এ বিয়োগান্ত নাটকের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য ওই বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের মেসবাড়ির দোতলার আড্ডা ঘর। সময় রবিবারের বিকেল। কুশীলব বলতে শিশির, গৌর এবং আমি ছাড়া তৎকালে আর কেউ নয়। আমরা তেতলার একটি ঘরের দিকে উৎকর্ণ হয়ে থাকার সঙ্গে প্রত্যেকে নিজের নিজের পছন্দসই দৈনিকে ও সাপ্তাহিকের সব চেয়ে দামি পাতায় মাঝে মাঝে মনঃসংযোগ করে নীরস বিকেলের একঘেয়েমিটা একটু ভুলতে চেষ্টা করছি। তেতলার ঘর থেকে সেদিন কিছু হবার আশা নেই বলেই জানি। শনিবার থেকেই অসহযোগ শুরু হয়েছে, শুরু হয়েছে করপোরেশনের আসছে নির্বাচনের এক প্রার্থী দলবল সমেত এসে খানিক হইচই করে যাবার পর। কেন ওই সব বক্তিয়ার খিলজিদের নিয়ে মাতামাতি করেছি—এইতেই ঘনাদার রাগ। সে রাগ এখনও পড়বার লক্ষণ নেই।
গৌর নামকরা একটি দৈনিকের পাতা থেকে মুখ তুলে হতাশ ভাবে সেটাকে টেবিল থেকে মেঝেয় গড়িয়ে যেতে দিয়ে বলল, না, এ-হপ্তায় আর কিছু হবার নয়।
কেন? কেন? আমরা যে যার কাগজ নামিয়ে সমস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম।
কেন? গৌর মেঝে থেকে কাগজটা আবার তুলে নিয়ে বললে, জায়গাটা পড়ে শোনাচ্ছি। তা হলেই বুঝবে কেন? লিখছে, সর্বদিকে ইঙ্গিত লক্ষিত হইতেছে। অত্যন্ত সাবধানে না থাকিলে বিশেষ বিপদের সম্ভাবনা। রাহু মিথুনে ও কেতু ধনুতে অবস্থান করার দরুন সম্পত্তি হস্তান্তরের ব্যাপারে শঠ ও প্রবঞ্চকের ছলনায় ভুলিতে হইবে। বৈদেশিক বাণিজ্যেও তত্রস্থ আকস্মিক শাসন বিপর্যয়ে প্রচুর সঞ্চিত সম্পদ ধ্বংস হইতে পারে। জামাতা বা শ্বশুর স্থানীয় কাহারও কঠিন পীড়া অবশ্যম্ভাবী…
গৌরের পড়া ফিরিস্তি শুনে আমরাও সবাই প্রথমে যাকে বলে একেবারে মুহ্যমান-থুড়ি, মোহামান।
শিশিরই প্রথমে যেন সাড় ফিরে পেল। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কিন্তু বিপদ কি খুব গুরুতর?
গুরুতর নয়? গৌর রীতিমতো ক্ষুণ্ণ।
আমিও এতক্ষণে একটু সন্দিগ্ধ হয়েছি।
বললাম, কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না। তোর সম্পত্তিই কোথায় যে হস্তান্তর করলে ঠকবি? বিদেশে কোন বাণিজ্যটা তুই করিস? আর বিয়েই যার হয়নি তার আবার শ্বশুর-জামাই-এর ভাবনা কীসের?
এ মোক্ষম যুক্তিতেও গৌরকে টলানো গেল না। গম্ভীর মুখে আমাদের নির্বুদ্ধিতায় যেন হতাশ হয়েই বললে, আসল ব্যাপারটাই তোদের মাথায় ঢুকছে না। ও সব যদি
হয় তা হলে অন্য কিছু অনিষ্ট একটা নির্ঘাৎ হবে। কারণ এ হপ্তায় কর্কটের রাশিফল অত্যন্ত খারাপ।
হুঁ! তোর কর্কট রাশি ঠিক জানিস! শিশির একেবারে গোড়ায় কোপ দিতে চাইলে।
তা আর জানি না। সারা জীবন ওর দাঁড়ায় নাজেহাল হচ্ছি। অথচ আর মিনিট খানেক পরে জন্মালেই সিংহ রাশিতে পড়ে একটা কেওকেটা হতাম, গৌর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।
সিংহ রাশিটা মিনিট খানেকের জন্য ফসকে যাওয়ায় এ রকম দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়তেই পারে। সমবেদনা জানাতে যাচ্ছিলাম। শিশির কিন্তু অবিচলিত ভাবে জিজ্ঞাসা করলে, কার গণনা পড়ছিস? সায়নাচার্যের তো! কিন্তু জ্যোতিষার্ণবের মত আলাদা!
