এ ধরনের হিংসে আমার ভাল লাগে না। না হয় আমার বাড়িটা বেশ বড়ই হচ্ছে। কিন্তু আমি কি তাই বড়াই করছি যে আমার ওপর হিংসে হবে!
সেই কথাই গৌরকে বোঝাতে যাচ্ছিলাম। শিশির তার সুযোগ দিলে না। হঠাৎ বিদ্রুপ করে বলে বসল, বাড়ি যে তোরা পেয়েই গেছিস মনে হচ্ছে!
হ্যাঁ, পেয়েই গেছি!
আমাদের মুখ থেকে নয়, জবাবটা এল পেছন থেকে।
চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখি শিবু। কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। আমাদের চমকে দিয়ে শিবু যেন যুদ্ধ জয় করে এসেছে এমনই উত্তেজিতভাবে সামনে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললে, সত্যি পেয়ে গেছি বাড়ি!
তুই বাড়ি পেয়ে গেছিস মানে? আমি আর গৌর দুজনেই অত্যন্ত বিরক্ত, রাশিফল আমাদের আর বাড়ি পেলি তুই! সক্কলের পাওয়া!
কীরকম? এ উদারতায় একটু অপ্রস্তুত হয়েই জিজ্ঞাসা করতে হল।
মানে বাড়ি পেয়েছি মেসের জন্যে। এই এঁদোগলির ঝরঝরে হাড়গোড়ভাঙা বাড়ির বদলে বড় রাস্তায় প্রকাণ্ড ঝকঝকে নতুন বাড়ি ভাড়াও এই একই।
তা কখনও হয়! তোর মাথা খারাপ হয়েছে। এবার সকলে আমরা একমত।
আহা, আমার মাথা খারাপ হবে কেন? খারাপ হয়েছে তো বিপিনবাবুর! শিবু আমাদের ভুল সংশোধন করলে।
কে বিপিনবাবু? আর তার মাথা খারাপ হওয়ার সঙ্গে আমাদের বাড়ি পাওয়ার সম্পর্কটা কী?
বাঃ, সম্পর্ক নেই? শিবু আমাদের মূঢ়তায় বিষণ্ণ, বিপিনবাবুর সঙ্গেই যে আমার সম্পর্ক। তিনি যে আমার নিকট আত্মীয়, মানে খুব আপনার লোক?
তাতে তোর মাথার দোষের কারণটা না হয় পেলাম, কিন্তু বাড়ি পাচ্ছি কী করে?
বাড়ি পাচ্ছি কতবার বলব—আত্মীয়তার জোরে! শিবু বোঝাতে গিয়ে বুঝি ক্লান্ত।
কীরকম আত্মীয়তা? শিশিরের তবু সন্দিগ্ধ প্রশ্ন।
আত্মীয়তা যেমন হয়, আবার কীরকম? শিবু বিরক্ত হয়ে সম্পর্কটা যা বুঝিয়ে দিলে তাতে আমরা একেবারে চুপ।
কোনওরকম ঢোঁক-টোক না গিলে একেবারে গড়গড় করে শিবু বলে গেল, বিপিনবাবু হলেন পিসতুতো ভাই-এর মাসতুতো বোনের খুড়তুতো ভাই-এর পিসশ্বশুর, কিংবা মামাতো বোনের পিসশ্বশুরের জ্যেঠিমার বাড়িওয়ালার অফিসের বড়বাবুও হতে পারেন। আসল কথা, তাঁর হঠাৎ মাথা খারাপ না হলে কিংবা আগে থাকতেই খারাপ না থাকলে কিছুই হত না।
শিবুর ব্যাখ্যার ধাক্কাটা সামলাতে একটু দেরি হল। তারপর গৌরই প্রথম কৌতূহল প্রকাশ করতে সাহস করলে, বিপিনবাবু মাথা খারাপ হয়ে তোকে তা হলে বাড়িটা দিয়েছেন?
তিনি দেবেন কোথা থেকে? শিবু অধৈর্যের সঙ্গে জানালে, তিনি তো এখন অ্যাসাইলাম-এ, মানে মাথার রুগিদের আশ্রমে।
তবে? হতভম্ভ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়ি তা হলে কার কাছে কেমন করে পাচ্ছিস?
