
কীসের আতঙ্ক? আমাদেরই বিহুল প্রশ্ন।
মহামারির আতঙ্ক! শিশির নাটকীয় সুরে বুঝিয়ে দিলে, সারাক্ষণ বাড়িতে কী রকম একটা বিশ্রী গন্ধ। শুয়ে বসে কারুর শান্তি নেই। নিশ্চয় গুরুতর কিছু হবে। এই রকম গন্ধ পাবার পর কোন মেস বাড়িতে কোথায় নাকি সব ক-জন বোর্ডারকে ঝোল ভাত খাইয়ে ছেড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সে বাড়ি নাকি করপোরেশন থেকে ভেঙে ফেলতে হয়। সকাল বিকেল ঘনাদার কাছে এই সব গল্প।…
কিন্তু ঘনাদার নাকেও তো গন্ধটা যাওয়া চাই! আমাদের বাধা দিতে হল শিশিরের রাশছাড়া কল্পনায়।
নিশ্চয় যাওয়া চাই। শিশির জোরের সঙ্গে সায় দিলে, আমাদের সকলের নাকে যাবে, ঘনাদার যাবে না?
গন্ধটা কীসের? আমাদের সন্দিগ্ধ প্রশ্ন।
একটা বিতিকিচ্ছি কিছুর! শিশির সোৎসাহে ব্যাখ্যা শুরু করলে, সালফিউরিক অ্যাসিড খানিকটা কিংবা…
কিংবা তোমার মগজে যে বস্তুটি আছে সেইটি! গৌর খিচিয়ে উঠল। আমাদেরও বক্তব্য তাই। ঘনাদাকে বাড়ি ছাড়া করতে নিজেদের নাড়ি ছাড়াতে আমরা রাজি নই। শিশিরের প্রস্তাব সুতরাং সর্বসম্মতিক্রমে বাতিল।
কিন্তু একটা কিছু ফন্দি তো না বার করলে নয়।
ভাবতে ভাবতে চমৎকার একটা মতলব মাথায় এসে গেল।
আচ্ছা, হঠাৎ একজনের মাথা খারাপ হয়ে যাক না? সগর্বে সকলের মুখের দিকে চাইলাম।
নাঃ, দুনিয়ায় সরেস কোনও কিছুরই কদর নেই। এমন একটা চমৎকার প্রস্তাবে সবাই মিলে আমার দিকে অমন অবজ্ঞাভরে চাইবার কী মানে হয়? তার ওপর হয়ে যাক কেন, হয়েছে তো! বলে চিপটেন কাটাটা একটু বাড়াবাড়ি নয়?
নেহাত ব্যাপারটা জরুরি বলেই অপমানটা গ্রাহ্য না করে কর্তব্যের খাতিরে বসে রইলাম।
হঠাৎ গৌর বললে, আচ্ছা, কাল থেকেই ঘনাদা খেপে আছে, কেমন? ব্যস! আর ভাবনা নেই।
তার মানে? আমরা বিমূঢ়।
মানে, অটোভ্যাকসিন! গৌর সংক্ষিপ্ত।
অটোভ্যাকসিন কী রকম?
রোগের বীজ থেকেই তার ওষুধ, আবার কী রকম? গৌরের মাথাগুলোনো ব্যাখ্যা!
ব্যাখ্যা যেমনই হোক মতলবটা যে পাকা মাথার তা আমাদের স্বীকার করতেই হল অভিযান আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।
অভিযান সেই দিন থেকেই শুরু হল। ঘনাদা তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক সান্ধ্যভ্রমণে বেরুবার জন্য নামবার আগেই আমরা দল বেঁধে বেরিয়ে পয়লা কাজ সেরে এলাম।
তারপর ঘনাদার লেক-বৈঠক থেকে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে থাকা।
ঘনাদা দোতলায় উঠে তেতলায় পা বাড়াবার আগেই তাঁকে যেন সন্ত্রস্ত করে ঘিরে ধরা। মুখের ঘনঘটা দেখে মনে হল ওষুধ ধরেছে। ঘনাদা অবশ্য পাশ কাটিয়ে চলে যাবার উপক্রমই করছিলেন। কিন্তু সে সুযোগ আর তাঁকে দেওয়া হল না।
বড় মুশকিল হয়ে গেছে ঘনাদা! আমাদের মুখে উদ্বেগ, আশঙ্কা, উত্তেজনা।
ঘনাদাকে শিশিরের এগিয়ে-ধরা সিগারেটটা নিয়ে আড্ডাঘরে এসে বসতেই হল।
শিশির লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে দিলেও ঘনাদার মুখের অন্ধকার যেন কাটল না।
পাড়ার সবাই তো মেতে উঠেছে! শিবু শুরু করল।
আমরা কত করে বোঝালাম! আমি চালিয়ে গেলাম, কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা।
অবশ্য ওদেরই বা দোষ কী! গৌর সত্যের মর্যাদা না রেখে যেন পারল না, আপনার মতো লোক পাড়ায় থাকতে আর কার কাছে যাবে?