আলাদা মানে? গৌর বেশ অসন্তুষ্ট।
হ্যাঁ, এই তো জ্যোতিষার্ণব লিখছেন এই পত্রিকায় কর্কট রাশির পক্ষে অত্যন্ত সুসময়। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত দিক হইতে সৌভাগ্যের উদয় হইতে পারে। অত্যন্ত সুবিধাজনক শর্তে একটি গাড়ি কিংবা বাড়ি পাইবার সম্ভাবনা। সেরূপ সুযোগ আসিলে অবহেলা করিবেন না। স্থানান্তরিত হইলে প্রচুর লাভের আশা।
লিখছে কর্কট রাশি সম্বন্ধে? গৌরের মুখে অবিশ্বাস ও উল্লাসের দ্বন্দ্ব।
হ্যাঁ, স্পষ্ট লেখা রয়েছে কর্কট। নিজেই দেখ না! শিশির কাগজটা এগিয়ে দিলে।
গৌর এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে কেমন একটু হতভম্ব হয়ে বললে, আশ্চর্য! কিন্তু গাড়ি কি বাড়ি কোথা থেকে আসবে! একটা সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল অবশ্য কিনব কিনব ভাবছিলাম। কিন্তু বাড়ি..
আমারও কিন্তু বাড়ির কথা লিখছে! বাধা দিয়ে আমাকে এবার জানাতেই হল।
শিশির ও গৌর দুজনেই একসঙ্গে অবজ্ঞার হাসি হাসল, তোর আবার বাড়ির কথা লিখছে কে?
এই তো স্বয়ং জ্যোতিষরাজ লিখছেন,আমি আহত অভিমানের সুরে জানালাম, লিখেছেন তুলা রাশির পক্ষে এ সপ্তাহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চন্দ্রের প্রভাবের দরুন প্রাথমিক বাধা দেখা দিলেও পরিশেষে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হইবে। বাসভবন পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। গৃহপ্রাপ্তিযোগ প্রবল।
তার মানে তোরা দুজনেই বাড়ি পেয়ে উঠে যাবি! শিশিরের গলা বেশ ঈর্ষাকাতর, আর আমি শুধু এই মেসে বসে ভেরেন্ডা ভাজব!
আহা, অত মন খারাপ করছিস কেন? আমি শিশিরকে সান্ত্বনা দিলাম, আমরা বাড়ি পেলে কি আর তোকে থাকতে দেব না! তুই তো গৌরের বাড়িতেও অনায়াসে থাকতে পারিস।
না, না আমার বাড়িতে সুবিধে হবে না! গৌর সোজাসুজি জানিয়ে দিল, আমি বাড়িটা বিক্রিই করে দেব ভাবছি।
বিক্রি করে দিবি? গৌরের আহাম্মকিতে না চটে পারলাম না, ওই ছোট্ট একটা বাড়ি বিক্রি করে কী-ই বা পাবি? তার চেয়ে আমার মতে ভাড়া দে। আজকালকার দিনে যা ভাড়া পাবি তাতে রোজ আমাদের সিনেমা থিয়েটার দেখিয়েও হোটেলে খাইয়ে আনতে পারবি।
এমন সুযুক্তিটা গৌরের মনে ধরল না। প্রায় দাঁত খিচিয়ে বললে, আমার বাড়ি ছোট দেখলি কোথায় শুনি! দস্তুর মতো সায়নাচার্যের গণনা করা বাড়ি সে খেয়াল আছে! তোর তো জ্যোতিষরাজের বাড়ি। খোলার কি খড়ের চাল হয় তাই আগে দেখ। তারপর ভাড়া দিস!