পাচ্ছি অ্যাটর্নির কাছে। বিপিনবাবু অ্যাটর্নিকে লিখে যা হুকুম দিয়ে রেখেছেন তারই জোরে।
এতক্ষণে যেন কুয়াশাটা একটু খাটল। বললাম, তাই বল! তোর সেই পরমাত্মীয় বিপিনবাবু অ্যাটর্নিকেই হুকুম দিয়ে গেছলেন, তোকে বাড়িটা দিতে।
না। শিবুর গলা চড়া মেজাজের, তিনি যা হুকুম দিয়ে গেছলেন তাতে ও বাড়ির ব্যবস্থা করতে অ্যাটর্নিই অকুল পাথারে। অথচ বিপিনবাবুর খরচ মেটাতে বাড়ির একটা ব্যবস্থা না করলেও নয়।
কী হুকুম দিয়েছিলেন?
যা দিয়েছিলেন তাইতেই বাজিমাত! শিবুর মুখে এবার একটু মুচকি হাসি, ওই হুকুমের জোরেই বাড়িটা আদায়ের ব্যবস্থা করে এলাম।
হুকুমটা কী?
হুকুমটা হল ও বাড়িতে কেউ যেন কোনওদিন সংসার না পাতে। কারণ সংসারই তাঁর মতে সব গণ্ডগোলের কারণ—এমন কী তাঁর মাথারও।
ওই হুকুম থেকেই তুই কাজ বাগালি? শিশিরের মুখে আমাদের সকলের সংশয়।
তা বাগাব না! শিবু যেন এতক্ষণে তুরুপের টেক্কা বার করে দেখাল, সংসার পাততে দিলে ও বাড়ির কী ব্যবস্থা হতে পারে? অফিস হয় বটে। কিন্তু ও বেপোট জায়গায় অফিস করতে চাইবে কে? তাই অ্যাটর্নিকে বুঝিয়ে দিলাম ও বাড়ির মেস হওয়া ছাড়া আর কোনও গতি নেই। মেস তো আর সংসার নয়। তা হলেই বুঝতে পারছিস, বিপিনবাবুর যদি মাথা খারাপ না হত, তাইতে তিনি যদি অমন আজগুবি হুকুমনা দিতেন, তাঁর সঙ্গে আমার অমন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা না থাকত, আর সে যেমনই হোক, মামাতো বোনের বাড়ি গিয়ে খবরটা যদি না পেতাম, আর মামাতো বোনের বাড়ির কাছে হঠাৎ যদি আজ গিয়ে না পড়তাম, অর্থাৎ কারেন্ট বন্ধ হয়ে গিয়ে ট্রামটা যদি ওইখানেই না থামত আর বিরক্ত হয়ে যদি না ওখানে নেমে পড়তাম…
শিবুকে না থামালে সে বোধহয় কার্যকারণ বোঝাতে বোঝাতে ইডেন উদ্যানে আমাদের নিষিদ্ধ ফল খাওয়া পর্যন্ত পৌঁছে যেত।
বুঝেছি! বুঝেছি! বলে সমস্বরে তাই তাকে থামাতেই হল। শিবুর আনা খবরের সঙ্গে রাশিফলের গণনা মিলে গিয়ে আমাদের তখন ধৈর্য ধরবার মতো অবস্থা নেই। পারলে তখুনি লরি ডেকে মাল-টাল তুলে ফেলি।
শিশির সোৎসাহে বলল, আচ্ছা বাড়ি ভাড়ার বায়নাটা আজই দিয়ে এলে হয়?
আর আমাদের বাড়িওয়ালাকে একটা নোটিশ! গৌর স্মরণ করিয়ে দিলে।
গোটা কয়েক লরিও আগে থাকতে বলে রাখতে হয়! সুযুক্তি দিলাম আমি।
কেন, লরি কী হবে? শিশির আমার সুযুক্তির গোড়াতে কোপ দিলে, এখানকার এইসব রদ্দি ফার্নিচার ওই বাড়িতে নেব নাকি! সব নিলেমে বিক্রি করে যাব।
তারপর সেখানে মেঝেয় কানি পেতে শোব, কেমন? একটু বিদ্রুপ করতেই হল আমায়।
কানি পেতে শোয়া যার অভ্যাস, সে শোবে! শিশির একটু যেন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল, কলকাতা শহরে ফার্নিচারের দোকানের তো ঘাটতি নেই। যেমন বাড়ি, তেমনই ফার্নিচার না হলে মানায়!
